ইশরাককে ঘিরে যত নাটক

সালাহউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪৪ পিএম

নির্বাচন, আদালতের রায়, মেয়র পদ নিয়ে জটিলতা, প্রতিমন্ত্রিত্ব ও অস্ত্র হাতে অভিযানের বিতর্ক—ছয় বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বারবার আলোচনায় বিএনপির এই নেতা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে গত ছয় বছরে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন বিএনপির তরুণ প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইশরাক হোসেন। ২০২০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে মামলা, আদালতের রায়, সংশোধিত গেজেট, মেয়র পদে শপথ নিয়ে জটিলতা, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, প্রতিমন্ত্রিত্ব এবং সর্বশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক—প্রতিটি পর্বেই তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। এর মধ্যে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।

নির্বাচনে পরাজিত একজন প্রার্থী থেকে আদালতের রায়ে বিজয়ী ঘোষিত মেয়র, এরপর সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী—ইশরাকের এই রাজনৈতিক পথচলা শুধু ব্যক্তিগত উত্থান-পতনের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকা দক্ষিণের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের হিসাব-নিকাশ।

ইশরাককে ঘিরে আলোচনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারির ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে পরাজিত হন বিএনপির প্রার্থী ইশরাক। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, তাপস চার লাখের বেশি ভোট পান; ইশরাকের ভোট ছিল প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার।

তবে, নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তোলে বিএনপি। এক মাস পর ৩ মার্চ নির্বাচনী ফলাফল ও নির্বাচন কমিশনের গেজেট চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন ইশরাক। মামলায় শেখ ফজলে নূর তাপস, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আটজনকে বিবাদী করা হয়। এই মামলাই পরবর্তী পাঁচ বছরে ইশরাকের রাজনৈতিক অবস্থান ও ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করে।

দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে রায় দেন। একইসঙ্গে শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার বৈধতা বাতিল করে ইশরাক হোসেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

এই রায়ের মধ্য দিয়ে পাঁচ বছর আগের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে আদালতের রায় পেলেই যে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ নিশ্চিত হবে, বাস্তবতা ছিল তার চেয়ে জটিল।

রায়ের পর নির্বাচন কমিশন আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চায়। এরই মধ্যে ২৭ এপ্রিল রাতে সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে কমিশন। সেখানে তাপসের পরিবর্তে ইশরাককে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।কিন্তু নির্বাচনী আইনি লড়াইয়ে সাফল্য এলেও মেয়রের চেয়ারে বসার পথে সৃষ্টি হয় নতুন জটিলতা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই বছরের ১৯ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ঢাকা দক্ষিণসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করা হয়। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।

এমন পরিস্থিতিতে আদালতের রায় ও নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট থাকা সত্ত্বেও ইশরাকের মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য ছিল, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় ও গেজেটের পর তাঁকে শপথ পড়ানোর ব্যবস্থা করা উচিৎ। অন্যদিকে, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রশ্নে বিষয়টি সহজ সমাধানে পৌঁছায়নি।

ফলে মেয়র পদে বিজয়ী ঘোষিত হলেও দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি ইশরাক। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং ঢাকা দক্ষিণের নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হয়।

মেয়র পদ নিয়ে জটিলতার মধ্যেই ২০২৬ সালে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইশরাক হোসেন। পরে তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

নতুন দায়িত্বে যুক্ত হওয়ার পরও পুরান ঢাকার বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়ে তাঁর তৎপরতা আলোচনায় আসে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ, ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, বুড়িগঙ্গার দূষণ ও সড়ক সংস্কারের মতো বিষয় নিয়ে তিনি সক্রিয় হন।

গত ৪ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক জানান, দল চাইলে তিনি মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত। তবে বিএনপি অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন বলেও জানান তিনি।

তাঁর এই বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়—ইশরাক কি সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে আবারও ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে নামবেন? নাকি জাতীয় রাজনীতিতেই নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করবেন? এসব ইস্যুতে দলের অভ্যন্তরে জোর আলোচনার মাঝেই ইশরাককে ঘিরে সর্বশেষ বিতর্কের সূত্রপাত ১৭ অক্টোবর। গেন্ডারিয়ায় কথিত মাদকবিরোধী অভিযানের সময় তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যাচ্ছে—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিওটি ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনগত প্রশ্ন ওঠে। একজন প্রতিমন্ত্রী নিজে অস্ত্র হাতে এই ধরনের অভিযানে অংশ নিতে পারেন কি না, তাঁর এই ভূমিকা আইনগত সীমা অতিক্রম করেছে কি না এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাঁর ভূমিকার সম্পর্ক কী—এসব বিষয় আলোচনায় আসে। ঘটনাটি তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ।

সমালোচকদের বক্তব্য, জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা; নিজে আইন প্রয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া নয়। অন্যদিকে, তাঁর সমর্থকদের দাবি, পুরান ঢাকায় মাদকের বিস্তার রোধে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েছেন।

তবে ভিডিওতে তাঁর উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে চারিদিকে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের পদত্যাগ নিয়ে ওঠে চাপা গুঞ্জন। অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার বিতর্কের মধ্যেই ১৮ অক্টোবর রাতে ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়, তিনি ১৯ অক্টোবর দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন।

প্রতিমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই পদত্যাগের ঘোষণাকে ঘিরে তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি কি আবার ঢাকা দক্ষিণের মেয়র নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের অবস্থান তৈরি করছেন, নাকি সাম্প্রতিক বিতর্কের রাজনৈতিক দায় নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।

এই মুহুর্তে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কানাঘুঁষা হচ্ছে কেন বারবার আলোচনার শিরোনাম হচ্ছেন ইশরাক? তাকে ঘিরে ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর পেছনে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, ঢাকা দক্ষিণে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। বিএনপির প্রয়াত নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে হিসেবে ইশরাকের একটি পরিচিত রাজনৈতিক ভিত্তি এবং একটি আবেগী ভোটব্যাংক রয়েছে। পুরান ঢাকায় তাঁর পারিবারিক পরিচয়, দলীয় অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে বিএনপির নগর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত করেছে।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত নেতৃত্ব বনাম প্রশাসক। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদ নিয়ে আদালতের রায় ও গেজেটের পরও দায়িত্ব গ্রহণ করতে না পারার ঘটনা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং নির্বাচনী বৈধতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রশাসকের হাতে নগর পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকলেও ইশরাকের রয়েছে দলীয় সমর্থন ও নির্বাচনী রায়ের ভিত্তিতে তৈরি রাজনৈতিক দাবি। এই দুই অবস্থানের মধ্যকার টানাপোড়েন তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

তৃতীয়ত, বিএনপির নির্বাচনী কৌশল। ভবিষ্যৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণে দল কাকে প্রার্থী করবে, ইশরাককে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করানো হবে কি না এবং তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে কীভাবে ব্যবহার করা হবে—এসব সিদ্ধান্ত দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইশরাকের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পদত্যাগের ঘোষণা এই হিসাব-নিকাশকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

নাটকের শেষ কোথায়?

২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়, পাঁচ বছর পর আদালতের রায়ে বিজয়ী ঘোষণা, সংশোধিত গেজেট প্রকাশের পরও মেয়রের দায়িত্ব নিতে না পারা, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়া এবং সর্বশেষ অস্ত্র হাতে অভিযানের বিতর্ক—ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পথচলার প্রতিটি পর্যায়েই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

তাঁর ঘটনাপ্রবাহে যেমন রয়েছে আদালতের রায় ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সংঘাত, তেমনি রয়েছে দলীয় রাজনীতির হিসাব, নগর পরিচালনার প্রশ্ন এবং একজন তরুণ নেতার রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা।

প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। তবে এর পরিণতি কী হবে, তিনি শেষ পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদকে লক্ষ্য করে এগোবেন কি না কিংবা বিএনপি তাঁকে কোন ভূমিকায় দেখতে চায়—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইশরাককে ঘিরে নাটকীয়তার অবসান ঘটবে, নাকি ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদ ও জাতীয় রাজনীতিকে কেন্দ্র করে শুরু হবে নতুন অধ্যায়—সেই উত্তর নির্ভর করছে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ, দলের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত