প্রশ্নবিদ্ধ বদলি-পদায়ন ‘গ্রেপ্তার-বাণিজ্যে’ ক্ষুদ্ধ স্থানীয়রা

নেত্রকোনা সদর থানার ওসি আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, তদন্ত দাবি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:০৭ পিএম

ওসি আবুল খায়ের, পিয়াস, এসআই নিরুপম নাগ এবং সংশ্লিষ্ট জেলা ও রেঞ্জ পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে

নেত্রকোনা সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়েরকে ঘিরে বদলি-পদায়ন, কথিত আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং মামলা ও গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে থানার সাবেক রাইটার হিসেবে পরিচিত পিয়াসের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তার ও মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়গুলো ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলোর সঙ্গে পুলিশের বদলি-পদায়নের স্বচ্ছতা এবং থানার কার্যক্রমের জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িত উল্লেখ করে এই বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য শরীফ আহমেদের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের কারণে আবুল খায়ের ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন থানায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে তারাকান্দা, ফুলপুর ও হালুয়াঘাট থানায় বিভিন্ন সময়ে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বলে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে একাধিক অভিযোগকারী।

এখানেই শেষ নয়, স্রেফ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে আওয়ামী লীগের প্রতি নগ্ন আনুগত্য পোষন করে গেছেন আবুল খায়ের। তিনি প্রায়শই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে রীতিবিরুদ্ধ পুষ্পস্তবক অর্পণ করতেন। এই বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আবুল খায়ের এফটি টীমের কাছে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন যে রাষ্ট্রীয় দিবসে তিনি প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়েছেন। অথচ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি বা পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন না।

ওসি আবুল খায়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের সাথে সখ্যতাকে পুঁজি করে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়দের অনেকেই।

একই জেলার বিভিন্ন থানায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পেছনে প্রশাসনিক কারণ কী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এছাড়া পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি ওই এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

হালুয়াঘাট থেকে এপিবিএন, এরপর নেত্রকোনা

অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই-পরবর্তী সময়ে আবুল খায়ের হালুয়াঘাট থানায় দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে প্রায় এক বছর থাকার পর তাকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) বদলি করা হয়। কয়েক মাস পর তিনি নেত্রকোনা সদর মডেল থানায় পদায়ন পান।

এই বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল এবং প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নেত্রকোনা সদর থানায় পদায়ন পেতে আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে এই অভিযোগের সমর্থনে নির্দিষ্ট আর্থিক নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

সাবেক রাইটার পিয়াসকে ঘিরে অভিযোগ

আবুল খায়েরের পাশাপাশি থানার সাবেক রাইটার হিসেবে পরিচিত পিয়াসকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বর্তমানে থানায় কোনো সরকারি পদে না থাকলেও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মামলা ও গ্রেপ্তার সংক্রান্ত বিষয়ে মধ্যস্থতা করেন।

কাউকে গ্রেপ্তার করা, গ্রেপ্তার থেকে রেহাই দেওয়া কিংবা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের কথাও বলেছেন।

এসআই নিরুপম নাগের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

ময়মনসিংহ রেঞ্জের অধীন কর্মরত এসআই নিরুপম নাগের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছেন।

এছাড়া ব্যাপক বদলি-পদায়নের পরও তিনি কী কারণে একই কর্মস্থলে রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। 

নথিভিত্তিক তদন্ত দাবি

অভিযোগকারীরা আবুল খায়েরের দীর্ঘমেয়াদি পোস্টিং, বদলি ও পদায়নের নথি, নেত্রকোনা সদর থানায় পদায়ন ঘিরে কথিত আর্থিক লেনদেন এবং পিয়াসের মাধ্যমে মামলা-গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে এসআই নিরুপম নাগের পোস্টিং ও বদলি প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের মতে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তদন্তের মাধ্যমেই তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

ওসি আবুল খায়ের, পিয়াস, এসআই নিরুপম নাগ এবং সংশ্লিষ্ট জেলা ও রেঞ্জ পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে। এই বিষয়ে দ্য ফিন্যান্স টুডে'র একটি চৌকস টীম নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করেছে৷ এনিয়ে বিস্তারিত আগামী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত