‘তেহরান সম্মেলন: জল নাকি মরীচিকা?’
ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদপত্র কায়হানের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হোসেইন শরিয়ত মাদারির আশঙ্কা, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে গেলে তেহরানকে হুথিদের থেকে দূরত্ব তৈরির জন্য চাপ দেওয়া হতে পারে
‘তেহরান সম্মেলন: জল নাকি মরীচিকা?’
ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদপত্র কায়হানের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হোসেইন শরিয়ত মাদারি তেহরানে চার দেশের সাম্প্রতিক বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ‘তেহরান সম্মেলন: পানি, নাকি মরীচিকা?’ শিরোনামের এক মন্তব্যে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগের আড়ালে ইরানের ওপর ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
তেহরানে সোমবার (২৬ অক্টোবর) ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মতির কথা জানানো হলেও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকট নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি|র ঘোষণা আসেনি।
শরিয়ত মাদারির আশঙ্কা, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে গেলে তেহরানকে হুথিদের থেকে দূরত্ব তৈরির জন্য চাপ দেওয়া হতে পারে। তবে ইরানের এই কট্টরপন্থী ভাষ্যকার জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরানের হুথিদের পরিত্যাগ করা উচিত হবে না।
ইয়েমেন প্রশ্নে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌদি আরব হুথিদের হামলা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে চায়। অন্যদিকে, ইরানের কট্টরপন্থীদের একটি অংশ হুথিদের সঙ্গে সম্পর্ককে তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখে।
ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার উদ্যোগকে ইরানের কেউ কেউ প্রভাব বিস্তারের স্বীকৃতি হিসেবে দেখলেও শরিয়ত মাদারির মতো কট্টরপন্থীরা সম্ভাব্য ছাড় নিয়ে সন্দিহান। তার মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আঞ্চলিক সমঝোতার প্রশ্নে ইয়েমেন ও হুথিদের অবস্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান হেশমাতুল্লাহ ফালাহাতপেশেহ মন্তব্য করেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের চেয়ে সফররত দেশগুলোর কাছে ইয়েমেন ইস্যুটি অনেক বেশি জরুরি। তিনি ‘খবর অনলাইন’-কে বলেন, “যতদিন ইয়েমেন সমস্যার সমাধান না হবে, ততদিন ইরানের বিষয়টি আলোচনার এজেন্ডায় আসবে না।”
পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা প্রশমন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইরান, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক শুরু হয়েছে তেহরানে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) শুরু হওয়া এ আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক আগ্রাসনের প্রভাব এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতি সমর্থনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানিয়েছে ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
বৈঠকে অংশ নিতে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান আল সৌদ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন।
ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ জানিয়েছে, চার দেশের এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এবং উত্তেজনা কমানোর উপায় খুঁজে বের করা। বিশেষ করে সামরিক আগ্রাসনের পরিণতি মোকাবিলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতি সমর্থনের বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে।
বৈঠক শেষে অংশগ্রহণকারীরা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন, তবে কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এর আগে বুধবার রয়টার্স আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছিল, কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা রবিবার তেহরানের কাছে একটি খসড়া শান্তি চুক্তি পেশ করেছিলেন।
প্রস্তাবিত এই কাঠামোতে সাত দিনব্যাপী একটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছিল, যেখানে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে প্রতিদিন পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হতো। এই প্রক্রিয়ায় কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা প্রদানের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরবর্তী মন্তব্যগুলো এই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে, প্রস্তাবিত ধারণাগুলোকে আদৌ কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করা যায় কি না
ওয়াশিংটন চায় আলোচনার শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক; অন্যদিকে তেহরান জোর দিয়ে বলছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং তাদের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ইরানি বিশ্লেষকরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নেবে না আঞ্চলিক শক্তিগুলো কি তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে?
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্রের কূটনৈতিক সম্পাদক মরিয়ম সালারি যুক্তি দিয়েছেন, তেহরান যদি ছাড় দেয়, তবে আরেকটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে তারা কী ধরনের নিশ্চয়তা পাবে? এদিকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফ এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য পারস্পরিক আস্থা তৈরির ওপর ভিত্তিও ওপর জোর দিয়েছেন।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। তবে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। ” ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরান একটি চুক্তি করতে চায়। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানি নেতারা হয়তো নির্বাচনের পর পর্যন্ত আলোচনা বিলম্বিত করছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইসরায়েলের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তিনি ‘ইরানি হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তা চিরতরে নির্মূল করার। ইসরায়েলের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোয় সৃষ্ট রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই তার এই মন্তব্য এলো।
Shamiur Rahman
