পুরান ঢাকার খাজনা সংকট: ৪০০ কোটি টাকা আটকে, অচল ২০ হাজার পরিবার

সালাহউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৫০ এএম

শুধু ঢাকা মহানগরের পুরাতন ৫টি সার্কেলে ১৮ হাজার ৭৫০ একর জমির খাজনা আদায় বন্ধ। এর আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। প্রতি বছর এই খাত থেকে সরকার ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে

পুরান ঢাকার ভূমি অফিসে এখন উল্টো দৃশ্য। সারা দেশে ভূমি অফিস খাজনা আদায়ের জন্য অভিযান চালায়, আর পুরান ঢাকায় মানুষ নিজে থেকে খাজনা দিতে এসে ফিরে যাচ্ছে। কর্মকর্তারা খাজনা নিচ্ছেন না। ফলে লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া এলাকার প্রায় ২০ হাজার পরিবারের জমির খাজনা ১০ থেকে ৩০ বছর ধরে বকেয়া পড়ে আছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, শুধু ঢাকা মহানগরের পুরাতন ৫টি সার্কেলে ১৮ হাজার ৭৫০ একর জমির খাজনা আদায় বন্ধ। এর আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। প্রতি বছর এই খাত থেকে সরকার ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

অনুসন্ধানে খাজনা না নেওয়ার পাঁচটি মূল কারণ পাওয়া গেছে।

সি.এস, এস.এ ও আর.এস রেকর্ডের গরমিল

এটি সবচেয়ে বড় কারণ। পুরান ঢাকার জমির ইতিহাস ১০০ বছরের বেশি পুরনো। ১৯১০ সালের সি.এস রেকর্ডে মালিক একজন, ১৯৫৪ সালের এস.এ রেকর্ডে আরেকজন, ১৯৬৬ সালের আর.এস রেকর্ডে আরেকজন। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সময় অনেক জমি ভুলভাবে খাস খতিয়ানে চলে যায়। আবার ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে মালিকানা পরিবর্তনের সময়ও ভুল রেকর্ড হয়। ভূমি কর্মকর্তারা বলেন, এই গরমিল থাকলে খাজনা নিলে অডিট আপত্তি হয়। তাই তারা ঝুঁকি এড়াতে খাজনা নেন না।

ওয়াকফ ও অর্পিত সম্পত্তির দ্বন্দ্ব

ঢাকা জেলায় ২ হাজার ১৪৩টি ওয়াকফ এস্টেট আছে, যার ৬০০টির বেশি নিয়ে মামলা চলছে। অন্যদিকে অর্পিত সম্পত্তি আইনে পুরান ঢাকায় ৩ হাজার ২০০ একর জমি ক ও খ তালিকায় আটকে আছে। অনেক জমিতে একই সাথে ওয়াকফ বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও ব্যক্তি মালিক দাবি করছে। ফলে খাজনা কার নামে নেওয়া হবে, তা নিয়ে ফাইল আটকে থাকে।

যৌথ খতিয়ানের ফাঁদ

পুরান ঢাকায় ৭০ শতাংশ খতিয়ান যৌথ। একটি খতিয়ানে ১০ থেকে ১৫ জন ওয়ারিশ। বর্তমান নিয়মে পুরো খতিয়ানের খাজনা একসাথে দিতে হয়। একজন তার ২ কাঠার খাজনা দিতে চাইলেও নেওয়া হয় না। বলা হয়, সবাইকে একসাথে আসতে হবে। যা বাস্তবে সম্ভব নয়, কারণ অনেক ওয়ারিশ বিদেশে থাকেন বা বেঁচে নেই।

নকশা ও দখলের অমিল

ঘনবসতি ও সরু গলির কারণে সর্বশেষ ডিজিটাল জরিপে পুরান ঢাকার অনেক মৌজার সঠিক মাপ নেওয়া যায়নি। নকশায় জমি এক জায়গায়, বাস্তবে আরেক জায়গায়। এই অমিলের কারণে খাজনা নিতে গেলে নতুন বিরোধ তৈরি হয়।

মামলার অজুহাত

আইনে বলা আছে, মামলা থাকলেও খাজনা নেওয়া যাবে, শুধু মালিকানা পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে কোনো দাগে মামলা থাকলে সেই দাগের খাজনা নেওয়া হয় না। ঢাকা জজ কোর্টে ভূমি সংক্রান্ত মামলার ৪০ শতাংশই পুরান ঢাকার। এই অজুহাতে হাজার হাজার খতিয়ানের খাজনা বন্ধ।

খাজনা না দিতে পারার কারণে তিনটি বড় ভোগান্তি হচ্ছে। প্রথমত, নামজারি হচ্ছে না। খাজনার রশিদ ছাড়া মিউটেশন হয় না। ফলে জমি কিনেও নিজের নামে করা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, জমি বিক্রি ও রেজিস্ট্রি বন্ধ। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস হালনাগাদ খাজনার রশিদ ছাড়া জমি রেজিস্ট্রি করে না। ফলে বৈধ জমিও বিক্রি করা যাচ্ছে না। তৃতীয়ত, ব্যাংক ঋণ বন্ধ। ব্যাংক খাজনার রশিদ ছাড়া জমি বন্ধক নেয় না। ফলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছেন না।

এছাড়া এই সুযোগে দালাল চক্র সক্রিয় হয়েছে। বৈধভাবে খাজনা দিতে না পেরে অনেক মানুষ অবৈধ পথে যাচ্ছে। ভূমি বিশেষজ্ঞরা চারটি সমাধানের কথা বলছেন।

এক, আংশিক খাজনা গ্রহণের সুযোগ। যৌথ খতিয়ানে যার যতটুকু অংশ, তার ততটুকু খাজনা নেওয়ার আইন করতে হবে। ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩ এ এই বিষয়টি যুক্ত করার প্রস্তাব আছে।

দুই, আপত্তিসহ খাজনা গ্রহণ। রেকর্ডে গরমিল থাকলেও খাজনা নেওয়া যেতে পারে। রশিদে লিখে দেওয়া হবে, এই খাজনা গ্রহণ মালিকানা প্রমাণ করে না। এতে সরকারের রাজস্ব আসবে, মানুষের হয়রানিও কমবে।

তিন, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন। পুরান ঢাকার জন্য আলাদা ভূমি জরিপ ও রেকর্ড সংশোধন ট্রাইব্যুনাল করতে হবে। সাধারণ আদালতে ২০ বছর লাগলেও ট্রাইব্যুনালে ৯০ দিনে রেকর্ড সংশোধন সম্ভব।

চার, ড্রোন সার্ভে ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস। ড্রোন দিয়ে পুরান ঢাকার ম্যাপ নতুন করে তৈরি করতে হবে। এবং খাজনা, নামজারি ও রেকর্ড সংশোধন একই অফিস থেকে করার ব্যবস্থা করতে হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, পুরান ঢাকারসমস্যা সমাধানে বিশেষ জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা চান তারা। কারণ খাজনা দিতে চাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত