একই পরিবারের ৬ জনসহ নিহত ১০, আহত ৯; গ্যাস সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণের শঙ্কা

অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল অনুমোদনহীন টুপটুপ রিসোর্ট; ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা উপেক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫২ পিএম

১৭ অক্টোবর (শনিবার) দুপুরে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ এই কথা জানান

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সরাসরি দায়ী করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, অনুমোদন ছাড়াই তারা একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে রিসোর্টের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলো। 

আজ ১৭ অক্টোবর (শনিবার) দুপুরে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ এই কথা জানান। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতির বিষয়ে জানাতে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

জুনাইদ জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চার মাস আগে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স। জুন মাসে ফায়ার সার্ভিসের একজন পরিদর্শক রিসোর্টটি পরিদর্শন করেন এবং ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ জুন আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেন।

তিনি আরও বলেন, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বিধি লঙ্ঘন করে ব্যবসা চালিয়ে গেছে। সরাসরি বললে, অনুমোদন ছাড়াই তারা রিসোর্টটি পরিচালনা করছিল। অগ্নিকান্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। রিসোর্টের মালিক মো. তানভিরকেও ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান এবং উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার হৃদয়বিদারক এবং মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডে ১০ জন নিহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার প্রাথমিকভাবে জানান, নিচতলার রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন।

এসপি এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দীর্ঘক্ষণ অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন। মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, নারী ও পুরুষের পার্থক্য নির্ণয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় পর্যটন এলাকাকে আধুনিক ও পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অবহেলা ও অক্ষমতার কারণে এলাকাটি ক্রমেই ঘিঞ্জি হয়ে উঠছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এমএ মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগুনের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ এবং রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে। তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য দায় নির্ধারণ করা হবে।

অন্যদিকে, উখিয়া-টেকনাফের পর্যটন এলাকায় যথাযথ পরিকল্পনা, অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে ওঠার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং গ্যাস সংযোগ নিয়মিত পরিদর্শন করা জরুরি।

উল্লেখ্য, শনিবার সকালে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে একই পরিবারের ৬ জনসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের সকলেই ছিলেন পর্যটক। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯ জন। আহতদের মধ্যে ৫ জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে অদ্যাবধি ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মদ।

অগ্নিকাণ্ডে আহতদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২) রয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভি পরস্পরের কাজিন। বাকিদের মধ্যে ফারিহা কবির নাফিজের বড় বোন এবং ফাইজান ভাগ্নে। এই পরিবারের নয়জন সদস্য ওই রিসোর্টে বেড়াতে গিয়েছিলেন। 

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, শনিবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেকের রিসোর্টটিতে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সাড়ে ৭টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় তারা।

পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। এসময় স্থানীয় লোকজনও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। বিভিন্ন কক্ষ তল্লাশি করে একে একে বের করা হয় নিহতদের মরদেহ। যেখানে একটি কক্ষের ওয়াশরুম থেকে উদ্ধার করা হয় একসঙ্গে ৪ জনের লাশ।

রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সবুক্তগীন মাহমুদ জানান, আগুনে দগ্ধ ৭ জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ৫ জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে রেফার করা হবে।

কাঠের অবকাঠামোয় ছড়িয়ে পড়ে আগুন

সরেজমিনে দেখা গেছে, মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত তিনতলা রিসোর্টটির বাইরের কাঠামো পাকা হলেও ভেতরের দেয়াল ও মেঝের বড় অংশ কাঠ দিয়ে তৈরি। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটির ৯টি কক্ষে ১৭ জন পর্যটক ছিলেন। সেখানে একই পরিবারের ৮ জন অবস্থান করছিলেন। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কয়েকজন জানালা ভেঙ বের হতে পারলেও অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন। আগুনের তীব্রতায় রিসোর্টের ভেতরের অংশ পুড়ে যায়।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, কাঠ দিয়ে তৈরি ৩ তলা রিসোর্টটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর অল্প সময়ের মধ্যে তিনতলা ভবনটি যেভাবে পুড়ে গেছে, তা সহজে বোধগম্য নয়। এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো ধরনের নাশকতা রয়েছে—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত