রাজস্ব খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম রোধে গণমাধ্যমের নজরদারি জরুরি
অনুসন্ধানের তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা; সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি
সাংবাদিকদের সঙ্গে তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ, অভিযোগের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই আস্থা তৈরি হয়
যে সমাজে সাংবাদিকের প্রশ্নে ক্ষমতাবানরা অস্বস্তি বোধ করেন, সেখানে সত্য আড়াল করার প্রবণতা বাড়ে। আর সত্য প্রকাশের জবাব যখন আসে অপমান, হুমকি কিংবা বুলেটের মাধ্যমে, তখন বিপন্ন হয় মানুষের জানার অধিকার, দুর্বল হয়ে পড়ে জবাবদিহি এবং সংকুচিত হয় গণতন্ত্রের পরিসর। সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে নীরব করা যায়, কিন্তু তাতে অনিয়মের দায় মুছে যায় না, সত্যের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায় না।
বর্তমানে সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহার এমনভাবে জেকে বসেছে যা এককথায় অকল্পনীয়। প্রশাসনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুন্ন হচ্ছে ঠিক তেমনি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই কারণেই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজস্ব খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাধীন গণমাধ্যমের নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমস ও বন্ড ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য অনিয়ম চিহ্নিত করা, সরকারি অর্থের ক্ষতি তুলে ধরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে তথ্যপ্রাপ্তির জটিলতা, প্রভাবশালী মহলের চাপ, আইনি হয়রানি ও নিরাপত্তাঝুঁকি এ ধরনের সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাবানদের প্রশংসা করা নয়। তাঁর দায়িত্ব তথ্য অনুসন্ধান, অসংগতি চিহ্নিত করা, অনিয়মের প্রশ্ন তোলা এবং জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরা। কোনো প্রতিবেদন কারও স্বার্থে আঘাত করতে পারে, কোনো প্রশ্নে বিব্রত হতে পারেন কোনো কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি। কিন্তু সেই অস্বস্তি থেকে সাংবাদিকদের অবজ্ঞা করা কিংবা পুরো পেশাকে হেয় করার প্রবণতা তৈরি হলে তা উদ্বেগজনক।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং জটিল কর ও শুল্কবিধি বিশ্লেষণ। পাশাপাশি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা আইনি নোটিশ, মানহানির মামলা, পেশাগত চাপ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন। এই পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন কার্যালয়ে গেলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। দুর্নীতি অনিয়মের তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকরা নিজেদের পরিচয় গোপন করেই বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিসে যেয়ে থাকেন। একজন পেশাদার সাংবাদিক কখনোই কোন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারির অনুমতি নিয়ে কোন দফতরে প্রবেশ করেন না।
অতি সম্প্রতি একটি ভিডিও ক্লিপ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন সাংবাদিককে হেনস্তা করছেন একজন প্রভাবশালী কমিশনার। তিনি সাংবাদিককে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করছেন। তিনি তার ক্ষমতার দাম্ভিকতা এবং গণমাধ্যম অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম পরিচয় ব্যবহার করে উক্ত সাংবাদিককে ভয়ভীতি প্রদর্শণ করছেন। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরার শামিল।
ইতিপূর্বে দেখা গেছে, যারা গণমাধ্যমকে নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করেছেন তাদের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিলো তা সবাই দেখেছেন। হাতে চুড়ি পরে কখনও সাংবাদিকতা হয় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমান ছাড়াই কতিপয় ভুইফোড় সাংবাদিক বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়াচ্ছে। কিন্তু গণমাধ্যমকে অপসাংবাদিকতা করার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অপসাংবাদিকতা রোধ এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার রোধ জরুরী। কিন্তু গণমাধ্যমকে অবাধ সাংবাদিকতা করার জন্য দূর্নীতির আখড়ায় পরিণত হওয়া সরকারি কার্যালয়গুলোতে অবাধ প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া জরুরী।
সাংবাদিকের সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। সাংবাদিকেরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের কেউ অনৈতিক কাজ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো পেশার ওপর চাপানো যেমন অন্যায়, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়ম করাও গ্রহণযোগ্য নয়। পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি কিংবা হত্যার ঘটনায় বিচারহীনতা অপরাধীদের সাহস বাড়াতে পারে। এতে শুধু সংবাদমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্যও আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। মানুষ তখন সরকারি সেবা, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা প্রভাবশালী মহলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ পেশার বাড়তি সুবিধা নয়; এটি আইনের শাসন ও নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার রক্ষার অংশ। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। হামলার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
একইসঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও পেশাগত ঐক্য, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে দৃঢ় থাকতে হবে। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অপরিহার্য। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে পেশাগত সততাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও বুঝতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ মনে করলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান হয় না। বরং সাংবাদিকদের সঙ্গে তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ, অভিযোগের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই আস্থা তৈরি হয়।
রাজস্ব খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে করনীয়
রাজস্ব খাতে কর ফাঁকি, আমদানি পণ্যের মূল্য কম ঘোষণা, ভুল এইচএস কোড ব্যবহার, ভ্যাট ফাঁকি এবং শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মতো অভিযোগ ওঠে। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতি নিরূপণে আমদানি-রপ্তানির নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। তবে অভিযোগ বা অনিয়মের ঝুঁকি থাকলেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
রাজস্ব নিয়ে প্রতিবেদনে কত টাকা ফাঁকি শনাক্ত হয়েছে, কত টাকা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছে এবং বাস্তবে কত টাকা আদায় হয়েছে—এসব তথ্য আলাদাভাবে তুলে ধরা জরুরি। কারণ শনাক্ত রাজস্ব ক্ষতি আর আদায় হওয়া অর্থ এক নয়। একই সঙ্গে তদন্ত, মামলা ও বকেয়া আদায়ের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত ফলোআপ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি বাড়তে পারে।
রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়াতে কার্যকর নিরীক্ষা, ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি জানানো প্রয়োজন। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি তথ্য সংগ্রহের সুযোগও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সহায়ক হতে পারে।
তবে দুর্নীতি উন্মোচনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও পেশাগত সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, একাধিক সূত্রের সঙ্গে তথ্য মেলানো এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়া অপরিহার্য। প্রমাণিত তথ্য ও অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখলে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে।
রাজস্ব খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধ শুধু গণমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এর জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং প্রকাশিত অভিযোগের পরিণতি পর্যন্ত নজরদারি—এই তিনের সমন্বয়ই রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাংবাদিককে অপমান করে প্রশ্ন থামানো যায়, গুলি করে একজন সাংবাদিকের জীবন কেড়ে নেওয়া যায়; কিন্তু তাতে সত্যের প্রয়োজন শেষ হয় না। যে সমাজ সত্য প্রকাশের অধিকার নিরাপদ রাখতে পারে না, সে সমাজে অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সাংবাদিকের মর্যাদা রক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিচার করা কোনো গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।
Shamiur Rahman
