প্রয়োজনের তালিকা ছোট হয় না, সামর্থ্যটাই ছোট হতে থাকে
‘‘তেলের দাম বাড়ে, কমে সংসারের সামর্থ্য’’
রাষ্ট্র লোকসান সামলাতে নীতি বদলাতে পারে, বাজেট পুনর্বিন্যাস করতে পারে। কিন্তু সীমিত আয়ের একটি পরিবার মাসের মাঝপথে নতুন আয় তৈরি করতে পারে না। ফলে জ্বালানির বাড়তি খরচ তার পুরোনো বাজেটের ভেতরেই জায়গা করে নেয়
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা শুধু পাম্পে থেমে থাকে না—বাসভাড়া, পণ্য পরিবহন, বাজারদর, রাইড-শেয়ারিং ও কুরিয়ার সেবার খরচ ঘুরে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় মানুষের সংসারে। “তেলের দাম বাড়লে ভাড়া বাড়বে। বাড়তি ভাড়া দেব কীভাবে? আমাদের আয় তো বাড়েনি।”
এই একটি প্রশ্নেই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সামাজিক হিসাবটি ধরা পড়ে—বাড়তি খরচের ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়ে ? ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০, অকটেন ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা। সরকারের সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক চাপ। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার বেশি হয়েছে বলে সরকারি হিসাবের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে
রাষ্ট্রের হিসাবটি আর্থিক। পরিবারের হিসাবটি মাসিক। রাষ্ট্র লোকসান সামলাতে নীতি বদলাতে পারে, বাজেট পুনর্বিন্যাস করতে পারে। কিন্তু সীমিত আয়ের একটি পরিবার মাসের মাঝপথে নতুন আয় তৈরি করতে পারে না। ফলে জ্বালানির বাড়তি খরচ তার পুরোনো বাজেটের ভেতরেই জায়গা করে নেয়।
পাম্পে দাম বাড়ে, ধাক্কা যায় ঘরে -ডিজেলের দাম বাড়লে প্রথম চাপ পড়ে পরিবহনে। বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চালানোর ব্যয় বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় ভাড়া ও পণ্য পরিবহনের খরচে প্রতিফলিত হতে পারে। কৃষকের সেচ, ব্যবসার সরবরাহ এবং বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ব্যয়ও এর বাইরে থাকে না। অর্থাৎ জ্বালানি একটি পণ্যের মতো শুধু নিজের দামই বাড়ায় না; এটি অন্য অনেক পণ্য ও সেবার খরচের ভিত্তিও নড়াচড়া করায়। রাইড-শেয়ারিং চালক, কুরিয়ার কর্মী ও খাবার ডেলিভারি রাইডারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সরাসরি। তাঁদের যানবাহনই আয়ের অন্যতম প্রধান উপকরণ। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে একই পরিমাণ আয় ধরে রাখতে তাঁদের বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। আর সেবার মূল্য বাড়লে তার একটি অংশ আবার গ্রাহকের ব্যয়ে যুক্ত হয়। ফলে পাম্পে যে মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ঘরের বাজেটে এসে ঠেকে।
মধ্যবিত্তের বাজেটে বাড়তি খাত নেই -সীমিত আয়ের পরিবারের বাজেটে অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের জন্য সব সময় আলাদা জায়গা থাকে না। মাসের শুরুতে আয় যতটা, মাসের শেষেও সাধারণত সেটিই থাকে। কিন্তু সেই আয়ের বিপরীতে জ্বালানি, যাতায়াত, বাজার ও অন্যান্য সেবার খরচ বাড়তে পারে। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—তার প্রয়োজনের তালিকা ছোট হয় না, শুধু সামর্থ্যের তালিকাটি ছোট হতে থাকে। তখন সমন্বয় শুরু হয় সংসারের ভেতর থেকে। সঞ্চয় কমে, কিছু কেনাকাটা পিছিয়ে যায়, বিনোদন বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ পড়ে। পরে এমন কিছু প্রয়োজনও পিছিয়ে যেতে পারে, যেগুলো আগে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ ছিল। মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে গভীর প্রভাব এখানেই—মানুষ শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করে না, একই আয়ের মধ্যে জীবনযাপনের পরিসরও সংকুচিত করতে বাধ্য হয়।
বিশ্ববাজারের চাপ, দেশের মানুষের প্রশ্ন -আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহের ঝুঁকি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ: বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশে কত দ্রুত আসে, আর দাম কমলে সেই স্বস্তি মানুষের কাছে কত দ্রুত পৌঁছায়? এই প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জ্বালানির মূল্য শুধু সরকারি মূল্যতালিকার একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবহন, উৎপাদন, কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, বাজারদর এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। রাষ্ট্রের হিসাবের পাশে মানুষের হিসাবও চাই- বিপিসির লোকসান কমানো, জ্বালানি আমদানির ব্যয় সামলানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বিবেচনায় নেওয়া—সবই প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় হিসাব। কিন্তু আরেকটি হিসাবও জরুরি: এই সমন্বয়ের সামাজিক খরচ কত?
একজন যাত্রী বাড়তি ভাড়া দেন। একজন রাইডার বাড়তি জ্বালানি কেনেন। একজন কৃষক বাড়তি সেচ ব্যয় বহন করেন। একজন ব্যবসায়ী পরিবহনে বেশি অর্থ দেন। শেষ পর্যন্ত ভোক্তা বাজারে গিয়ে সেই বাড়তি ব্যয়ের অংশ পরিশোধ করেন। খরচ কোথাও হারিয়ে যায় না; এক পক্ষের ব্যয় অন্য পক্ষের ওপর স্থানান্তরিত হয়।
তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু বিপিসির লোকসান বা আন্তর্জাতিক বাজারের অঙ্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতির পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা চাপের মধ্যে পড়ছে, সেটিও নীতিনির্ধারণের অংশ হওয়া দরকার। একজন মধ্যবিত্তের মাসের শেষ সপ্তাহের বাজেটও অর্থনীতির বাস্তবতা। একজন রাইডারের দিনের শেষে হাতে থাকা আয়ও অর্থনীতির বাস্তবতা। একজন কৃষকের বাড়তি সেচ ব্যয়ও সেই হিসাবের অংশ। জ্বালানি তেলের দাম তাই পাম্পের একটি নতুন সংখ্যা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয়ের নতুন চাপ।
দাম বাড়ে এক লিটারে, কিন্তু তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো সংসারে। আর তখন প্রয়োজনের তালিকা নয়—ছোট হতে থাকে সামর্থ্য।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী।
Shamiur Rahman
