বাংলা গদ্যের অন্যতম পথপ্রদর্শক

সুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এয়াকুব আলীর ১৩৮তম জন্মবার্ষিকী পালিত

নেহাল আহমেদ প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১২:০১ পিএম

মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ১৮৮৮ সালের ৪ নভেম্বর (১৮ কার্তিক ১২৯৫ বঙ্গাব্দ) রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার মাগুরাডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন

'মানব মুকুট’, ‘শান্তিধারা’, ‘ধর্মের কাহিনী’ ও ‘নূরনবী’র মতো কালজয়ী গ্রন্থের রচয়িতা, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মনীষী সুসাহিত্যিক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর ১৩৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর সাহিত্যকর্ম, জীবনাদর্শ ও বাংলা সাহিত্যে অবদান স্মরণে আলোচনা সভা, কুইজ ও রচনা প্রতিযোগিতা, সম্মাননা স্মারক প্রদান এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বেলা ১১টায় এয়াকুব আলী চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগার ও ক্লাবের উদ্যোগে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে জন্মবার্ষিকীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিফাতুল হকের সভাপতিত্বে ও এয়াকুব আলী চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগার ও ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুল আলম সোহরাবের সঞ্চালনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদ আহম্মেদ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. গিয়াস উদ্দিন খান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম, সমবায় কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা এ কে এম শাহনেওয়াজ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. চাঁদ আলী খান, রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান রাজা, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রেজাউল করিম রিংকু, পাংশা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত আলী সরদারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাহিত্যিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা করেন অতিথিরা। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কুইজ ও শিশু কিশোরদের রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পরে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় এবং গুণীজনদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।

বর্ণাঢ্য জীবন

​মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ১৮৮৮ সালের ৪ নভেম্বর (১৮ কার্তিক ১২৯৫ বঙ্গাব্দ) রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার মাগুরাডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা এনায়েতুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার।

পাংশা হাইস্কুল থেকে এমই এবং রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে সফলতার সাথে এন্ট্রান্স পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়ায় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখেই ফিরে আসতে বাধ্য হন।

​সাহিত্যচর্চা, সম্পাদকীয় ভূমিকা ও রাজনৈতিক অবদান

​শিক্ষাজীবন বিঘ্নিত হলেও সাহিত্য ও সমাজসেবা থেকে বিচ্যুত হননি তিনি। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, বিশিষ্ট সাহিত্যিক রওশন আলী চৌধুরী (খ্যাতমান ‘কোহিনূর’ পত্রিকার সম্পাদক) অসুস্থ হয়ে পড়লে এয়াকুব আলী চৌধুরী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

​পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করেন। ১৯২০-২১ খ্রিষ্টাব্দে পাংশা হাইস্কুলে শিক্ষকতাকালে তিনি তীব্রভাবে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অপরাধে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

​কারামুক্তির পর তিনি শিক্ষকতা ত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান এবং মেজো ভাই আওলাদ আলী চৌধুরীর সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ১৯১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও কয়েক বছর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া কবি গোলাম মোস্তফার সঙ্গে যৌথভাবে সমিতির মাসিক পাত্র ‘সাহিত্যিক’ (১৯২৬) সম্পাদনা করেন।

​সাহিত্যকর্ম ও ভাষাপ্রীতি

​মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ছিলেন বিশ শতকের শুরুতে বাঙালি মুসলিম সমাজের মাতৃভাষা বিতর্কের অন্যতম পথপ্রদর্শক। বাংলা না উর্দু—এই বিতর্কে তিনি অনমনীয়ভাবে বাংলা ভাষার পক্ষ অবলম্বন করেন।

​ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি তাঁর রচনার মূল উপজীব্য হলেও হিন্দু-মুসলিম প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল তাঁর রচনার মূলসুর। তাঁর রচনার শৈল্পিক মাধুর্য ও বক্তব্যের গভীরতা সুধীজনের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

​তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো ​ধর্মের কাহিনী (১৯১৪), ​নূরনবী (১৯১৮) — উল্লেখ্য, এই গ্রন্থটিতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশংসাবাণী যুক্ত রয়েছে। এছাড়াও ​শান্তিধারা (১৯১৯), ​মানব মুকুট (১৯২২) অন্যতম বই।

​পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি তাঁর অপ্রকাশিত রচনাগুলো একত্র করে আমীনুর রহমানের সম্পাদনায় ‘এয়াকুব আলী চৌধুরী অপ্রকাশিত রচনা’ নামে একটি বিশেষ গ্রন্থ প্রকাশ করে।

​শেষ জীবন ও স্মৃতি

​দুই ভাইয়ের অকালমৃত্যুর পর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়ে। পারিবারিক শোক, দারিদ্র্য ও মানসিক কষ্টে তিনি ক্ষয়রোগে (যক্ষ্মা) আক্রান্ত হন। জীবনের শেষ চার-পাঁচ বছর তিনি গ্রামের বাড়িতে জীবনমৃত অবস্থায় অতিবাহিত করেন। সাহিত্যিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মৃত্যুর দুই বছর আগে তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার তাঁর জন্য মাসিক ২৫ টাকা সাহিত্যিক বৃত্তি মঞ্জুর করেছিল।

​বাংলা গদ্যের শক্তিশালী রূপকার, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ১৯৪০ সালের ১৫ ডিসেম্বর ফরিদপুরে অবস্থানকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইসলামের মহান আদর্শ, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ রচনারীতি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

​তাঁর স্মৃতি ও অবদানকে বাঁচিয়ে রাখতে রাজবাড়ীর পাংশায় তাঁর নামে একটি বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলা গদ্যসাহিত্যে তাঁর অনবদ্য অবদান আজও পাঠক ও গবেষকদের অনুপ্রেরণার উৎস। ​এই মহান সাহিত্যিকের প্রয়াণ দিবসে দ্য ফিন্যান্স টুডে পরিবারের পক্ষ থেকে রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত