ঋণ সরকারের, দাম জনগণের—অর্থনীতির এই হিসাবটা কে দেবে?

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০৮ পিএম

অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ছে, রাজস্ব আহরণ দুর্বল, ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের চাপ বাড়ছে—আর মূল্যস্ফীতির বোঝা গিয়ে পড়ছে মানুষের সংসারে

একটি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই, যখন সরকারের হিসাব আর মানুষের হিসাব এক হয়ে যায়—কিন্তু দায়টা সমানভাবে ভাগ হয় না। সরকারের আয় কম হলে সরকার ঋণ নেয়। ঋণের সুদ বাড়ে। রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে বাজেটের চাপ বাড়ে। ভর্তুকি কমাতে হলে বিদ্যুৎ, সার বা জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রশ্ন আসে। আর এসব পরিবর্তনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে একজন সাধারণ মানুষ—যার আয় অনেক সময় সেই হারে বাড়ে না, যেভাবে বাড়ে বাজারদর। রাষ্ট্রের ঋণ কাগজে থাকে; তার মূল্য অনেক সময় জনগণ দেয় দামের মাধ্যমে।

ঋণ বাড়ছে, কিন্তু বেসরকারি ঋণ বাড়ছে না

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর তথ্য বলছে, এক বছরে সরকারি খাতে ব্যাংকঋণ বেড়েছে ৩০.৪৩ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার মাত্র ৪.৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও ব্যবসা-বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক থেকে নিট ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা—যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেশি।

এখানেই অর্থনীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। সরকার যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বড় অংশের অর্থ শোষণ করে নেয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে? এটিই ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট—সরকারের ঋণ বাড়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও এর একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। জুন ২০২৬-এ সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩০.৪৩ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে তা ৪.৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির যে অংশ নতুন কারখানা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরি করার কথা, সেখানে ঋণের গতি ধীর; অথচ সরকারের ঋণের গতি দ্রুত।

সমস্যার গোড়ায় শুধু ঋণ নয়, রাজস্বও

সরকারের ঋণের প্রয়োজন বাড়ার পেছনে শুধু ব্যয়ের বিষয়টি দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। রাজস্ব আহরণ দুর্বল হলে সরকারকে ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে যায় বিগত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো। এর অর্থ হলো অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকারের কর-রাজস্ব আহরণ ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর তথ্যেও রাজস্বের চাপের প্রতিফলন আছে। ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই–মে সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর সংগ্রহ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার ৮১.৫৮ শতাংশ। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। রাজস্ব ঘাটতি আর রাজস্ব ঘাটতি/বাজেট ঘাটতি এক বিষয় নয়। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম সংগ্রহ হওয়া এক সমস্যা; আর সরকারের মোট আয় ও মোট ব্যয়ের ব্যবধান হলো বাজেট ঘাটতি। দুটি একসঙ্গে ব্যবহার করলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বিভ্রান্তিকর হয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংস্কার চাপ

বাংলাদেশ এখন শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নেই; আন্তর্জাতিক ঋণ ও সংস্কার কাঠামোর সঙ্গেও তাকে সামঞ্জস্য করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানায়, বাংলাদেশ সরকার আইএমএফ সমর্থিত নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

আইএমএফের আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
আইএমএফের ২০২৫ আর্টিকেল-৪ এর মূল্যায়নেও একই ধরনের সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। সেখানে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এর উদ্দেশ্য হলো আর্থিক পরিসর তৈরি করা—অর্থাৎ সরকারের এমন আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ঋণ ও সুদের চাপ সামলে অগ্রাধিকার খাতে ব্যয় করা যায়। কিন্তু এখানেই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন: এই আর্থিক পরিসর তৈরি হবে কীভাবে ?

ভর্তুকি কমবে—দাম বাড়বে না তো?

ভর্তুকি অর্থনীতিতে সব সময় খারাপ নয়। সমস্যা হলো ভর্তুকি যদি অকার্যকর, অতিরিক্ত বা ভুল লক্ষ্যভিত্তিক হয়, তাহলে সীমিত সরকারি অর্থ সেখানে আটকে থাকতে পারে। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫ অর্থবছরে সারে ভর্তুকি ছিল জিডিপির প্রায় ০.৮ শতাংশ। সংস্থাটি সার উৎপাদন সক্ষমতা, মূল্য কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ব্যয় কমানোর সুযোগের কথা বলেছে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে।

অর্থাৎ বার্তাটি শুধু “ভর্তুকি কমাও” নয়; বরং ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস করো এবং যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষা দাও। এখানেই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সারের ভর্তুকি কমলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। বিদ্যুতের ভর্তুকি কমিয়ে দাম সমন্বয় করলে শিল্প ও পরিবারের ব্যয় বাড়তে পারে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়তে পারে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব খাদ্য থেকে পোশাক—প্রায় সব পণ্যের ওপর পড়তে পারে। অর্থাৎ ভর্তুকির একটি হিসাব সরকারের বাজেটে দেখা যায়; আরেকটি হিসাব দেখা যায় বাজারের ব্যাগে।

মূল্যস্ফীতির আসল বিল কে দিচ্ছে?

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর মূল্যায়ন বলছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশ ছিল। নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি, ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সময়ে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে উঠেছে। এই সংখ্যাগুলোর অর্থ খুব সরল। একজন শ্রমিকের আয় যদি ৮ শতাংশ বাড়ে, কিন্তু তার পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থনীতির পরিভাষায় এটিকে মূল্যস্ফীতি বলা হয়। কিন্তু পরিবারের কাছে এর নাম—বাজারের খরচ বেড়ে যাওয়া।

চাল, ডাল, মাছ, সবজি, ওষুধ, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, যাতায়াত—প্রতিটি খাতে যখন ব্যয় বাড়ে, তখন মানুষের সঞ্চয় কমে। সঞ্চয় কমলে বিনিয়োগ কমে। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে। ফলে মূল্যস্ফীতি শুধু ভোগের সমস্যা থাকে না; এটি ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ আয় ও কর্মসংস্থানের সমস্যায় পরিণত হয়।

ব্যাংক খাতের সংকটও শেষ পর্যন্ত জনগণের হিসাব

অর্থনীতির আরেকটি বড় চাপ হলো ব্যাংক খাত।  বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ডিসেম্বর ২০২৫-এ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০.৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। আইএমএফও ব্যাংক খাত পুনর্গঠনকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।

২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৪৭ শতাংশ। এখানে ঝুঁকিটা দ্বিমুখী। একদিকে ব্যাংকের দুর্বলতা ব্যবসা ও বিনিয়োগের ঋণপ্রবাহ কমায়। অন্যদিকে ব্যাংক পুনর্গঠনে যদি সরকারি অর্থের প্রয়োজন হয়, তার চাপ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর পড়তে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের ভুল ঋণের দায়ও শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থনীতিতে এসে ঠেকতে পারে।

ভর্তুকি কাটার আগে অপচয় কাটুন

ভর্তুকি সংস্কার দরকার হতে পারে। কিন্তু সংস্কারের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোথায় ভর্তুকি সত্যিই প্রয়োজন, আর কোথায় অপচয়? কোন ভর্তুকি কৃষকের উৎপাদন বাড়াচ্ছে? কোন ভর্তুকি কেবল অদক্ষতা টিকিয়ে রাখছে? কোন সরকারি প্রকল্পের সামাজিক ফলন বেশি? গকোথায় কর ফাঁকি বন্ধ করলে নতুন করের হার না বাড়িয়েও রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব? কোথায় সরকারি সম্পদের অপচয় হচ্ছে? কোথায় ব্যাংকের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনায় আটকে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে শুধু ভর্তুকি কমানো বা কর বাড়ানো হলে সংস্কারের বোঝা সহজেই দৃশ্যমান করদাতা ও সাধারণ ভোক্তার ওপর চলে যেতে পারে।

সংস্কারের সাফল্য শুধু আইএমএফের পর্যালোচনায় মাপা যাবে না - বাংলাদেশের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি কাজ—রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারি ঋণের চাপ সামলানো, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করা। কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোনো একটি লক্ষ্য পূরণ করলেই অর্থনীতি সফল হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। 

আইএমএফের পর্যালোচনা সফল হতে পারে, কিন্তু যদি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়? বাজেট ঘাটতি কমতে পারে, কিন্তু যদি যুবকদের চাকরি না বাড়ে? ভর্তুকি কমতে পারে, কিন্তু যদি নিম্নআয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয় আরও বেড়ে যায়? ব্যাংক খাত পুনর্গঠিত হতে পারে, কিন্তু যদি এর খরচ শেষ পর্যন্ত করদাতাকে বহন করতে হয়? অর্থনৈতিক সংস্কারের আসল পরীক্ষা তাই শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় নয়—মানুষের সংসারে।

ঋণ কমাতে হবে—কিন্তু মানুষের সক্ষমতা কমিয়ে নয়। ভর্তুকি সংস্কার করতে হবে—কিন্তু দরিদ্রের সুরক্ষা কেটে নয়। রাজস্ব বাড়াতে হবে—কিন্তু করের বোঝা শুধু দৃশ্যমান করদাতার ওপর চাপিয়ে নয়। ব্যাংক খাত সংস্কার করতে হবে—কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনার দায় অন্ধভাবে জনগণের ওপর চাপিয়ে নয়। সংস্কার করতে হবে—কিন্তু সংস্কারের খরচ কে দিচ্ছে, সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে নয়।

শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক কোনো জটিল মডেল নয়। সংসারের বাজারের ব্যাগ—সেটিই জনগণের বাস্তব ব্যালান্সশিট। রাষ্ট্রের হিসাব যদি মিলে যায়, কিন্তু মানুষের সংসারের হিসাব না মেলে—তাহলে সেই অর্থনৈতিক সংস্কারের সাফল্য কোথায়?

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত