সংসার সামলানোর পাশাপাশি ব্যবসার হিসাব, নগদ অর্থ ও কর্মচারীদের তদারকি—সবই নিজের হাতে

সামাজিক সমালোচনা পেরিয়ে যাত্রাবাড়ীতে তিন মাংসের দোকানের উদ্যোক্তা আনোয়ারা

আবু তাহের বাপ্পা প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৩৬ পিএম

আনোয়ারার কাছে ব্যবসা শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি নিজের শ্রম, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় প্রতিষ্ঠারও একটি ক্ষেত্র। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, সামাজিক সমালোচনা মোকাবিলা এবং সংসারের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের লক্ষ্যে

ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় তাঁর কর্মব্যস্ততা। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে গরুর মাংসের দোকানে। ক্রেতা সামলানো, বেচাকেনা, নগদ অর্থের হিসাব রাখা থেকে শুরু করে কর্মচারীদের কাজের তদারকি—সবই করতে হয় নিজের হাতে। দিন শেষে ঘরে ফিরে সামলাতে হয় সংসারের দায়িত্বও।
 
নারী হয়ে গরুর মাংসের ব্যবসা করায় শুনতে হয়েছে নানা নেতিবাচক মন্তব্য ও সমালোচনা। কিন্তু কোনো বাধাই থামাতে পারেনি আনোয়ারা আসমানিকে। মুসলিম নারী হিসেবে বোরকা পরেই প্রতিদিন ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনটি গরুর মাংসের দোকান পরিচালনার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের স্বতন্ত্র কর্মপরিচয়।

যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের পাশে থ্রিস্টার সবজি বাজারের সামনে অবস্থিত আনোয়ারার তিনটি দোকান। প্রতিদিন এসব দোকানে ছয় থেকে সাতটি গরুর মাংস বিক্রি হয়। ব্যবসা পরিচালনায় তাঁদের সঙ্গে কাজ করেন ১০ জন কর্মচারী। প্রায় তিন বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আনোয়ারা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে সময় দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, বেচাকেনা এবং নগদ অর্থের হিসাবও সামলান তিনি।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই বড় চ্যালেঞ্জ

গরুর মাংসের দোকানে একজন নারীকে নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা করতে দেখে আশপাশের অনেকেই নানা মন্তব্য করেন। কখনো শুনতে হয় সমালোচনা, কখনো মোকাবিলা করতে হয় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির। তবে এসব কথায় দমে যাননি আনোয়ারা। বরং নিজের দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে এগিয়ে চলেছেন।

তাঁর কাছে পোশাক বা নারী-পুরুষের প্রচলিত কর্মবিভাজনের চেয়ে কাজের প্রতি সততা, দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বোরকা পরেই প্রতিদিন দোকানে এসে ব্যবসার নানা দিক সামলান তিনি। ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেন থেকে শুরু করে কর্মচারীদের কাজের তদারকি—কোনো দায়িত্বেই পিছিয়ে নেই।

খুলনা থেকে ঢাকায়, সংসার থেকে ব্যবসায়

আনোয়ারা আসমানির জন্ম খুলনার জাবদিপুর এলাকায়। তাঁর বাবা মো. হারুন শেখ খুলনার সোনালি জুট মিলে চাকরি করতেন। মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ২০১২ সালে পারিবারিকভাবে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের মইদুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসে শুরু হয় নতুন সংসারজীবন। বর্তমানে তাঁরা রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।

আনোয়ারার স্বামী মইদুল ইসলামের গরুর ব্যবসার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গরুর হাটে যাতায়াতের মধ্য দিয়ে গরু চেনা, কেনাবেচা এবং গরুর গঠন দেখে সম্ভাব্য ওজন ও মাংসের পরিমাণ অনুমান করার কৌশল শেখেন তিনি। তাঁর বাবা আবদুল হাফেজ শিকদার প্রায় ৬০ বছর গরুর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি করতেন কৃষিকাজও।

২০০৫ সালে ঢাকায় এসে সদরঘাটে লঞ্চমালিক সমিতির অধীনে চাকরি শুরু করেন মইদুল। পরে ২০১৩ সালে যাত্রাবাড়ীতে মাছের ব্যবসায় যুক্ত হন। একপর্যায়ে শুরু করেন গরুর মাংসের ব্যবসা। স্বামীর সেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েই ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন আনোয়ারা। একসময় দোকানের বেচাকেনা, ক্রেতাদের দেখভাল, নগদ অর্থের হিসাব এবং কর্মচারীদের তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও নিজের হাতে তুলে নেন।

দুই মেয়েকে ঘিরে যত স্বপ্ন

ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখেন আনোয়ারা। বড় মেয়ে মরিয়মের বয়স ১২ বছর। ছোট মেয়ে আয়শা সিদ্দিকা মাত্র আট বছর বয়সে পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে।

মেয়েদের পড়াশোনার বিষয়েও সচেতন আনোয়ারা। ছোট মেয়ের মাদ্রাসায় যাতায়াতসহ পড়াশোনার বিভিন্ন কাজে দীর্ঘদিন সময় দিয়েছেন তিনি। এখন তাঁর প্রত্যাশা, দুই মেয়েকেই শিক্ষিত ও যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। ব্যবসা ও সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

পরিশ্রমেই নিজের পরিচয়

আনোয়ারার কাছে ব্যবসা শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি নিজের শ্রম, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় প্রতিষ্ঠারও একটি ক্ষেত্র। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, সামাজিক সমালোচনা মোকাবিলা এবং সংসারের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের লক্ষ্যে।

প্রচলিত সামাজিক ধারণার বাইরে গিয়ে গরুর মাংসের মতো একটি ব্যবসায় যুক্ত হয়ে আনোয়ারা দেখিয়েছেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর সক্ষমতা নির্ধারণের মাপকাঠি হওয়া উচিত তাঁর দক্ষতা, পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধ। প্রতিকূলতা থাকলেও দৃঢ় মনোবল ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে এগিয়ে গেলে একজন নারী নিজের কর্মপরিচয় গড়ে তুলতে পারেন—যাত্রাবাড়ীর তিনটি মাংসের দোকান পরিচালনার মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই তুলে ধরছেন আনোয়ারা আসমানি।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত