⊕ নজরদারিতে ঘাটতি ⊕ কর ফাঁকি, শুল্ক জালিয়াতি ও বিশেষ সুবিধা—লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় বাধা

রাজস্বের পাহাড়সম লক্ষ্য: ফাঁকি-জালিয়াতি ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৫ পিএম

এনবিআরের ওপর বাড়তি চাপ | কর ফাঁকি, শুল্ক জালিয়াতি ও প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধায় নজরদারির দাবি

চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অথচ আগের অর্থবছরে সংস্থাটির প্রকৃত আদায় ছিল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। ফলে নতুন অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহে বড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি কর ফাঁকি, ভ্যাট অনিয়ম, শুল্ক জালিয়াতি ও বকেয়া আদায়ের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এনবিআরের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজস্ব আদায়ের এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। আয়কর নির্ধারণ, ভ্যাট নিরীক্ষা, আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন, কর অব্যাহতি, ভ্যাট রিফান্ড এবং কর মামলা নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অনিয়মের ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে প্রভাবশালী করদাতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি উঠছে।

তবে অনিয়মের ঝুঁকি থাকা আর দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নথিপত্র যাচাই, স্বাধীন নিরীক্ষা ও নিরপেক্ষ তদন্ত।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজন প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

সরকারের বাজেট পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

এনবিআরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি রাজস্ব আদায় করেছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।

সেই হিসাবে নতুন অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হলে আগের বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব সংগ্রহে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান কর প্রশাসনের সক্ষমতা, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হবে? শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর আদায়ের চাপ বাড়ানো, ঘন ঘন নোটিশ দেওয়া কিংবা অভিযান পরিচালনা করে এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, করজাল সম্প্রসারণ, বকেয়া আদায় এবং কর ফাঁকির উৎস শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

করজালের সীমাবদ্ধতা, আয় গোপনই বড় বাধা

বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকৃত আয় ও ব্যবসায়িক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিশ্চিত করা। নগদনির্ভর লেনদেন, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা এবং আয়-ব্যয়ের তথ্য গোপনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে করযোগ্য আয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু নতুন করদাতা নিবন্ধন করলেই রাজস্ব বাড়বে না। তাঁদের নিয়মিত রিটার্ন দাখিল, প্রকৃত আয়-সম্পদ যাচাই এবং আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চ আয়, বড় ব্যবসায়িক লেনদেন ও সম্পদের সঙ্গে ঘোষিত আয়ের অসংগতি রয়েছে কি না, তা তথ্যভিত্তিকভাবে যাচাই করা জরুরি।

করজাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পেশাজীবী, উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সম্পদশালী করদাতাদের ওপর ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অযথা হয়রানি এড়িয়ে ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ কর নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে।

ভ্যাট ফাঁকিতে রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি

আয়করের পাশাপাশি মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট রাজস্বের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু বিক্রির তথ্য গোপন, প্রকৃত লেনদেনের তুলনায় কম বিক্রি দেখানো, ভুয়া চালান ব্যবহার, ইনপুট ভ্যাটের অনিয়মিত দাবি এবং নিবন্ধনবিহীন ব্যবসার মাধ্যমে লেনদেন পরিচালনার মতো ঝুঁকি এ খাতে রাজস্ব ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, সেবাপ্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ বিক্রির ব্যবসায় প্রকৃত লেনদেনের সঙ্গে ঘোষিত বিক্রির হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ইলেকট্রনিক চালান, ব্যাংক লেনদেন, মজুত ও বিক্রয় হিসাব সমন্বিতভাবে যাচাই করা গেলে অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্যাট রিটার্ন যাচাই, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা এবং অনিয়মের পরিমাণের বিপরীতে প্রকৃত আদায়ের হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।

আমদানি-রপ্তানিতে শুল্ক জালিয়াতি প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ

রাজস্ব আদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কাস্টমস। আমদানি পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, পণ্যের যথাযথ শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর আদায় নিশ্চিত করা না গেলে রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।

আমদানিতে কম মূল্য ঘোষণা, ভুল এইচএস কোড ব্যবহার, পণ্যের প্রকৃতি গোপন, শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউসে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা পণ্য অবৈধভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রির অভিযোগ বা ঝুঁকি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল প্রকৃতপক্ষে রপ্তানিমুখী উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমদানি-রপ্তানির নথি, উৎপাদন সক্ষমতা, কাঁচামালের মজুত, রপ্তানির পরিমাণ এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রির তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা জরুরি।

শুধু পণ্য খালাসের সময় পরীক্ষা চালিয়ে এসব অনিয়ম পুরোপুরি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাই পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা, গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ চালান চিহ্নিত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

কর অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধায় স্বচ্ছতা জরুরি

বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এসব সুবিধার প্রয়োজনীয়তা, মেয়াদ এবং অর্থনৈতিক সুফল নিয়মিত মূল্যায়ন না করা হলে সম্ভাব্য রাজস্বের বড় অংশ আদায়ের বাইরে থেকে যেতে পারে।

কোন খাতে কত টাকার কর অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে, তার বিপরীতে কতটা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বা উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যেসব সুবিধা আর কার্যকর নয়, সেগুলো পর্যালোচনা করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

একই সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। তবে কর অব্যাহতি বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; সংশ্লিষ্ট আইন, নীতিমালা ও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিতে হবে।

কর আদায়ের চাপ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

রাজস্ব আদায় বাড়ানোর তাগিদে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে বৈধ ব্যবসা ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, কর নির্ধারণ, নিরীক্ষা, শুল্কায়ন কিংবা মামলা নিষ্পত্তিতে কর্মকর্তাদের বিবেচনামূলক ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

কর ফাঁকির অভিযোগে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কর দাবি করা হলে সেই দাবির ভিত্তি, তদন্তের অগ্রগতি, আপিলের অবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত কত টাকা আদায় হয়েছে—এসব তথ্য স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

বড় অঙ্কের কর দাবি উত্থাপন আর সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া এক বিষয় নয়। তাই অভিযান, মামলা কিংবা নিরীক্ষায় শনাক্ত অনিয়মের সংখ্যার পাশাপাশি প্রকৃত আদায়ের হিসাবও সামনে আনতে হবে।

কর মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা, আদায়যোগ্য বকেয়া আদায়ে বিলম্ব এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বৈষম্যের আশঙ্কা থাকলে সেগুলোও নথিভিত্তিকভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। রাজস্ব প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঘুষ, অনৈতিক সমঝোতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিজিটাল নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়ানোর তাগিদ

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে একই করদাতার ঘোষিত আয়, ব্যবসায়িক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানি এবং সম্পদের মধ্যে অসংগতি শনাক্ত করা সহজ হবে।

এনবিআরের প্রতিটি বিভাগে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, আদায়ের অগ্রগতি, বকেয়া, অনিষ্পন্ন মামলা, নিরীক্ষায় শনাক্ত অনিয়ম এবং প্রকৃত আদায়ের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।

একইসঙ্গে করদাতাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ আপিল প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

কর কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়নও শুধু কত টাকার দাবি উত্থাপন করা হলো, তার ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। বরং প্রকৃত রাজস্ব আদায়, কর ফাঁকি শনাক্ত, বকেয়া নিষ্পত্তি, সেবার মান এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকারিতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বড় লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার

সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ বাজেট বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু জরিমানা, নোটিশ ও অভিযানের ওপর নির্ভর করে টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

এজন্য করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকির বড় উৎস শনাক্ত, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার প্রতিরোধ, বকেয়া আদায়, কর অব্যাহতির যৌক্তিকতা পর্যালোচনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ করদাতাদের হয়রানি কমিয়ে কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করা জরুরি।

এনবিআরের সামনে এখন দ্বিমুখী পরীক্ষা—একদিকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণ, অন্যদিকে রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। অর্থবছর শেষে শুধু কত টাকা আদায় হলো, তা দিয়েই সাফল্য বিচার করা যাবে না। কতটা কর ফাঁকি বন্ধ হলো, কতটা বকেয়া আদায় হলো, অনিয়মের কতটা প্রতিকার হলো এবং করদাতাদের আস্থা কতটা বাড়ল—এসব সূচকও হবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সাফল্য পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত