‘আমি একা নই, ওসিও জড়িত’

পতিতাপল্লীতে মানবপাচারের অভিযোগে পুলিশ পরিদর্শক মাহবুব মিল্কির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৪৩ এএম

পুলিশ পরিদর্শক মাহবুব মিল্কি কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ থাকাকালে ময়মনসিংহ নগরীর পতিতাপল্লীতে ২৫ জন কিশোরীকে পাচার ও বিক্রিতে সহায়তা করেছেন। এর বিনিময়ে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে

ময়মনসিংহ নগরীতে কিশোরী পাচার, পতিতাবৃত্তি এবং আবাসিক হোটেলকেন্দ্রিক অনৈতিক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে পুলিশ পরিদর্শক মো. মাহবুব মিল্কির বিরুদ্ধে। তিনি ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ থাকাকালে এসব কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন এমন অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারে দুটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ১ নং পুলিশ ফাঁড়িতে যোগদানের পর পুলিশ পরিদর্শক মো. মাহবুব মিল্কি নগরীর রমেশ সেন রোডের পতিতাপল্লী এবং গাঙ্গীনাপাড়-তাজমহল মোড় এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি অনৈতিক বাণিজ্যিক চক্রকে প্রশ্রয় দেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রায় এক কোটি ৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রমেশ সেন রোডের পতিতাপল্লীতে নাবালিকা কিশোরীদের ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হতো। এসব কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে শারিরিক নির্যাতন। বিভিন্ন সময় ফাঁড়িতে ডেকে সাপ্তাহিক ও মাসিক ‘সেটিং’ বা মাসোহারা নির্ধারণ করা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাটির দাবি, এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব মিল্কির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন ফাঁড়ি ইনচার্জ মো. মাহবুব মিল্কি বলেছিলেন, ‘এর সঙ্গে আমি একা নই, ওসি জড়িত। আমার উপরে অনেকেই জড়িত, আমি একা নাকি?’

তাকে ময়মনসিংহ থেকে গফরগাঁওয়ের একটি পুলিশ ফাঁড়িতে বদলি করা হয়। মানবাধিকার সংস্থার এক কর্মীর দাবি, মাহবুব মিল্কির ওই বক্তব্যের একটি অডিও রেকর্ডও অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে।

২৫ কিশোরী পাচারে সহায়তার অভিযোগ

পুলিশ পরিদর্শক মাহবুব মিল্কি ফাঁড়ির ইনচার্জ থাকাকালে ময়মনসিংহ নগরীর পতিতাপল্লীতে ২৫ জন কিশোরীকে পাচার ও বিক্রিতে সহায়তা করেছেন। এর বিনিময়ে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

একটি আইন সহায়তা ও মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ অধিদপ্তরে তদন্তের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লিখিত ২৫ কিশোরীর পরিচয়, তাদের পরিবারের বক্তব্য, কথিত পাচারের পদ্ধতি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এবং এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্তে কীভাবে উঠে আসে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

মানব পাচারের ‘হটস্পট’ ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহে মানব পাচার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাবলিক সিকিউরিটি ডিভিশনের ‘ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন ফর প্রিভেনশন অ্যান্ড সাপ্রেশন অব হিউম্যান ট্রাফিকিং (আপডেটেড ২০২৫-২৬)’ প্রতিবেদনে কক্সবাজার, ময়মনসিংহ ও যশোরকে মানব পাচারের হটস্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে মানব পাচার প্রতিরোধে এসব এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি যেসব জেলায় মানব পাচারের মামলা বেশি, সেখানে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মানব পাচার নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন উদ্বেগের মধ্যেই ময়মনসিংহের পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব মিল্কির বিরুদ্ধে কিশোরী পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

সীমান্তপথে পাচার চক্রের অভিযোগ

পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ময়মনসিংহের পতিতাপল্লী ছাড়াও সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া, পোড়াকান্দুলিয়া ও ঘোষগাঁও এলাকায় মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তবর্তী এসব এলাকা ব্যবহার করে পাচারকারী চক্র ভুক্তভোগীদের দেশের বাইরে পাচার করে থাকে বলে জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মী দেবদাস সাহা।

ময়মনসিংহের এক নারীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সৌদি আরবে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাকে ময়মনসিংহের পতিতাপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব মিলকীকে তিন লাখ টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

মানবাধিকার সংস্থার দাবি, একই ধরনের প্রক্রিয়ায় আরও কিশোরী ও নারীকে পাচার বা বিক্রির ঘটনায় পুলিশ পরিদর্শক মাহবুব মিল্কির সহযোগিতা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘আমি এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না’

অভিযোগের বিষয়ে মো. মাহবুব মিল্কি বলেন, ‘ভাই, আমি এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমাকে ইচ্ছা করে সরানো হয়েছে।’

এই বিষয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি শিবিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার থানায় দুটি মানব পাচারের মামলা হয়েছে। আমার থানা এলাকায় যৌনপল্লীতে কম বয়সী তরুণী ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো তরুণী বা নারী অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য

মাহবুব মিল্কির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে কিশোরী পাচার, পতিতাপল্লীকেন্দ্রিক অনৈতিক বাণিজ্য, আবাসিক হোটেল থেকে মাসোহারা আদায় এবং কোটি টাকা লেনদেনের মতো গুরুতর বিষয় রয়েছে। একই সঙ্গে তার নিজের বক্তব্যে ‘ওসি’ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ময়মনসিংহ নগরীর পতিতাপল্লী ও আবাসিক হোটেলগুলোতে কথিত ‘সেটিং’ বাণিজ্য কীভাবে পরিচালিত হতো, কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, মাসোহারা বা অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, ২৫ কিশোরী পাচারের অভিযোগের ভিত্তি কী এবং ১ কোটি ৯ লাখ টাকা কোথা থেকে কোথায় লেনদেন হয়েছে এসব বিষয় তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত