বীমা খাতের অনিয়ম জালিয়াতি ধরতে বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ
অন্তত ডজনখানেক বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে আর্থিক অনিয়ম, তথ্যের অসঙ্গতি, অর্থের অপব্যবহার ও জালিয়াতির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব অনিয়মের তথ্য বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থের অপব্যবহার খুঁজে বের করতে প্রথমবারের মতো বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে যুক্ত হচ্ছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই লক্ষ্যে চার সংস্থার সমন্বয়ে একটি যৌথ নিরীক্ষার কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) খসড়া করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর গত পাঁচ অর্থবছরের আর্থিক কর্মকা- নিরীক্ষার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রয়োজনে নিরীক্ষার সময়সীমা বাড়ানো বা কমানো যাবে।
এই নিরীক্ষায় শুধু কোম্পানির আর্থিক বিবরণীই নয়, ব্যাংক হিসাব, ঋণ, বিনিয়োগ, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, বীমা দাবি পরিশোধ, কর ও ভ্যাটের তথ্যও একসঙ্গে যাচাই করা হবে। এমনকি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকে জমা হয়েছিল কিনা, কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে মূলধন দেখানো হয়েছে কিনা এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সঙ্গে অর্থের অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা খাতের অনিয়ম ও জালিয়াতি শনাক্তে চার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত বিশেষ নিরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ, বীমা কোম্পানির আর্থিক কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক একাধিক সংস্থার তদারকির আওতাধীন। আলাদাভাবে নিরীক্ষা করলে অনেক সময় অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। যৌথ নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, বিনিয়োগ, দাবি নিষ্পত্তি ও করসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই উদ্যোগের সফলতার জন্য শুধু নিরীক্ষা নয়, অনিয়মের তথ্য উদ্ঘাটনের পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।
জানা গেছে, অন্তত ডজনখানেক বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে আর্থিক অনিয়ম, তথ্যের অসঙ্গতি, অর্থের অপব্যবহার ও জালিয়াতির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব অনিয়মের তথ্য বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইডিআরএর একজন কর্মকর্তা বলেন, চার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ নিরীক্ষা হলে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। যেসব কোম্পানি আর্থিক অনিয়মের তথ্য গোপন করছে বা বিভিন্ন নথিতে অসংগতি রাখছে, তাদের শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
খসড়া কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, বীমা খাতে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে আইডিআরএ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। তবে একটি বীমা কোম্পানির কার্যক্রম শুধু বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার এখতিয়ারে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ব্যাংকিং কার্যক্রম, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং আয়কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত বিষয়ও জড়িত। একটি বীমা কোম্পানির একাধিক ব্যাংক হিসাব থাকে। এসব হিসাবে প্রিমিয়ামের অর্থ জমা হয়, বিনিয়োগের অর্থ স্থানান্তরিত হয় এবং পলিসিধারীদের দাবি পরিশোধ করা হয়। পাশাপাশি উদ্যোক্তা, পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন চলে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে নিরীক্ষা করলে সময় ও অর্থ বেশি ব্যয় হয়। একই সঙ্গে এক সংস্থার কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে অন্য সংস্থার তথ্যের অমিল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের ঝুঁকিও থাকে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রস্তাবিত উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাল্টি-রেগুলেটর কোঅর্ডিনেটেড স্পেশাল অডিট’। এতে প্রতিটি সংস্থা নিজ নিজ আইনি এখতিয়ারের মধ্যে থেকে নিরীক্ষা ও তথ্য যাচাই করবে। কোম্পানির নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের নথি একসঙ্গে পরীক্ষা করা হবে। এজন্য আইডিআরএর মাধ্যমে চার সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি যৌথ নিরীক্ষা সমন্বয় কমিটি বা টিম গঠন করা হবে। আইডিআরএর পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এর সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বিএসইসি প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক বলেন, চার সংস্থার সমন্বিত বিশেষ নিরীক্ষা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু নিরীক্ষা করলেই হবে না, এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অতীতেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষা হলেও অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তাই এই উদ্যোগ যেন সাময়িক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বীমা কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত নিরীক্ষা ও তদারকির আওতায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে যৌথ কমিটিকে কতটা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং তারা কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এই হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। এমন পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, বীমা কোম্পানিগুলো এখনও মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তাই অনিয়ম ও গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থাও নিতে হবে। পাশাপাশি আইডিআরএকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আইডিআরএ দেখবে প্রিমিয়াম ও দাবি পরিশোধের হিসাব
প্রস্তাবিত কার্যপরিধি অনুযায়ী, আইডিআরএ বীমা আইন-২০১০, ইনস্যুরেন্স করপোরেশন আইন-২০১৯ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পরিপালনের বিষয়গুলো পরীক্ষা করবে। এর মধ্যে থাকবে প্রিমিয়াম আয়ের হিসাব ও পলিসিধারীদের তথ্য যাচাই, দাবি ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তির হার, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও এবং লাইফ ফান্ডের অবস্থা পর্যালোচনা।
এছাড়া বীমা বিনিয়োগ প্রবিধানমালা-২০১৯ অনুযায়ী বিনিয়োগ হয়েছে কিনা, আইডিআরএর অনুমতি ছাড়া এফডিআরের ওপর লিয়েন সৃষ্টি করা হয়েছে কিনা, সলভেন্সি মার্জিন প্রবিধানমালা-২০২৪ এবং আইএফআরএস-১৭ অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করা হবে। কোম্পানির ট্যারিফ রেট, পুনঃবীমার নিয়ম, গাড়ি কেনা ও জ্বালানি ব্যয়, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীও নিরীক্ষার আওতায় থাকবে।
ভুয়া মূলধন ও অস্বাভাবিক লেনদেন খুঁজবে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক বীমা কোম্পানির নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব, ঋণ ও অন্যান্য ব্যাংকিং সম্পর্ক পরীক্ষা করবে। বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর, অস্বাভাবিক লেনদেন, নগদ উত্তোলন এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সঙ্গে অর্থের লেনদেনের উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান করা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের বিষয়ে। মূলধনের অর্থ প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছিল কিনা এবং সার্কুলার বা কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে মূলধন দেখানো হয়েছে কিনা, তা যাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন, রেমিট্যান্স এবং পুনঃবীমার অর্থ দেশে এসেছে কিনা, তা পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে অর্থের উৎস ও চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকের পরিচয় যাচাই করা হবে।
কর ফাঁকি ও অঘোষিত আয় খুঁজবে এনবিআর
বীমা কোম্পানির আয়কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করবে এনবিআর। কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, হিসাবের খাতা এবং আয়কর রিটার্নের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা, ঘোষিত আয়ের সঙ্গে প্রকৃত আয় মিলছে কিনা, তা যাচাই করা হবে। এছাড়া অঘোষিত আয়, গোপন লেনদেন, ভুয়া বা অগ্রহণযোগ্য ব্যয় এবং কর ফাঁকির লক্ষণ খতিয়ে দেখা হবে। ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন, উৎসে কর কর্তন, দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির প্রয়োগ এবং বিচারাধীন কর মামলাও পর্যালোচনা করবে সংস্থাটি। কর নির্ধারণ বা জরিমানার মতো ব্যবস্থা নিতে হলে এনবিআর নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে।
শেয়ার ধারণ ও বিনিয়োগের অর্থ ব্যবহারের হিসাব দেখবে বিএসইসি
বিএসইসি কোম্পানির হিসাব ও আর্থিক বিবরণীর সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জে দাখিল করা তথ্য মিলিয়ে দেখবে। অনুমোদিত, ইস্যু করা ও পরিশোধিত মূলধন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার ধারণ, শেয়ার বন্ধক এবং লক-ইন শর্ত পরিপালন যাচাই করা হবে। পাশাপাশি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ, লভ্যাংশ ঘোষণা, বোনাস শেয়ার ইস্যু, করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুসরণ, ইনসাইডার ট্রেডিং ও শেয়ার কারসাজির লক্ষণ পরীক্ষা করা হবে। আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখবে বিএসইসি।
খসড়া কার্যপরিধি অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে কোম্পানিগুলোর গত পাঁচ অর্থবছরের কার্যক্রম নিরীক্ষা করা হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে হিসাবের খাতা, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের নথি, কর ও বীমা দাবিসংক্রান্ত রেকর্ড এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করতে হবে। নিরীক্ষা দলের সরেজমিন যাচাইয়েও সহযোগিতা করতে হবে। নিরীক্ষার সময় কোনো তথ্য, সিদ্ধান্ত বা মূল্যায়ন নিয়ে সংস্থাগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রথমে যৌথ নিরীক্ষা সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তাতেও ঐকমত্য না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিজস্ব মতামত ও তার কারণ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে পারবে।
Shamiur Rahman
