⊕ ক্রেতাসংকট ⊕ কতিপয় ব্যবসায়ীর প্রতারণা ⊕ এক দশকে ধাপে ধাপে পতন
শেষ পর্যন্ত বন্ধই হয়ে গেলো কর্নফুলী শপিং কমপ্লেক্স
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকের শাটার বন্ধ। তার ওপরে একটি পিভিসি ব্যানার ঝুলছে, ‘১ অক্টোবর হতে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকিবে
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক মন্দা, তীব্র ক্রেতাসংকট এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে রাজধানীর কাকরাইল-শান্তিনগর মোড়ে অবস্থিত দুই দশকের পুরোনো শপিং মল 'কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স' সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকের শাটার বন্ধ। তার ওপরে একটি পিভিসি ব্যানার ঝুলছে, ‘১ অক্টোবর হতে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকিবে’।
১৯৯৮ সালে কর্ণফুলী গ্রুপের হাত ধরে শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে যাত্রা শুরু করা ২০ তলা এই ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল শপিং মল, চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট ও বাগান। চালুর সময় এখানে ১৯৮টি দোকান ছিল। তবে বন্ধের সময় ভেতরে মাত্র ১৭টি আর বাইরের রেস্তোরাঁ মিলে মোট ২৫টি দোকান খোলা ছিল।
মগবাজার-মালিবাগ-শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় দীর্ঘ কয়েক বছর ওই এলাকায় তীব্র যানজট ও চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে মার্কেটে ক্রেতাদের আনাগোনা মারাত্মকভাবে কমে যায়। সে সময় অনেক নামী ও ভালো ব্যবসায়ী অস্থায়ীভাবে অন্য মার্কেটে দোকান সরিয়ে নেন এবং রাস্তা ঠিক হওয়ার পরও আর ফিরে আসেননি।
মার্কেটের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জিঞ্জিরা ও চকবাজার থেকে আনা নিম্নমানের প্রসাধনী ও তৈরি পোশাক দুবাই বা অন্যান্য বিদেশি পণ্য বলে বিক্রি করতেন। এই জালিয়াতির অভিযোগের কারণে প্রমিয়াম ও বিশ্বস্ত ক্রেতারা মার্কেটটির ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেন।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমবায় সমিতির নেতারা জানান, বিপণিবিতানটিতে শুরুতে তৈরি পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, টেইলার্স, জুয়েলারিসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির দোকান ছিল। চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট। ১৯৮টি দোকান থাকলেও বন্ধ হওয়ার আগে ২৫টি দোকান চালু ছিল।
কমপ্লেক্সের নীচতলায় বাঁ পাশে কাচ্চি ভাই ও হট কেকের বিক্রয়কেন্দ্র। অন্যদিকে রেমন্ডের বিক্রয়কেন্দ্র। রেমন্ড বিক্রয়কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, ‘মার্কেট বন্ধ হলেও আমাদের দোকানের মালিক এখনো নোটিশ দেননি। নোটিশ দিলে আমাদের চলে যেতে হবে।’
রেমন্ডের পাশে জ্ঞান বিচিত্রা নামের একটি কফিশপের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যবসা ভালো চলছে না। আগামী মাসে আমরাও দোকান ছেড়ে দেব।’
অন্যদিকে সুমি’স হটকেক বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বললেন, ‘আমাদের দোকানের মালিক এখনো কিছু জানাননি। ফলে আমরা থাকব নাকি ছাড়ব, সেটি এখনো নিশ্চিত না।’ বিপণিবিতানটির ব্যবসা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, অনেক দিন ধরেই ক্রেতাশূন্য ছিল বিপণিবিতানটি।
১০ বছরের বেশি সময় ধরে বিপণিবিতানটির বেচাবিক্রি ধীরে ধীরে কমতে থাকে বলে জানালেন কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী। তিনি বলেন, মূলত তিন–চারটি কারণে শপিং মলটি ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছিল। তাই দোকানমালিকেরা সবাই মিলেই মালিকানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাকীবিল্লাহ ওসমানী আরও জানান, গত দশকে মগবাজার–মালিবাগ উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় তীব্র যানজটের কারণে বিপণিবিতানটিতে ক্রেতাসমাগম ব্যাপকভাবে কমে যায়। তখন বেশ কয়েকজন দোকানমালিক আশপাশের বিভিন্ন মার্কেটে অস্থায়ীভাবে দোকান সরিয়ে নেন। তবে উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর তারা নতুন জায়গা ছেড়ে আর ফেরেননি। পরবর্তী সময়ে মহামারি করোনাভাইরাসের ধাক্কায় শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলোও পরে আর চালু হয়নি। তা ছাড়া মার্কেটে থাকা বেশ কিছু প্রসাধনীর দোকানে মানহীন পণ্য বিক্রির অভিযোগেও বিপণিবিতানের সুনাম নষ্ট হয়।
তিনি বলেন, সর্বসম্মতিক্রমে শপিং কমপ্লেক্সটি বন্ধ করার এবং এর বাণিজ্যিক স্পেসগুলো হাসপাতাল, ব্যাংক বা কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি বা লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে মার্কেটের মূল ভবন বন্ধ হলেও এর সামনের রাস্তার দিকের কয়েকটি ফুড আউটলেট ও ব্র্যান্ড শোরুম বর্তমানে আংশিক চালু রয়েছে
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণ করেছিল কনর্ফুলী গ্রুপ। এই গ্রুপের মালিকানায় আছেন সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী।
Shamiur Rahman
