নিষ্প্রাণ ৮২ কোটি টাকার ৮ শান্তিনিবাসঃ ১ম পর্ব
রাজশাহীতে এক বছরেও চালু হয়নি সরকারি ‘শান্তিনিবাস’
যে আট জেলায় শান্তিনিবাস করা হয়েছে তার মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীতে শুধু নারীরা থাকতে পারবেন। পুরুষদের জন্য চারটি নিবাস রয়েছে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে। প্রতিটি নিবাসে ২৫ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা ছিল, ‘পাইলট’ (পরীক্ষামূলক) পর্যায়ের এই আট শান্তিনিবাসের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে দেশের সব জেলায় প্রবীণদের জন্য এমন আবাস গড়ে তোলা হবে। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও শান্তিনিবাসে কোনো প্রবীণের আবাসন নিশ্চিত করা যায়নি।
উল্লেখ্য, অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণ মানুষদের জন্য দেশের আটটি শহরে দৃষ্টিনন্দন আটটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনের নাম ‘শান্তিনিবাস’। সেখানে প্রবীণ নাগরিকদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম আছে। কিন্তু কেউ থাকেন না। বেশিরভাগ ভবন প্রায় তিন বছর অযত্ন–অবহেলায় পড়ে আছে। ভবনের ভেতরে ধুলা জমে নষ্ট হচ্ছে আসবাব, কোথাও কোথাও ভবনের দেয়ালে গজিয়েছে শেওলা।
যে আট জেলায় শান্তিনিবাস করা হয়েছে তার মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীতে শুধু নারীরা থাকতে পারবেন। পুরুষদের জন্য চারটি নিবাস রয়েছে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে। প্রতিটি নিবাসে ২৫ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ভবন প্রস্তুত থাকলেও আটটি শান্তিনিবাসের কোনোটির জন্যই প্রয়োজনীয় জনবলকাঠামো তৈরি হয়নি। এসব ভবন দেখভাল কিংবা পরিচালনার জন্য কোনো বরাদ্দও দেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হয় না, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন, তা–ও নিতে হয়। সেই উদ্যোগে ঘাটতি থাকলে ধরে নিতে হয়, প্রকল্প প্রণয়নকারীদের আগ্রহ ছিল শুধু টাকা খরচ করে ভবন নির্মাণে। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, অনেকের পকেট ভারী হয়। সমাজের এই অসঙ্গতি নিয়ে "দ্য ফিন্যান্স টুডে"র ৮ পর্বের বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে আজ রাজশাহীতে নির্মিত শান্তিনিবাসের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
প্রবীনশূন্য রাজশাহীর শান্তিনিবাস
রাজশাহীতে অসহায় ও অবহেলিত প্রবীণদের জন্য সরকারি উদ্যোগে নির্মিত ২৫ শয্যার ‘শান্তিনিবাস’ এখনো চালু হয়নি। ভবন নির্মাণ শেষে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও জনবলসংকটে এক বছর পরও সেখানে কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। ফলে সরকারি এই আবাসনসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আশ্রয়প্রত্যাশী প্রবীণরা।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া এলাকায় ২০২২ সালের ১৫ জুন শান্তিনিবাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নির্মাণকাজ শেষ হয়। গত বছর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটি সমাজসেবা অধিদপ্তরকে হস্তান্তর করে। ভবনের সামনের ভিত্তিফলকটি এখনো রয়েছে। সেখানে তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নামটি কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে। ভিত্তিফলকে তারিখ লেখা আছে ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর।
রাজশাহীতে পবা সরকারি শিশু পরিবার (বালক) প্রাঙ্গণের পশ্চিম পাশে পাঁচতলা ভিত্তির ওপর নির্মাণ করা হয় তিনতলা ভবন। ১৬২১ বর্গমিটার আয়তনের ভবনটিতে ২৫ জন প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে লিফট, অভ্যর্থনা ও দর্শনার্থী কক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, বসার স্থান, বিনোদন ও শরীরচর্চার সরঞ্জাম, প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কর্নার, উৎপাদন ইউনিট ও কফি কর্নার। এর পরও চালু করা সম্ভব হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। কাগজে-কলমে সবই প্রস্তুত। তবে নেই প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা।
দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে ধুলার আস্তরণ পড়েছে। কোথাও দেয়ালে শেওলা ধরেছে। পড়ে থাকা আসবাব ও সরঞ্জামও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যে ভবন প্রবীণদের জন্য নির্মাণ করা হলো, সেটি চালু করার আগেই কেন জনবল ও পরিচালন কাঠামোর ব্যবস্থা করা হলো না?
রাজশাহী সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক মনিরা খাতুন বলেন, শান্তিনিবাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এমনকি জনবল নিয়োগের জন্য অর্গানোগ্রামও তৈরি হয়নি। এই কারণে এখন পর্যন্ত কোনও প্রবীণকে সেখানে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। কবে নাগাদ এটি চালু হবে, তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।
অর্থাৎ প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—পরিচালনা ও সেবা কার্যক্রম থেকে গেছে অনিশ্চয়তায়।
শান্তিনিবাস নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন সমাজসেবা অধিদফতরের তৎকালীন উপপরিচালক সাদিকুল হক। বর্তমানে তিনি অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে। তার বক্তব্য জানতে কয়েক দিন ধরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণ মানুষদের জন্য দেশের আটটি শহরে দৃষ্টিনন্দন আটটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনের নাম ‘শান্তিনিবাস’। সেখানে প্রবীণ নাগরিকদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম আছে। কিন্তু কেউ থাকেন না। বেশিরভাগ ভবন প্রায় তিন বছর অযত্ন–অবহেলায় পড়ে আছে। ভবনের ভেতরে ধুলা জমে নষ্ট হচ্ছে আসবাব, কোথাও কোথাও ভবনের দেয়ালে গজিয়েছে শেওলা।
যে আট জেলায় শান্তিনিবাস করা হয়েছে তার মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীতে শুধু নারীরা থাকতে পারবেন। পুরুষদের জন্য চারটি নিবাস রয়েছে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে। প্রতিটি নিবাসে ২৫ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। আটটি শান্তিনিবাসই একই ধরনের নকশায় নির্মিত হয়েছে। পাঁচতলা ভিত্তির ওপর তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের আয়তন ১ হাজার ৬২১ বর্গমিটার। ভবনগুলোতে প্রবীণদের জন্য লিফট, অভ্যর্থনা কক্ষ, দর্শনার্থী কক্ষ, বসার জায়গা, শয্যাকক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, বিনোদনের ব্যবস্থা, শরীরচর্চার কর্নার, প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কর্নার, কফি কর্নারসহ আধুনিক নানা সুবিধা রাখা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন শান্তিনিবাস প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রতিটি ভবন নির্মাণে ছয় থেকে সাত কোটি টাকা করে খরচ হয়েছে। আসবাবসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ ছিল।
শান্তিনিবাস কেন চালু করা যাচ্ছে না, সেই বিষয়ে আটটি জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবন তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ হয়নি। এছাড়া প্রতিটি নিবাস চালু করার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ দরকার, সেটিও অনুমোদন হয়নি। ৮টি নিবাস চালু হলে ২০০ জন প্রবীণ ব্যক্তির থাকার সুযোগ হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব চবলেন, জনবল না থাকায় শান্তিনিবাসগুলো চালু করা যায়নি। আটটি শান্তিনিবাস চালুর জন্য গত মাসে জনবল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে শান্তিনিবাসগুলো চালু করা যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণ ব্যক্তিদের নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে শান্তিনিবাস কার্যক্রম নেওয়া হয়। জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সরকারি শিশু পরিবারগুলো, যাতে প্রবীণদের সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে সেখানকার শিশুদের পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাঁদের পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
Shamiur Rahman
