জলবায়ু পরিবর্তন ও ই-বর্জ্য সংকট: প্রযুক্তির ছায়ায় লুকানো জলবায়ু হুমকি

সালাহউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৭ এএম

জাতিসংঘের গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪ অনুযায়ী ২০২২ সালে বিশ্বে ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭ হাজার টন। এর মধ্যে মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি ৭৮ শতাংশের ভাগ্য অজানা, যা ল্যান্ডফিলে, খোলা পরিবেশে পুড়িয়ে ফেলা হয় অথবা অবৈধভাবে পাচার করা হয়। ২০১০ সালে এই পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ টন। অর্থাৎ ১২ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকে জীবাশ্ম জ্বালানি ও বন উজাড়। কিন্তু এর আড়ালে একটি দ্রুত বর্ধনশীল খাত নীরবে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে চলেছে, তা হলো ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক খেলনা পর্যন্ত সবকিছুই একসময় ই-বর্জ্যে পরিণত হয়।

জাতিসংঘের গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪ অনুযায়ী ২০২২ সালে বিশ্বে ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭ হাজার টন। এর মধ্যে মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি ৭৮ শতাংশের ভাগ্য অজানা, যা ল্যান্ডফিলে, খোলা পরিবেশে পুড়িয়ে ফেলা হয় অথবা অবৈধভাবে পাচার করা হয়। ২০১০ সালে এই পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ টন। অর্থাৎ ১২ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এই পরিমাণ ৮ কোটি ২০ লাখ টনে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে ঢাকাতেই ১ লাখ ৩০ হাজার টন। এছাড়া প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টন বৈদ্যুতিক বর্জ্যসহ অন্যান্য বিপজ্জনক বর্জ্য তৈরি হয়। দেশে আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং হার ৩ শতাংশেরও কম। বাকি প্রায় ৯৭ শতাংশই পরিচালিত হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে কোনো পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই।

ই-বর্জ্যের সাথে জলবায়ুর সম্পর্ক তিনটি স্তরে কাজ করে। প্রথমত, উৎপাদন পর্যায়ে কার্বন ফুটপ্রিন্ট। একটি স্মার্টফোন তৈরিতে প্রায় ৫৫ থেকে ৯৫ কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। এর ৮০ শতাংশই নির্গত হয় খনি থেকে কাঁচামাল উত্তোলন ও চিপ তৈরির সময়। একটি ল্যাপটপের জন্য এই পরিমাণ ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৫০ কোটি স্মার্টফোন বিক্রি হয়, যার মোট কার্বন নিঃসরণ বাংলাদেশের মতো একটি দেশের বার্ষিক নিঃসরণের সমান।

দ্বিতীয়ত, বর্জ্য পর্যায়ে সরাসরি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন। ই-বর্জ্যে থাকা রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস যেমন সিএফসি, এইচএফসি এবং হাইড্রোকার্বন বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে ১৪ হাজার গুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে। জাতিসংঘের হিসাব মতে, প্রতি বছর ফেলে দেওয়া ফ্রিজ ও এসি থেকে নির্গত রেফ্রিজারেন্টের কারণে প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যোগ হয়।

তৃতীয়ত, অনুপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় মিথেন ও কালো কার্বন। যখন ই-বর্জ্য খোলা জায়গায় পোড়ানো হয়, তখন প্লাস্টিক ও সার্কিট বোর্ড থেকে ডাইঅক্সিন, ফিউরান এবং ব্ল্যাক কার্বন নির্গত হয়। ব্ল্যাক কার্বন ১০০ বছরে কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে ৯০০ গুণ বেশি উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া ল্যান্ডফিলে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের জৈব অংশ পচে মিথেন তৈরি করে।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। ই-বর্জ্যে প্রায় ৬০টির বেশি মৌল থাকে, যার মধ্যে সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম, পলিভিনাইল ক্লোরাইড এবং ব্রোমিনেটেড ফ্লেম রিটারডেন্ট অন্যতম। একটি পুরনো সিআরটি মনিটরে প্রায় ১ থেকে ২ কেজি সীসা থাকে। এই সীসা মাটিতে মিশলে ১০০ বছর পর্যন্ত থেকে যায়।

বাংলাদেশের ধলপুর, কামরাঙ্গীরচর, নারায়ণগঞ্জের ভাঙারি পল্লীতে মাটির নমুনায় নিরাপদ মাত্রার চেয়ে ১০ থেকে ৩৫ গুণ বেশি সীসা ও ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে। এই মাটিতে উৎপাদিত শাকসবজি ও মাছের মাধ্যমে তা মানবদেহে প্রবেশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম পার ডেসিলিটারের বেশি হলে বুদ্ধিমত্তা হ্রাস ও স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়।

পারদ কিডনি ও মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। ক্যাডমিয়াম ফুসফুস ও হাড়ের ক্ষয় ঘটায়। অনানুষ্ঠানিকভাবে সার্কিট বোর্ড পোড়ানোর সময় নির্গত ডাইঅক্সিন ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। ই-বর্জ্য আসলে আর্বান মাইন। ১ টন মোবাইল ফোনের সার্কিট বোর্ড থেকে প্রায় ৩০০ গ্রাম সোনা পাওয়া যায়, যেখানে ১ টন স্বর্ণ আকরিক থেকে পাওয়া যায় মাত্র ৫ গ্রাম। ২০২২ সালে উৎপন্ন ই-বর্জ্যের মধ্যে প্রায় ৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ধাতু ছিল, যেমন সোনা, রূপা, তামা, প্লাটিনাম। এর মাত্র ২২ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অর্থ ল্যান্ডফিলে চাপা পড়েছে।

এই ধাতুগুলো নতুন করে খনি থেকে তুলতে গেলে আরও বিশাল পরিমাণ জ্বালানি পোড়াতে হয় ও বন উজাড় করতে হয়। এই সংকট মোকাবিলায় চারটি স্তরে কাজ করতে হবে।

নীতিগত সংস্কার: বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ থাকলেও এর প্রয়োগ দুর্বল। প্রযোজকের বর্ধিত দায়িত্ব বা ইপিআর বাধ্যতামূলক করতে হবে। অর্থাৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে তার পণ্যের জীবনচক্র শেষে ফেরত নেওয়া ও রিসাইকেলের দায়িত্ব নিতে হবে। ভারত ২০২২ সালে এই নীতি কঠোরভাবে চালু করেছে।

আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং অবকাঠামো: প্রতিটি বিভাগীয় শহরে পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন, ভাঙারি শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রদান, এবং সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে পৃথক সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করা।

ভোক্তার আচরণ পরিবর্তন: পণ্যের আয়ু বাড়ানো, মেরামত সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা, রাইট টু রিপেয়ার আইন প্রণয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৪ সাল থেকে স্মার্টফোনের ব্যাটারি সহজে খোলা যায় এমন বাধ্যবাধকতা চালু করেছে।

কার্বন ক্রেডিটের সাথে যুক্ত করা: সঠিকভাবে ই-বর্জ্য রিসাইকেল করলে যে কার্বন নিঃসরণ কমে, তার জন্য কার্বন ক্রেডিট প্রদান করা যেতে পারে, যা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে।

প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক জীবন অচল। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যদি এমন হয় যে তা আমাদের বাতাস, মাটি ও জলবায়ুকেই ধ্বংস করে, তাহলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের ফেলে দেওয়া ফোন ও ল্যাপটপের সঠিক গন্তব্য নিশ্চিত করা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত