লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও আদায় হয়নি | ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ১৫.৮১ শতাংশ

ভ্যাট আদায়ে বড় ধাক্কা, তিন মাসে ঘাটতি ২৮ হাজার কোটি টাকা

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০১:০৬ পিএম

ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে মাসিকের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার সুযোগ চালু করা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তদারকি আদায়ে ঘাটতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ভ্যাট কর্মকর্তারা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান খাত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ২৮ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় কমেছে ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। ভ্যাট আদায়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।

এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। অর্থবছরের শুরুতেই আদায়ে এমন বড় ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভ্যাট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে মাসিকের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার সুযোগ চালু করা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তদারকি আদায়ে ঘাটতির অন্যতম কারণ।

এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা কম ভ্যাট এসেছে। এ ছাড়া, আরও কিছু খাতে আদায় কম হয়েছে। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভ্যাট আদায় বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাটে। প্রথম তিন মাসে এ ইউনিটের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ১২ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। এ সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৩১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আদায়ও কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।

চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটে প্রথম তিন মাসে আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। এই খাতে ঘাটতি ২৬৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে ২ হাজার ৯৬ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। বরিশাল ভ্যাট কমিশনারেটেও আদায়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এনবিআরের সাবেক সদস্য (ভ্যাট নীতি) ড. আব্দুর রউফ বলেন, গত এক যুগে এনবিআরের রাজস্ব আহরণে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ে আরও প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু সমীক্ষা ছাড়াই রিটার্ন জমার নিয়ম পরিবর্তন করায় আদায়ে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তার ব্যাখ্যা, মাসিক রিটার্নের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার সুযোগ পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট জমা দেয়নি। ফলে সেপ্টেম্বর নাগাদ আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বেতন-ভাতা, ব্যাংক ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তি পিছিয়ে পড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে, এনবিআরের কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, রিটার্ন জমার নিয়ম পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্বলতা, পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব এবং ঘন ঘন কর্মকর্তা বদলির প্রভাবও রাজস্ব আদায়ে পড়েছে। তাদের দাবি, পদায়নে বৈষম্য ও প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে মাঠপর্যায়ে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।

রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাট আদায়ের ঘাটতি মোকাবিলায় শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করলেই হবে না; রিটার্ন জমার সময়সীমা পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি জোরদার, বড় করদাতাদের কাছ থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোন খাতে কতটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার কারণভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা কঠিন হবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত