২১১ ধারায় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন

সম্পাদকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে বিপাকে বাদী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৩৯ পিএম

অভিযুক্ত শহীদুল ইসলাম

৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণ পায়নি পুলিশ, দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মোঃ খায়রুল আলম রফিককে অব্যাহতি চেয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল।

দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোঃ খায়রুল আলম রফিকের বিরুদ্ধে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছিলেন মোঃ শহিদুল ইসলাম।

অভিযোগ ছিল, সাংবাদিক বানানো ও পত্রিকায় পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তদন্তে অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ ও দালিলিক নথি উপস্থাপন করতে পারেননি মামলার বাদী শহিদুল ইসলাম।

তদন্ত শেষে মোঃ খায়রুল আলম রফিককে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ।একই সঙ্গে অভিযোগকারী ওই বাদী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মোঃ খায়রুল আলম রফিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন মোড়।

মামলার বিবাদী দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক মো. খায়রুল আলম রফিক। আর বাদী দৈনিক প্রলয় পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্টন মডেল থানার মামলা নম্বর ৭, তারিখ ৮ জুলাই ২০২৬ইং। মামলাটি তদন্ত করেন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) নুর আলম। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

পুলিশের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়,সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিককে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানানোর পাশাপাশি বাদী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় প্রসিকিউশন বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করা হয়েছে।

৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ-

মামলার এজাহারে শহিদুল ইসলামের অভিযোগ ছিল, তাকে সাংবাদিক বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে খায়রুল আলম রফিক তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এছাড়া পত্রিকায় পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মামলার সাক্ষী দৈনিক প্রলয় পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মির্জা সোবেদ আলী রাজার কাছ থেকে আরও ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। সব মিলিয়ে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। পরে অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে পল্টন মডেল থানা মামলাটি তদন্তে নেয়।

তদন্তকর্মকর্তা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, ঘটনার বিবরণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনার উদ্যোগ নেন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত শেষে কর্মকর্তার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ ও দালিলিক নথি জমা দিতে বাদীকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। এছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা ঘটনার স্থান, সময় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করতে গিয়ে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অবশেষে তদন্তে অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এতে সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিককে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বাদীর বিরুদ্ধেই ২১১ ধারায় ব্যবস্থা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। অন্যদিকে মামলার তদন্তে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়ার পাশাপাশি বাদীর উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খায়রুল আলম রফিককে হয়রানি, ক্ষতিগ্রস্ত, সম্মানহানি এবং দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। পরিপ্রেক্ষিতে বাদী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদনও করা হয়েছে।

এই ধারায় কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে জেনেশুনে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। একইভাবে, ২১১ ধারায় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করলেই বাদী অপরাধী সাব্যস্ত হন না। এ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে। বিবাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তালুকদারকে এ বিষয়ে চলতি মাসে শুনানি হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

৫ বছরে শতাধিক অভিযোগের দাবি

এই বিষয়ে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিক বলেন, শহিদুল ইসলাম একসময় তার প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। বিভিন্ন অভিযোগে তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন,গত প্রায় ৫ বছর ধরে শহিদুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় শতাধিক অভিযোগ দিয়েছেন। তার দাবি, এসব অভিযোগের অধিকাংশই তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।তিনি বলেন, “শহিদুল ইসলামকে যেন আল্লাহতালা হেদায়েত করেন।”

মামলার অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শহিদুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোন বন্ধ পাওয়া যাওয়ায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

আইনের চোখে ২১১ ধারা

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েম রেজা দণ্ডবিধির ২১১ ধারা সম্পর্কে বলেন, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে জেনেশুনে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে অপরাধের ধরন, প্রযোজ্য উপধারা ও মামলার পরিস্থিতির ওপর শাস্তি নির্ভর করে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ ধারায় ব্যবস্থা গ্রহণ ও শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

সব মিলিয়ে, ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পুলিশের তদন্তে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়ার কথা উঠে এসেছে। এখন দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মোঃ খায়রুল আলম রফিকের অব্যাহতি ও বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদনের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত