বাস ভাড়া বাড়ল, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
বৈঠক শেষে সংসদ সদস্য ও শ্রমিকনেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস জানান, সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে যারা বেশি ভাড়া নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে
সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের পর এখন দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হলো। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়াল ২ টাকা ৭০ পয়সা।
বৈঠক শেষে সংসদ সদস্য ও শ্রমিকনেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস জানান, সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে যারা বেশি ভাড়া নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, বৈঠকে পরিবহন মালিকদের প্রস্তাব ছিল প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর। সেখান থেকে ৩ পয়সা কমিয়ে ১৭ পয়সা করা হয়েছে। এতে নিত্যপণ্যের দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে জনসাধারণকে সেটা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়ে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। নতুন এই দাম গতকাল সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে।
নতুন দামবৃদ্ধির আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছিল। তবে নতুন দাম অনুযায়ী, এখন ডিজেলের দাম বেড়ে লিটারপ্রতি ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের পর গতকাল বাস ভাড়াও বাড়ানোর প্রস্তাব দেন পরিবহন মালিকরা। কিলোমিটার প্রতি বাস ভাড়া ১৮ থেকে ২০ পয়সা বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে প্রস্তাব দেন তারা। সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়।
ভোগান্তিতে যাত্রীরা
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গণপরিবহন খাতে, আর সবচেয়ে বড় চাপ বইতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। সরকারিভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন রুটে অঘোষিতভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিনের যাতায়াতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে বাধ্য হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, বাড়ছে ভোগান্তি ও অসন্তোষ। নজরদারির ঘাটতি ও সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে এই অনিয়ম আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে গতকাল মঙ্গলবার যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিস্থিতি নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেক জায়গায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল রুটে মিডলাইন পরিবহনে নিয়মিত যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী কাশেম মিয়া বলেন, কয়েক দিন ধরে কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে হেল্পাররা ভাড়া না দিলে নেমে যেতে বলছেন। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী-শাহবাগ রুটে আগে ২০ টাকা ভাড়া থাকলেও এখন ২৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। একইভাবে সায়েদাবাদ থেকে ফার্মগেট রুটে ভাড়া ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাত্রীদের দাবি, কোনো ধরনের সরকারি নির্দেশনা ছাড়াই ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে, যা তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজিমপুর-মিরপুর রুটের যাত্রী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত হাফ পাস নিয়েও টালবাহানা করা হচ্ছে। নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, অথচ সেবার মান অপরিবর্তিত। এতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং মাঝে মধ্যে হেল্পারদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
একই ধরনের অভিযোগ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, পল্টন ও শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া গেছে। যাত্রীরা বলছেন, আয় না বাড়লেও যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তঃজেলা বাসেও ভাড়ার চাপ বেড়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, পরিবহন শ্রমিকদের দাবি ভিন্ন। মালঞ্চ পরিবহনের এক হেল্পার জানান, তারা আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। তবে যানজটের কারণে ট্রিপ কমে যাওয়ায় আয় কমে গেছে। সরকারি নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
বাড়তি ভাড়ার প্রভাব শুধু বাসে সীমাবদ্ধ নয়; লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রাইড শেয়ারিং সেবাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বেশি।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর গণপরিবহন খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ভাড়া নির্ধারণে অনিশ্চয়তা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারির অভাবে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। দ্রুত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা।
Shamiur Rahman
