তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য

দীপের অসংলগ্ন বক্তব্যে বিভ্রান্তি: ধোঁয়াশায় তদন্তকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:১৩ এএম

মামলার বিষয়ে নৌপুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘তাহসিফের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে।'

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনা এখনো রহস্যের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে থাকা আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাচ্ছেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

উল্টো দীপের দেওয়া ভিন্ন ভিন্ন তথ্যে ধোঁয়াশায় পড়ছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাস্থল টঙ্গীর হোন্ডা রোড ও মাজার বস্তি পরিদর্শন করেও তদন্তে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না।

কারণ দীপ একবার বলেছেন, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের সঙ্গে আলাদা হয়ে যান। পরে আবার বলেছেন, টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। এরপর বলেছেন, একদল লোকের ধাওয়া খেয়ে নদে ঝাঁপ দেন তাহসিফ।

দীপের এসব বয়ান বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। মিলছে না আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর। কেননা পুলিশ বা একদল লোকের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ যদি নদে ঝাঁপ দিয়েও থাকেন, তাহলে সাঁতার জানার পরেও কেন তিনি তীরে উঠে এলেন না? দীপ কেন তাঁকে ফেলে বাসায় চলে এলেন এবং পিবিআই হেফাজতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নদে ঝাঁপ দেওয়ার তথ্য জানালেন না? এত রাতে তাঁরা কেন মাদকের হটস্পট হিসেবে খ্যাত টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গিয়েছিলেন? মোটরসাইকেল উদ্ধার হলেও সেটি তাহসিফ নিজেই সেখানে নিয়েছেন কি না এই প্রশ্ন তদন্তসংশ্লিষ্টদের।

যদিও তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। দীপের দেওয়া অন্য সব তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন হবে। তবে শুক্রবার রাত অবধি দীপকে গ্রেপ্তার করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।

পিবিআইসূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তাহসিফকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। তার দামি ঘড়ি, মুঠোফোন ও পকেটে থাকা টাকা অক্ষত থাকায় প্রাথমিকভাবে ছিনতাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। সম্ভাব্য একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কোনো চক্রের যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহত তাহসিফ সৌরির শরীরের বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ও রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন। এসব পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল সূত্র।

এদিকে গতকাল তাহসিফ সাউরির বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম বলেছেন, তাহসিফ সাউরি সাঁতার জানতেন। শুধু তা-ই নয়, পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্সও করেছিলেন তিনি। সেই কোর্সের সনদও আছে বলে জানান তিনি। এই কারণে দীপের দেওয়া নদে ঝাঁপের তথ্য মানতে নারাজ তিনি।

উল্টো এনায়েতুল করিম দাবি করেছেন, কেন লোকজন তাহসিফকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পিবিআই সূত্র বলছে, তাহসিফ ও দীপ মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থলে অবস্থানের সময় পুলিশের একটি দল তাঁদের ধাওয়া দিলে দীপ তুরাগ তীরে স্থাপিত বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। এরপর সুযোগ বুঝে দীপ সেখান থেকে চলে আসেন। রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন দীপ।

গভীর রাতে দুইজন কেন সেখানে অবস্থান করছিলেন, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিষয়টি জেনেছি, এটা একটু সেনসিটিভ। আরেকটু ক্রসচেক করে বলা যাবে। আর পুলিশের কোন টিম তাঁদের ধাওয়া দিয়েছিল, কেন ধাওয়া দিয়েছিল-আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখছি। ’

এর আগে সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত নম্বর প্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে পিবিআই। যেখানে মোটরসাইকেলটি রাখা ছিল, তার খুব কাছেই তুরাগ নদ।

পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মাজার বস্তি এলাকায় একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। বাইকটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই-বাছাই চলছে।

অবশ্য পিবিআইপ্রধান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছি। ’ এদিকে দীপ পিবিআইকে প্রথমে জানান, দুজন উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে দীপ প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান। রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে তিনি বাসায় পৌঁছান।

তিনি আরও বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে পিবিআই দ্বীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় তিনি বলেন যে তারা একসঙ্গেই ছিলেন, একটি গ্রুপের তাড়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় তাহসিফ। আর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে বাঁচেন তিনি। সবশেষ বলেছেন, পুলিশের মতো দুজন ছিল।

পিবিআইপ্রধান বলেন, গত বৃহস্পতিবার সারা দিন ভুল তথ্য দিয়েছে দীপ। এর পিছনে আরও ঘটনা আছে কি না সেটা বের করতে তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চলছে।তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নৌ-পুলিশ তদন্ত করছে। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করেছে এবং নৌ-পুলিশকে সহযোগিতা করছে।

দীপ কেন একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে এখানে আসার পর তাহসিফকে ফেলে কেন দীপ একা চলে গেলেন, সেই তথ্যটিতে আমাদের কাছে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে বিষয়টি জানা যাবে। ’

এই বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘আমরা দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তাঁর দেওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাইবাছাই করছি। আমরা আসলে প্রকৃত সত্য জানতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। তাঁরা ওইখানে কেন গিয়েছিল, তাঁকে কেউ হত্যা করেছে নাকি দুর্ঘটনা, নাকি আত্মহত্যা-এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছি। এখন পর্যন্ত যেসব উত্তর পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। আপাতত আমরা তদন্ত করছি। রহস্য উদ্ঘাটন হলে পরে জানানো হবে। ’

দীপের বাবা ব্যবসায়ী সেলিম রেজা বলেন, ‘ছেলে বড় হয়েছে, অনেকদিনই রাতে দেরি করে বাসায় ফিরত। সে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থাকত। তাদের দীর্ঘদিনের পরিচয়। তারপরও একটি ঘটনায় ছেলে দীপের নাম আসছে। এখন আমি তাকে নিদোর্ষ বা অপরাধী যাই দাবি করি, সেটা ঠিক হবে না। বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, ‘তাহসিফ একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের সুযোগ ছিল। তারপর দুজনসহ আরও কয়েকজন মিলে গ্রে লাইনস সিকিউরিটি সার্ভিস চালু করে। মিরপুরে তারা বসত বলে শুনেছি।’

এদিকে মামলার বিষয়ে নৌপুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘তাহসিফের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে।'

এই বিষয়ে নিহতের বাবা এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, ‘এখনই মামলা নিয়ে ভাবছি না। আপনারা জানেন, মামলার বিষয়টি ঝামেলার। এরপরও পারিবারিক আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, মামলার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রহস্য উদঘাটন করতে পারবে বলে বিশ্বাস। সরকার নিশ্চয় তথ্য উদঘাটনে আন্তরিক হবে।

তিনি বারবার অভিযোগ করে আসছেন তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে তিনি প্রশাসন ও সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাহসিফের প্রাণনাশের আশঙ্কা

একটি গোয়েন্দা সংস্থা নিহত তাহসিফ সৌরির বাবার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলছে, বেশ কিছুদিন ধরে তার ছেলেকে অজ্ঞাত কিছু লোকজন ফলো করছে। সৌরি বলেছিল, তাকে সম্ভবত পাশের একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা ফলো করছে। যেকোনো সময় তার ক্ষতি হতে পারে বলে সে তার বাবাকে জানিয়েছিল। 

উক্ত প্রতিবেদনে আরেকটি তথ্য সামনে এসেছে, দীপের সঙ্গে তাহসিফের বান্ধবী জেরিকাকে নিয়ে কিছুটা মনোমালিন্য ছিল বলে জানিয়েছে দীপ।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রে লাইনস সিকিউরিটি সার্ভিস নামের একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে নিহত তাহসিফ সাউরির সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিলেন দীপ। তিনি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদপুর ১৪/৯, বদক-বি, বাবর রোডের বাসায় থাকতেন।

উল্লেখ্য, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’ মাকে এই কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি জুলাই গণ অভুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় থাকা বিমানবাহিনীর সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর লাশ। এরপর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের মর্গে লাশ নিতে এসে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম বলেন, তাঁর ছেলে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ না। ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে তাহসিফকে হত্যার পর লাশ নদে ফেলা হয়েছে।

নিহত কে এম তাহসিফ সাউরি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে ৭৭তম লং কোর্সের জিডি পাইলট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তিনি বিমানবাহিনীর এয়ার চিফের একজন এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিমানবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে তাকেও চাকরিচ্যুত করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারসংক্রান্ত ঘটনায় বিমানবাহিনীর দুই কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনায় আসেন তাহসিফ সৌরি।বিমানবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর তিনি কিছুদিন নেত্র নিউজে কর্মরত ছিলেন। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিরাপত্তা বিভাগে আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় মাস চাকরি করেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের অক্টোবরের দিকে তিনি ভার্গো টোব্যাকো গ্রুপে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কুষ্টিয়ার মিরপুরে কর্মরত ছিলেন। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে একই প্রতিষ্ঠানের বারিধারা ডিওএইচএস কার্যালয়ে বদলি হন।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত