সিসির পর কে?
মিসরে ক্ষমতার মঞ্চ সাজাচ্ছে সেনাবাহিনী
সিসির সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাকে ক্ষমতায় রাখার জন্য জনসাধারণের পক্ষ থেকে দাবি তোলার সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে
আগামী ২০৩০ সালের এপ্রিলে ক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদ শেষ হবে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির। এরপর তিনি মসনদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার এই ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হচ্ছিল, ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়াতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেবেন সিসি।তবে সিসির এই ঘোষণার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, তার এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ব্যক্তিগত ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, বরং তার বিদায়ের পরও মিসরে সামরিক বাহিনীর আধিপত্য বজায় রাখা।
সম্প্রতি মিসরের সামরিক একাডেমির এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সিসি বলেন, ২০৩০ সালে তার ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সংবিধান নিয়ে কেউ কারসাজি করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে অতীতে তার বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপের অমিল থাকায় ঘোষণাটি নিয়ে সংশয়ও রয়েছে।
২০১৩ সালে মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন সিসি। ওই অভ্যুত্থানের পর হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে এবং হাজার হাজার রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মী ও সাংবাদিক কারাবন্দী হন।
দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সিসি সরকারের জন্য বড় সমালোচনার কারণ। বিরোধীদের অভিযোগ, দুর্নীতি, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জাঁকজমকপূর্ণ প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অর্থনীতি চাপে পড়েছে।
মিসরের সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮১ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সরকারি কর্মীদের বেতন ও ভর্তুকিতে সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
২০১৪ সালের পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে মিসরীয় পাউন্ডের মূল্য ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে ক্রমপুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি ৪৬০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সিসির ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণার অন্তত তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
প্রথমত, ঘোষণাটি দিয়ে তিনি চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পক্ষে জনসমর্থন তৈরির সুযোগ করে দিতে পারেন। ২০১৭ সালে সংবিধানের চার বছর মেয়াদি দুই মেয়াদের সীমা অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকার করলেও ২০১৯ সালে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন তিনি। সংশোধনীর ফলে তার ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
সংবাদমাধ্যম মাদা মাসরকে এক বিচার বিভাগীয় সূত্র জানিয়েছে, সিসির সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাকে ক্ষমতায় রাখার জন্য জনসাধারণের পক্ষ থেকে দাবি তোলার সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হলে সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকানোর কৌশল হতে পারে এই ঘোষণা। ২০১১ সালে গণবিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারককে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল সেনাবাহিনী। একইভাবে জনরোষ প্রশমিত করতে সিসিকে সরিয়ে সেনাবাহিনী এমন কাউকে ক্ষমতায় আনতে পারে, যিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক স্বার্থও সুরক্ষিত রাখবেন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হলো, সিসি এমন একটি ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া তৈরি করতে চাইছেন, যাতে তার বিদায়ের পরও রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অটুট থাকে।
এক্ষেত্রে সংবিধানের ২০০ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালে সংশোধিত ২০০ অনুচ্ছেদে দেশটির ‘গণতন্ত্র’ এবং জনগণের ‘অর্জন, অধিকার ও স্বাধীনতা’ রক্ষার দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ২৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের আগে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন।
সিসির প্রস্তাব অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটি গঠন করে কয়েক শ উচ্চশিক্ষিত মিসরীয়কে সামরিক একাডেমিতে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা হবে। আবেদনকারীদের বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং তাদের পিএইচডি ডিগ্রি থাকতে হবে। প্রশিক্ষণ চলবে ৩০ মাস। ভবিষ্যৎ মন্ত্রী, গভর্নর ও সংসদ সদস্য তৈরির লক্ষ্যেও এই কর্মসূচি পরিচালিত হবে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে সামরিক বাহিনীর পছন্দের ব্যক্তিরাই ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন। এতে সিসির শাসনামলের হত্যাযজ্ঞ, দুর্নীতি কিংবা অন্যান্য অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়তে পারে।
এখন প্রশ্ন, সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এমন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটের গুরুত্ব কমে যায়, তা মিসরের ক্রমবর্ধমান অসন্তুষ্ট জনসাধারণ কতটা মেনে নেবে।
সিসি ও সেনাবাহিনী দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেদের মতো করে সাজাতে চাইছে। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতিক্রিয়াই এই পরিকল্পনার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা
Shamiur Rahman
