যে ছাত্র তাঁর শিক্ষককে দিয়েছিলেন ১০০-তে ১০০: আব্দুর রশীদের স্মৃতিতে শিক্ষক অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ

একজন ছাত্রের ভালোবাসায় অমর হয়ে থাকা এক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৪ এএম

এই কারণেই হয়তো ছাত্রদের কাছে ধীরে ধীরে আমি একজন প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলাম। তবে জনপ্রিয়তা সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিছু সহকর্মীর অভিযোগও প্রধান শিক্ষকের কাছে যেত। কিন্তু শিক্ষকতা জীবনে আমি যে স্বীকৃতিটি পেয়েছিলাম, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ছিল—আব্দুর রশীদ

কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব স্মৃতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কখনো কোনো বিশেষ দিন, কোনো পরিচিত শব্দ কিংবা হঠাৎ কোনো মুখ মনে পড়ে গেলে বহু বছর আগের একটি সময় যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সকাল থেকেই মনটা অকারণেই ভার হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, মনের ভেতরের কোনো পুরোনো দরজা হঠাৎ খুলে গেছে। সেই দরজা দিয়ে একে একে বেরিয়ে আসছে আমার শিক্ষকতা জীবনের অসংখ্য স্মৃতি—প্রিয় স্কুল, সহকর্মী, শ্রেণিকক্ষ, ব্ল্যাকবোর্ড, পরীক্ষার খাতা, ছাত্রদের হাসিমুখ। কিন্তু সব স্মৃতিকে ছাপিয়ে বারবার একটি মুখই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। আমার প্রিয় ছাত্র—আব্দুর রশীদ।

চোখের পানি দেখে ছেলে সাগর জানতে চাইল, “আব্বু, তুমি কি কোনো কারণে কষ্ট পেয়েছ?” আমি উত্তরে তাকে বললাম, তোমাদের ভালোবাসা ও যত্নে কষ্ট পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তারপরও যখন সে আমার বিষণ্নতার কারণ জানতে চাইল, তখন শেষ পর্যন্ত তাকে বলতে হলো সেই ছাত্রটির কথা—যার স্মৃতি আজও আমার শিক্ষকসত্তার সবচেয়ে কোমল জায়গাটিকে নাড়া দেয়।

শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত

আমার শিক্ষকতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রাজুয়েট হিসেবে তখন আমি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

নিয়োগের বিষয়ে তৎকালীন শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী স্যারের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন—সরকারি ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিতে। চাইলেই তিনি আমার নিয়োগের ব্যবস্থা করতে পারবেন বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত ছিল পরিষ্কার—আমি শিক্ষক হব।

তিনি আমাকে ভেবে দেখার পরামর্শ দিলেন। পরদিন আবার দেখা হলে তিনি বললেন "মজিদ, আমি চাই তুমি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগ দাও। একদিন সচিব পর্যন্ত হতে পারবে।” আমি বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলাম, “স্যার, আমি স্কুলের শিক্ষক হয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট তৈরির কারিগর হবো।”

শেষ পর্যন্ত তিনি আমার দরখাস্তে লিখে দিলেন—“ডিডিপিআই, ঢাকা—নিয়োগ দিন।” সেই একটি বাক্যই আমার জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে মতিঝিল সরকারি বয়েজ হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই।

পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি হয়তো সচিব হতে পারিনি; কিন্তু আমার ছাত্রদের কেউ বিচারক, কেউ জেলা জজ, কেউ মেজর জেনারেল, কেউ আইনজীবী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আবার কেউ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে গেছেন। তখন বুঝিনি—একজন শিক্ষক আসলে নিজের হাতে শুধু একটি শ্রেণিকক্ষ নয়, শত শত জীবনের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।

শুধু পাঠদান নয়, মানুষ গড়ার চেষ্টা

মতিঝিল সরকারি বয়েজ হাই স্কুলে শিক্ষকতা আমার কাছে কখনো নিছক চাকরি ছিল না। বিএনসিসি, বয়স্কাউট ও রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলা, বার্ষিক বনভোজনের আয়োজন, দরিদ্র ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে কোচিং—শিক্ষকতার পাশাপাশি এসব কাজেও যুক্ত ছিলাম।

অনেক ছাত্রের বাড়িতে নিজে গিয়ে তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার খোঁজ নিতাম। আমার বিশ্বাস ছিল, একজন ছাত্রের খাতা দেখে তার জীবনকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। তাকে বুঝতে হলে তার চোখের দিকে তাকাতে হয়, তার পরিবারের দরজায় যেতে হয়।

ক্লাসেও আমার নিজস্ব পদ্ধতি ছিল। চেয়ারে বসে পড়াতাম না। দাঁড়িয়ে, গল্পের ছলে, হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে কঠিন বিষয় সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা করতাম। আমি চাইতাম, ছাত্ররা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পাক; তারা ভালো মানুষ হয়ে উঠুক। দেশকে ভালোবাসুক, স্বাধীনতার ইতিহাস জানুক, ভাষাশহীদ ও মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগকে মনে রাখুক এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক ও দেশসেবক হিসেবে ভাবতে শিখুক।

এই কারণেই হয়তো ছাত্রদের কাছে ধীরে ধীরে আমি একজন প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলাম। তবে জনপ্রিয়তা সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিছু সহকর্মীর অভিযোগও প্রধান শিক্ষকের কাছে যেত। কিন্তু শিক্ষকতা জীবনে আমি যে স্বীকৃতিটি পেয়েছিলাম, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ছিল—আব্দুর রশীদ।

ষষ্ঠ শ্রেণির সেই ছেলেটি

১৯৭৩ সালে আব্দুর রশীদ ছিল ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র এক ছাত্র মতিঝিল সরকারি বয়েজ হাই স্কুলের প্রতিটি ছাত্রই আমার প্রিয় ছিল। কিন্তু রশীদের প্রতি আমার মমতা ছিল একটু আলাদা।

সে শুধু ফার্স্টবয় ছিল না। পড়াশোনা, খেলাধুলা, কাজকর্ম, মানবিকতা ও পরোপকার—সব ক্ষেত্রেই সে ছিল অসাধারণ। মেধাবী, ভদ্র, হাসিখুশি ও মানবিক এই ছেলেটিকে খুব অল্প বয়সেই আলাদা করে চিনতে পেরেছিলাম।

তবে তখনও জানতাম না, একদিন এই ছাত্রই আমার শিক্ষকজীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হয়ে উঠবে।

‘তোমার প্রিয় শিক্ষক’—যে রচনা বদলে দিল একটি দিন

ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের। রশীদ তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র।

ষান্মাসিক পরীক্ষায় বাংলা দ্বিতীয় পত্রে রচনার বিষয় দিয়েছিলাম—“তোমার প্রিয় শিক্ষক”।

পরীক্ষার খাতা দেখতে গিয়ে রশীদের খাতায় চোখ পড়তেই আমি থমকে গেলাম।

সে লিখেছে আমাকে নিয়ে।

আমার চলাফেরা, কথাবার্তা, পড়ানোর ধরন, ছাত্রদের সঙ্গে আচরণ, স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রম—সবকিছু সে এমন সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছিল যে আমি বিস্মিত হয়ে যাই।

আরও বিস্ময়ের বিষয় ছিল, আমার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথাও সে এমনভাবে লিখেছিল, যা কোনো বই বা সংবাদপত্র থেকে মুখস্থ করা সম্ভব নয়। সে আমাকে দেখেছিল, আমার কথা শুনেছিল, আমার কাজ লক্ষ্য করেছিল। তারপর নিজের হৃদয় দিয়ে আমাকে বুঝেছিল।

রচনার জন্য নির্ধারিত নম্বর ছিল ২০। আমি তাকে ২০-এর মধ্যে ২০ দিলাম।

শুধু রচনায় নয়—বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পুরো পরীক্ষায় তার উত্তর ছিল এতটাই নিখুঁত যে শেষ পর্যন্ত তাকে ১০০-এর মধ্যে ১০০ দিতে হয়।

একটি বানান ভুল নেই। বাক্য গঠনে ত্রুটি নেই। এমনকি দাঁড়ি-কমারও ভুল নেই।

আমি বুঝেছিলাম—এটি সাধারণ কোনো ঘটনা নয়।

প্রধান শিক্ষকের সামনে সেই খাতা

স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার খাতা ছাত্রদের দেখানো হলো। বাংলা দ্বিতীয় পত্রে একজন ছাত্র ১০০ পেয়েছে—খবরটি ধীরে ধীরে শিক্ষকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।

একদিন প্রধান শিক্ষক মাহমুদুল হক খান স্যার আমাকে ডেকে বললেন,

“মজিদ সাহেব, বাংলা দ্বিতীয় পত্রে কেউ কোনোদিন ১০০-এর মধ্যে ১০০ পেয়েছে—এমন কথা আমি জীবনে শুনিনি, দেখিনি। আপনি কি কখনো শুনেছেন বা দেখেছেন?”

আমি বললাম, “স্যার, আমিও কখনো শুনিনি, দেখিনি। কিন্তু আব্দুর রশীদকে ১০০ দিতে আমি বাধ্য হয়েছি।”

তিনি খাতাটি দেখতে চাইলেন। দীর্ঘ সময় ধরে একবার নয়, বারবার খাতা দেখলেন। কোনো ভুল খুঁজে পেলেন না।

এরপর তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষকদের কমনরুমে গেলেন। সেখানে তিনি সহকর্মীদের বললেন, রশীদের খাতা তিনি কয়েকবার পড়েছেন, কিন্তু একটি ভুল তো দূরের কথা, একটি দাঁড়ি-কমার ভুলও খুঁজে পাননি।

তারপর তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন—রশীদের রচনার মাধ্যমে তিনি প্রথম জানতে পেরেছেন যে মজিদ সাহেব একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রাজুয়েট এবং ক্যাডার সার্ভিসে না গিয়ে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছেন।

প্রধান শিক্ষক তখন অন্য শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছিলেন—“আপনারাও তো আব্দুর রশীদের শিক্ষক। আপনারা কি কেউ আগে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন যে এই ছেলেটি এমন প্রতিভাবান?”

সেদিন রশীদের রচনা শুধু আমার মূল্যায়ন করেনি; বরং আমাকে নতুন করে চিনিয়েছিল।

একজন ছাত্র তার শিক্ষককে আবিষ্কার করেছিল।

আর একজন শিক্ষক তার ছাত্রের ভেতরের প্রতিভাকে আবিষ্কার করেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত সব শিক্ষক রশীদের খাতা দেখে ১০০ নম্বরই দিয়েছিলেন।

সেদিন আমার মনে হয়েছিল—একজন শিক্ষকের জীবনে ছাত্রের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার নেই।

ফার্স্টবয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

এসএসসি পর্যন্ত রশীদ আমার ছাত্র ছিল। তাদের বাসা ছিল মগবাজার রেলক্রসিংয়ের পাশে। পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান হলে তার বাবা আমাকে বিশেষভাবে তাদের বাসায় নিয়ে যেতেন।

রশীদের বাবাও ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও হাসিখুশি মানুষ। আমার স্মৃতি অনুযায়ী, তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পর আর সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি।

১৯৭৯ সালে আব্দুর রশীদ মতিঝিল সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় থেকে বোর্ডে প্রথম হয়ে এসএসসি পাস করে। ১৯৮১ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়।

পরবর্তীতে আইন বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করে এবং সেখানেই প্রভাষক হিসেবে যোগ দেয়।

একজন স্কুলশিক্ষকের জন্য এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে?

যে ছেলেটিকে একদিন ষষ্ঠ শ্রেণির বেঞ্চে বসে পড়িয়েছিলাম, সেই ছেলেই একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলো।

এটাই হয়তো একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

জীবন যেন একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছিল

জীবন আমাকে নানা পথে নিয়ে গেছে। ব্যবসা, ঠিকাদারি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আইন পেশায় যুক্ত হয়েছি।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, রশীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে পরবর্তী জীবনে আমার একই পেশায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাদের কেউ বিচারক হয়েছেন, কেউ আইনজীবী, কেউ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

একসময় রশীদ ছিল আমার ছাত্র।

পরে সে হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

তার সহপাঠীদের কেউ কেউ হয়ে গেলেন আমার সহকর্মী।

আর যে শিক্ষক রশীদ ও তার সহপাঠীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছিলেন, অ্যাডভোকেট হরিদাস পাল, তিনিও পরবর্তীতে আমার সহকর্মী হয়েছেন।

শিক্ষকতা, ছাত্রত্ব ও সহকর্মিতা—মনে হয়, একই জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়।

যে প্রশ্নের উত্তর আজও পাইনি

কিন্তু এই স্মৃতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়টি আসে ১৯৯২ সালের দিকে। সালটি আমার স্মৃতিতে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করার সময় আব্দুর রশীদ এক ভয়াবহ ঘটনার শিকার হয়। তার নিজের পিতা নিজ পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করেন—এমনটাই আমার জানা।

কিন্তু কেন?

একজন বাবা কেন নিজের সন্তানকে হত্যা করবেন?

যে সন্তান ছিল পরিবারের গর্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মেধাবী, ভদ্র ও সবার প্রিয়—তার জীবন কেন এভাবে থেমে গেল?

এই প্রশ্নের উত্তর আজও আমার কাছে নেই।

চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, রশীদের বাবা সম্ভবত গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে এই ব্যাখ্যাও আমার বুকের ভেতরের প্রশ্নকে পুরোপুরি থামাতে পারে না।

কারণ আমি রশীদের মধ্যে শুধু একজন মেধাবী ছাত্রকে দেখিনি। আমি দেখেছিলাম একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

ভেবেছিলাম, সে আরও বড় হবে। আরও অনেক ছাত্রকে পড়াবে। দেশের জন্য কাজ করবে। তার জ্ঞান দিয়ে মানুষের উপকার করবে।

কিন্তু জীবন তার জন্য অন্য একটি গল্প লিখে রেখেছিল।

একটি পরীক্ষার খাতা, একটি ‘১০০’ এবং এক জীবনের স্মৃতি

আব্দুর রশীদ কখনো বিয়ে করেনি। তার জীবনের যে অংশটি আমি দেখেছি, সেখানে সে ছিল জ্ঞান, শিক্ষা, আদর্শ ও মানবিকতার এক অসাধারণ প্রতিভা।

একজন শিক্ষক জীবনে অসংখ্য ছাত্র পড়ান। কেউ ভুলে যায়, কেউ মনে রাখে। কেউ প্রতিষ্ঠিত হয়ে ফিরে এসে বলে, “স্যার, আপনার কথা আজও মনে আছে।”

কিন্তু কোনো কোনো ছাত্র শিক্ষককে এমনভাবে স্পর্শ করে যায় যে তার মৃত্যুর বহু বছর পরও হঠাৎ কোনো এক সকালে তার কথা মনে পড়ে চোখে পানি চলে আসে।

আব্দুর রশীদ আমার কাছে তেমনই একজন।

আজও মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান পুরস্কার কোনো পদক নয়, কোনো সরকারি সম্মান নয়, কোনো বড় পদ নয়, কোনো অর্থসম্পদও নয়।

আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো সেই পুরোনো পরীক্ষার খাতাটি—যেখানে সপ্তম শ্রেণির একটি ছেলে লিখেছিল তার ‘প্রিয় শিক্ষক’-এর কথা।

সেই রচনার প্রতিটি শব্দ যেন আমার শিক্ষকজীবনের আয়না। সেখানে আমি নিজেকে দেখেছিলাম একজন ছাত্রের চোখ দিয়ে।

একজন শিক্ষক প্রতিদিন শত শত কথা বলেন। কিন্তু কখনো কখনো একটি ছাত্রের লেখা কয়েকটি পৃষ্ঠা সেই শিক্ষককে সারাজীবনের জন্য অমর করে দিতে পারে।

রশীদের লেখা সেই রচনাটি আমার কাছে তেমনই।

রশীদ আমাকে যে ‘১০০’ দিয়ে গেছে

আজ যখন ছেলেকে রশীদের কথা বলছিলাম, সেও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। সে জানতে চেয়েছিল—কেন এমন হলো, কীভাবে হলো, রশীদের বয়স কত ছিল।

আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

কারণ সত্যিই আমার কাছে কোনো উত্তর নেই।

শুধু জানি—আমার সেই প্রিয় ছাত্রটি আর নেই।

যে ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে বসে তার শিক্ষককে নিয়ে এমন একটি রচনা লিখেছিল, যার প্রতিটি শব্দ আজও আমার হৃদয়ে খোদাই হয়ে আছে, সে আজ পৃথিবীতে নেই।

তবু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, মানুষ শুধু তার শরীর দিয়ে বেঁচে থাকে না। মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে, আদর্শে, সৃষ্টিতে এবং অন্য মানুষের স্মৃতিতে।

আব্দুর রশীদও বেঁচে আছে—আমার স্মৃতিতে, তার সহপাঠীদের স্মৃতিতে, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের স্মৃতিতে এবং সেই পুরোনো পরীক্ষার খাতার প্রতিটি অক্ষরে।

আজ এত বছর পরও যখন রশীদের কথা মনে পড়ে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে ষষ্ঠ শ্রেণির সেই সরল, হাসিখুশি, মেধাবী ছেলেটির মুখ।

তারপর মনে পড়ে সপ্তম শ্রেণির সেই পরীক্ষার খাতা।

রচনার বিষয়—“তোমার প্রিয় শিক্ষক।”

আমি তাকে ২০-তে ২০ দিয়েছিলাম। বাংলা দ্বিতীয় পত্রে দিয়েছিলাম ১০০-তে ১০০।

কিন্তু সত্যি বলতে কী—রশীদই আমাকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ১০০ নম্বরটি দিয়ে গিয়েছিল।

সেই নম্বর ছিল ভালোবাসার।

সেই নম্বর ছিল বিশ্বাসের।

সেই নম্বর ছিল একজন ছাত্রের চোখে তার শিক্ষকের মর্যাদার।

আজও মনে হয়, সেদিন আমি তাকে ১০০ নম্বর দিইনি—সে-ই আমাকে ১০০ নম্বর দিয়ে গিয়েছিল।

আর হয়তো এটাই একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

একজন শিক্ষক কতজন ছাত্র পড়িয়েছেন, সেটিই তার জীবনের একমাত্র হিসাব নয়। তার ছাত্রদের মধ্যে কতজন মানুষ হয়ে উঠেছে, কতজন তাকে হৃদয়ে ধারণ করেছে—সেখানেই তার শিক্ষকজীবনের প্রকৃত সার্থকতা।

আব্দুর রশীদ আমার সেই সার্থকতার এক উজ্জ্বল নাম।

আজও কখনো হঠাৎ তার কথা মনে পড়ে চোখে পানি আসে। জানি না, এই কান্না দুঃখের, না ভালোবাসার।

সম্ভবত দুটোরই।

কারণ কিছু মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু একজন শিক্ষকের হৃদয় থেকে তারা কোনোদিন চলে যেতে পারে না।

আব্দুর রশীদও তেমনই একজন।

আমার প্রিয় ছাত্র।

আমার শিক্ষকতাজীবনের এক অমলিন স্মৃতি।

আমার হৃদয়ের চিরন্তন ‘১০০-তে ১০০’।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত