১ কোটি ৩০ লাখ টিআইএনধারী, রিটার্ন দেননি ৮০ লাখ

রাজস্ব আদায়ে করদাতাদের বাড়ি বাড়ি এনবিআরের চিঠি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৫৭ পিএম

মৃত ও নিষ্ক্রিয় করদাতা শনাক্তে উদ্যোগ এনবিআরের | চিঠির ৪০ শতাংশ ফেরত, জবাব দেন মাত্র ১০ শতাংশ | আয়কর আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা

দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। অথচ গত অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ করদাতা। সেই হিসাবে প্রায় ৮০ লাখ টিআইএনধারী রিটার্ন জমা দেননি। তাঁদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন, কতজনের করযোগ্য আয় নেই আর কতজন ইচ্ছাকৃতভাবে রিটার্ন দিচ্ছেন না—তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে।

করজালের বিস্তৃতি বাড়লেও বিপুলসংখ্যক 'টিন'ধারীর রিটার্ন না দেওয়ার এই চিত্র রাজস্ব প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রকৃত করদাতা শনাক্ত করা, নিষ্ক্রিয় টিআইএনধারীদের চিহ্নিত করা এবং রিটার্ন দাখিলের হার বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এজন্য রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তিদের ঠিকানায় চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এনবিআর কর্মকর্তাদের ধারণা, রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ মারা গেছেন। আবার অনেকে ফ্ল্যাট, জমি, গাড়ি কেনা কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজনে টিআইএন (টিন) নিলেও বর্তমানে তাঁদের করযোগ্য আয় নেই। ফলে প্রকৃত করদাতা, মৃত ব্যক্তি ও নিষ্ক্রিয় টিআইএনধারীদের আলাদা করতে না পারায় কর প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

চিঠি পাঠিয়েও মিলছে না সাড়া

রিটার্ন জমা না দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করে কর অঞ্চলগুলোর মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু করদাতাদের ঠিকানা ভুল কিংবা হালনাগাদ না থাকায় পাঠানো চিঠির প্রায় ৪০ শতাংশ ফেরত আসছে। অন্যদিকে, চিঠির জবাব দিচ্ছেন মাত্র ১০ শতাংশ করদাতা। জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকটও নজরদারি বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে করদাতাদের তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি রিটার্ন দাখিলের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। মৃত ব্যক্তিদের নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি এবং এনবিআরের বিদ্যমান তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করা জরুরি।

মৃত টিআইএনধারীদের তথ্য মিলিয়ে দেখার পরিকল্পনা

দীর্ঘদিন ধরে রিটার্ন জমা না দেওয়া টিআইএনধারীদের মধ্যে মৃত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ইসির তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে এনবিআর। ভোটার তালিকা থেকে মৃত্যুর কারণে বাদ পড়া ব্যক্তিদের তথ্যের সঙ্গে এনবিআরের টিআইএন তথ্যভান্ডার মিলিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তিদের টিআইএন শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে মৃত ব্যক্তি কিংবা অপ্রয়োজনীয় টিআইএন সরাসরি অনলাইনে বাতিলের ব্যবস্থা নেই। মৃত ব্যক্তির টিআইএন বাতিল করতে তাঁর উত্তরাধিকারীকে সংশ্লিষ্ট কর অফিস বা সার্কেলে আবেদন করতে হয়।

সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অভাবে মৃত ব্যক্তিদের টিআইএন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তিদের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

টিআইএন আছে, রিটার্ন নেই

মৃত ব্যক্তিদের পাশাপাশি নিষ্ক্রিয় টিআইএনধারীদের শনাক্ত করতেও কর অঞ্চলগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ না থাকায় প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে বলে এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, বিপুলসংখ্যক টিআইএনধারী থাকলেও তাঁদের সবাইকে কার্যকরভাবে করজালের আওতায় আনা যাচ্ছে না। আবার রিটার্ন জমা দেওয়া করদাতাদের একাংশ শূন্য রিটার্ন দিচ্ছেন। ফলে শুধু টিআইএনধারীর সংখ্যা দিয়ে করজালের প্রকৃত বিস্তৃতি কিংবা রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা পরিমাপ করা কঠিন।

কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, যাঁদের টিআইএন রয়েছে, তাঁদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক, সেখানে নিয়মটির যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন।

তাঁর মতে, রিটার্ন দাখিল বাড়াতে করব্যবস্থা সহজ করার পাশাপাশি করদাতাদের উৎসাহিত করতে যৌক্তিক কর-সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা বড়, আদায় কম

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আয়কর খাত থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর। তবে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতে আদায় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

এই অবস্থায় শুধু করের হার কিংবা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। করযোগ্য আয় রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধের পাশাপাশি বিদ্যমান তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত ও নিষ্ক্রিয় টিআইএনধারীদের আলাদা করা গেলে কর প্রশাসনের কাজ সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত করদাতাদের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করা, করদাতাদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য সমন্বয় করা গেলে করজালের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।

বিপুলসংখ্যক টিআইএনধারী থাকা সত্ত্বেও তাঁদের একটি বড় অংশের রিটার্ন না দেওয়ার কারণ নির্ধারণ এখন এনবিআরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত করদাতা শনাক্ত ও রিটার্ন দাখিলের হার বাড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে রাজস্বের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত