কৃষক উৎপাদন করেন কিন্তু বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? দুই দশকেও মেলেনি উত্তর!

লবণচাষিদের জন্য ভর্তুকি, সল্ট বোর্ড, আমদানি নিয়ন্ত্রণ—দাবিগুলো কি এখনও পুরোনো?

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:১৩ পিএম

লবণের দানা সাদা। কিন্তু এই খাতের নীতির হিসাব এত ধূসর কেন—এই প্রশ্নের উত্তর এবার শুধু কৃষক বা ব্যবসায়ীকে নয়, নীতিনির্ধারকদেরও দিতে হবে

বাংলাদেশের লবণ খাতের সংকট নতুন নয়। প্রতি মৌসুমে লবণচাষিরা উৎপাদন করেন, কিন্তু ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। কখনো দাম কমে যায়, আবার ঘাটতির আশঙ্কায় আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে বারবার প্রশ্ন ওঠে—দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পরও ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানিই কি প্রধান সমাধান?

নতুন মৌসুম শুরুর আগেই ১ লাখ ৫০ হাজার টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমোদন সেই প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। বিসিকের হিসাবে মাঠ ও মিলে মিলিয়ে প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার টন লবণ মজুত রয়েছে। মাসিক চাহিদা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন। অন্যদিকে ২০২৫–২৬ মৌসুমে দেশে প্রায় ১৯ লাখ ৪৫ হাজার টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত ৪০ হাজারের বেশি কৃষক।

সরকারের যুক্তি, সামনে ২০–২৫ দিনের সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানি প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, আমদানির আগে দেশীয় উৎপাদন, মজুত ও প্রকৃত চাহিদার পূর্ণাঙ্গ হিসাব কি জনসমক্ষে আসছে?

উৎপাদন করেন কৃষক, দামের নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে

এক মণ লবণ উৎপাদনে কৃষকের খরচ প্রায় ৩২০–৩৩০ টাকা। মৌসুমের শুরুতে অনেক কৃষক লোকসানেও লবণ বিক্রি করেছেন। বর্তমানে খামার পর্যায়ে দাম প্রায় ৩৮০ টাকা মণ।

লবণ মাঠ থেকে বের হওয়ার পর ব্যবসায়ী, মিল, প্রক্রিয়াজাতকারী, প্যাকেটজাতকারী, ব্র্যান্ড, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার দীর্ঘ মূল্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে। এই পুরো ব্যবস্থায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকেন উৎপাদক কৃষক।

কৃষকের ঝুঁকি বেশি—উৎপাদন খরচ, আবহাওয়া এবং সংরক্ষণ সংকট সবই তাকে সামলাতে হয়। কিন্তু বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বাজারে দাম বাড়লেও তার সুফল কৃষকের কাছে কতটা পৌঁছায়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আমদানি বরাদ্দ প্রশ্নবিদ্ধ

এবার ২৪৪টি মিলকে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ আমদানির বরাদ্দ দেওয়ার কথা এসেছে। এর মধ্যে সাতটি আধুনিক মিল তুলনামূলক বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আরও একটি প্রশ্ন হলো—এই ২৪৪টি মিলের মধ্যে ৮৬টি গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ভোজ্য লবণ উৎপাদন করেনি বলে তথ্য রয়েছে।

এই অবস্থায় দেশে উৎপাদন না করা প্রতিষ্ঠানকে আমদানি সুবিধা দেওয়ার নীতিগত ভিত্তি কী—সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে এর উত্তর পেতে প্রয়োজন প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য: কোন প্রতিষ্ঠান কত উৎপাদন করেছে, কত মজুত রয়েছে এবং তাদের প্রকৃত আমদানি প্রয়োজন কতটুকু। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে কোনও তথ্যই নেই।

দুই দশকেও কেন একই দাবি?

লবণচাষিদের জন্য ভর্তুকি, সল্ট বোর্ড এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের দাবি নতুন নয়। ২০০৮ সালে লবণচাষিদের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ওঠে। স্থানীয় লবণের মান উন্নয়নে কৃষকদের সরকারি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও তখন বলা হয়েছিল।

২০১১ সালেও স্থানীয় উৎপাদন, চাহিদা ও আমদানির অসামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় অভিযোগ ছিল, দেশে উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি থাকা সত্ত্বেও কিছু বড় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করছিল। জাতীয় লবণ নীতি ২০১১-তেও ন্যায্য মূল্য, বাফার স্টক, সহজ ঋণ এবং খাতটির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল।

প্রায় দুই দশক পরও যদি একই প্রশ্ন সামনে আসে, তাহলে সমস্যাটি শুধু উৎপাদনের নয়; নীতির বাস্তবায়ন ও বাজার কাঠামোরও।

সরকারি উদ্যোগ আছে, প্রশ্ন বাস্তবায়নে

সরকার সম্প্রতি খামার পর্যায়ে উৎপাদন খরচ যাচাই করে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, শিল্প লবণের আমদানি নিয়ন্ত্রণ, আমদানিকৃত লবণের রাসায়নিক পরীক্ষা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং স্বল্পসুদের ঋণের মতো উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের ওপর। কৃষক যদি উৎপাদন খরচের নিচে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হন, কিংবা উৎপাদন বাড়িয়েও বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতা না পান, তাহলে এসব নীতির সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে—তা পরিমাপ করা জরুরি।

লবণের ঘাটতি হলে আমদানি করা যাবে—এটি স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থার অংশ। কিন্তু আমদানিকে যেন দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার স্থায়ী বিকল্পে পরিণত করা না হয়। এজন্য প্রয়োজন—মৌসুমভিত্তিক উৎপাদন, চাহিদা ও মজুতের তথ্য প্রকাশ; আমদানির আগে প্রকৃত ঘাটতি নিরূপণ; আমদানি বরাদ্দে উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহের রেকর্ড বিবেচনা; কার্যকর ন্যূনতম খামারমূল্য; প্রয়োজন অনুযায়ী বাফার স্টক; কৃষকের জন্য সহজ ঋণ ও সংরক্ষণ সুবিধা; এবং আমদানিকৃত লবণের ব্যবহার ও মজুতের নিরীক্ষাযোগ্য হিসাব।

পুরোনো দাবি, নাকি পুরোনো সমস্যার নতুন রূপ?

ভর্তুকি, সল্ট বোর্ড বা আমদানি নিয়ন্ত্রণ—দাবিগুলো হয়তো পুরোনো। কিন্তু যদি একই সমস্যা বারবার ফিরে আসে, তাহলে দাবিগুলোকে শুধু পুরোনো বলে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

২০০৮ সালে ভর্তুকি ও সল্ট বোর্ডের দাবি, ২০১১ সালে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্য মূল্যের প্রশ্ন, আর ২০২৬ সালে আবার আমদানি, কৃষকের ন্যায্য দাম ও বাজারের ক্ষমতার ভারসাম্য—ঘুরেফিরে একই বিষয় সামনে আসছে। তাই মূল প্রশ্ন সল্ট বোর্ড হবে কি না, শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—প্রায় দুই দশক ধরে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান কেন এখনও প্রতিষ্ঠিত হলো না?

লবণের দানা সাদা। কিন্তু এই খাতের নীতির হিসাব এত ধূসর কেন—এই প্রশ্নের উত্তর এবার শুধু কৃষক বা ব্যবসায়ীকে নয়, নীতিনির্ধারকদেরও দিতে হবে। কারণ একজন কৃষক যখন এক মণ লবণ উৎপাদন করেন, তিনি শুধু একটি পণ্য তৈরি করেন না। তিনি দেশের খাদ্য ও শিল্প অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে কোনো বাজার দীর্ঘদিন শক্তিশালী থাকতে পারে না! তাই উৎপাদককে টেকসইভাবে রক্ষা করতে হলে আমদানি, বাজার ও উৎপাদন—তিনটির মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিসামঞ্জস্য তৈরি করাই এখন বড় প্রয়োজন।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত