প্রমত্তা পদ্মাপাড়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০১ পিএম

গত ২৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) শরীয়তপুরের জাজিরায় অবস্থিত পদ্মা ভ্যালী রিসোর্টে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশবরেণ্য গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিকদের সম্মানে এক প্রাতরাশ ও মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে

প্রমত্তা পদ্মার পাড়ে কাটানো একটি দিন সত্যিই এক অনন্য এবং সতেজ অনুভূতির জন্ম দেয়। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা কাটিয়ে নদীর বিশালতা, মুক্ত বাতাস আর কাশফুলের দোলা (শরৎকালে) মনকে মুহূর্তেই শান্ত করে তোলে। প্রকৃতির এমন নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে সম্প্রতি একটি বিশেষ আনন্দ ভ্রমণ অনুষ্ঠিত হয়েছে পদ্মাপাড়ে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) শরীয়তপুরের জাজিরায় অবস্থিত পদ্মা ভ্যালী রিসোর্টে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশবরেণ্য গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিকদের সম্মানে এক প্রাতরাশ ও মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। এতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গনমাধ্যমে কর্মরত সিনিয়র সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, রিপোর্টার, কলামিস্টদের সরব উপস্থিতি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত দেশবরেণ্য সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফিউজে) সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম, ডিইউজের সাবেক নেতা কামালউদ্দিন, ওল্ড ঢাকা জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি সালাহউদ্দিন মিঠু, দৈনিক দেশকালের সম্পাদক জাকির এইচ তালুকদার, শিবচর প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি ও দৈনিক প্রান্তের সম্পাদক আবুল খায়ের খান সহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা কাটিয়ে পদ্মাপাড়ের চমৎকার পরিবেশে গণমাধ্যমকর্মীরা এক সৌহার্দ্যপূর্ণ আড্ডায় মেতে ওঠেন। রিসোর্টে আগমণের পর অতিথিদের ঐতিহ্যবাহী ওয়েলকাম ড্রিংকস ও প্রাতরাশের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। ‘দ্য ফিন্যান্স টুডে’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক আমন্ত্রিত অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পরে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফিউজে) সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' সংবাদ তৈরিতে গতি এবং নতুন মাত্রা যোগ করলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি—যেমন নির্ভরযোগ্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনআস্থা—গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই এআই থেকে প্রাপ্ত কোনো তথ্যই যাচাই না করে সরাসরি সংবাদে ব্যবহার করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, কোনো অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট সংবাদে ব্যবহারের আগে তার সত্যতা অন্তত দুটি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ক্রস-চেক করে নিতে হবে। এআই-কে কেবল একটি সহায়ক সরঞ্জাম হিসেবে দেখা উচিত, সাংবাদিকের বিকল্প হিসেবে নয়। চূড়ান্ত সংবাদটি অবশ্যই একজন পেশাদার মানব সাংবাদিক বা সম্পাদকের দ্বারা যাচাই ও পরিমার্জিত হতে হবে।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্য, দায়িত্বশীলতা এবং মুক্ত ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা সুদৃঢ় করতে হলে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, একটি প্রশ্নবিদ্ধ গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দুষ্ট গণতন্ত্রের অবকাঠামোয় সাংবাদিকতা চর্চার ধারার অবস্থা এমন পর্যায়ে রয়েছে যেখানে স্বাধীনতাকে ছাপিয়ে কখনো কখনো শৃঙ্খলাই বড় হয়ে উঠছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত শারীরিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রায়শই প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতা বিস্তর সমস্যায় আকীর্ণ। কাজেই স্থানীয় প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বুঝতে হলে এসব সমস্যার আলোকে বুঝতে হবে। স্থানীয় সাংবাদিকরা কতটা লিখছেন বা লিখতে পারছেন তা তলিয়ে দেখতে হবে। না লিখতে পারলে এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো খুঁজে দেখতে হবে। মূল কারণগুলো খুঁজে বের করতে না পারলে একই সমস্যার ঘূর্ণাবর্তে থাকবে স্থানীয় সাংবাদিকতা, এগোবে না। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবনার দাবি রাখে। এমন না যে বিষয়গুলো প্রথমবার উল্লিখিত হচ্ছে। বহুজনের বহুবার উচ্চারিত বিষয়গুলো পুনঃচিন্তার খোরাক জোগায়। এর মধ্যে একটি হলো পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা গ্রহণ করতে না পারা। অন্যটি হলো স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ, হামলা-মামলা ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে নিজেদের ঘরের সমস্যা অনৈক্য ও দলাদলি।

তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষার অভাব সবচেয়ে বেশি। যারা জাতীয় বা স্থানীয় পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, তাদের অধিকাংশই নিয়মিত কোনো সম্মানী পান না। দু-একটি পত্রিকা সম্মানী প্রদান করলেও তা অপর্যাপ্ত। ফলশ্রুতিতে, সার্বক্ষণিক পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে গ্রহণ করার সুযোগ না থাকায় অন্যান্য পেশা বা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাই সাংবাদিকতা করতে আসেন। ফলে তাদের পক্ষে পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে কাজ করা কতটা সম্ভব, সেটি ভেবে দেখা দরকার। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের রোষানলে পড়ে তাদের প্রায়ই চরম ঝুঁকিতে কাজ করতে হয়।

দ্য ফিন্যান্স টুডের সম্পাদক ও প্রকাশক মো মতিউর রহমান বলেন, "দেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের অবদান অনস্বীকার্য।  পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও একতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই এই মিলনমেলার আয়োজন। আমরা এখানে উৎসব করতে এসেছি৷ আমরা আজ সারাদিন আনন্দ করবো, পদ্মায় ঘুরবো, একে অপরের সাথে পরিচিত হবো।

সরকারি কর্মকর্তা বা যেকোনো স্তরের অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরা সাংবাদিকদের প্রধান দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন  সাংবাদিকরা কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর একক বন্ধু নন, বরং তাদের কাজ হলো সত্যকে সামনে আনা। কিন্তু বর্তমানে তথ্য সংগ্রহ করা রীতিমতো দুস্কর। প্রকল্প পরিচালকের রুমে ঠিকাদারদের অবাধ চলাচল থাকলেও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার আজ নিয়ন্ত্রিত। মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে প্রতিটি ধাপে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এটি কোনভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকরা আজ বড় অসহায়। অতীতে আমরা যে সম্মানটা পেতাম সেটা এখন অনুপস্থিত। বাক-স্বাধীনতা আজ শৃঙ্খলিত। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং সাংবাদিকদের কল্যানে বিভিন্ন দাবি দাওয়া পূরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা এই চমৎকার উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং এই আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। 

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেন।

এর আগে, সকালের নাস্তার পর অতিথিদের নিয়ে প্রমত্তা পদ্মার বুকে নৌভ্রমনের আয়োজন করা হয়। মধ্যাহ্নভোজে অতিথিদের পদ্মা নদীর ঐতিহ্যবাহী ইলিশ, আইড় ও চিংড়ি মাছসহ বিভিন্ন পদের বাঙালি খাবারে আপ্যায়ন করা হয়। 

দিনব্যাপী এই আয়োজনে সাংবাদিকদের পেশাগত আলোচনা, পারস্পরিক মতবিনিময়, আড্ডা ও আনন্দের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার সুযোগ তৈরি হয়। সৌহার্দ্য ও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় গণমাধ্যমকর্মীদের এই ব্যতিক্রমী মিলনমেলা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত