মাগুরায় ডাকাতির স্বর্ণ ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে যুবদল নেতা শাকের হত্যা
গতকাল ৪ নভেম্বর (বুধবার) দুপুরে মাগুরা পুলিশ লাইনসের শেড রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন
গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা শাকের হোসেন। তিনি রয়েল পরিবহনে কাউন্টার মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শাকের মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন। এই হত্যাকান্ডের নেপথ্যের ঘটনা উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।
ডাকাতি করা স্বর্ণের বার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে ২০ লাখ টাকায় ভাড়াটে খুনি দিয়ে যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মারুফ হোসেনের নাম উল্লেখ করে পুলিশ দাবি করেছে, শাকেরকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদের যমুনা ব্যাংকের হিসাবে ২০ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন মারুফ। এর আগে, স্বর্ণের ভাগ নিয়ে বিরোধ মেটাতে শাকেরকে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হলেও তাতে সন্তুষ্ট হননি তিনি। এই ঘটনায় উদ্ধার করা হয়েছে ৬১ ভরি ৬ আনা স্বর্ণ, দুটি মোটরসাইকেল ও একটি প্রাইভেট কার।
গতকাল ৪ নভেম্বর (বুধবার) দুপুরে মাগুরা পুলিশ লাইনসের শেড রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন।
পুলিশ সুপার জানান, গত ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মাগুরার রামনগর এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাত দল নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে মানিকগঞ্জের মজিবর রহমানের কাছ থেকে ১৫০ ভরি ওজনের ১৪টি স্বর্ণের বার লুট করে। মজিবরকে পুলিশ পরিচয়ে বাস থেকে নামিয়ে নেন মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক মারুফ হোসেন ও পৌর যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক শাকের হোসেনের নেতৃত্বে ১২–১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল। এরপর মজিবরকে হুলিনগর এলাকার একটি নির্জন মেহগনিবাগানে নিয়ে মারধর করে ১৫০ ভরি ওজনের ১৪টি তেজাবি (সোনার গুঁড়া জমিয়ে তৈরি) সোনার দণ্ড এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

পরে, ডাকাতির শিকার হওয়ার ২২ দিন পর স্বর্ণ ব্যবসায়ী মজিবর রহমান মাগুরা সদর থানায় ২৮ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নামে মামলা করেন। ডাকাতির ১৫ দিন পর শাকেরকে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, সোনা ডাকাতির সঙ্গে শাকের হত্যার ঘটনা সম্পর্কিত। ডাকাতির সোনা ভাগাভাগি নিয়েই শাকেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সোনার দণ্ড ছিনতাইয়ের পর থেকেই ডাকাত দলের ভেতরে শুরু হয় চক্রান্ত ও বিশ্বাস ভঙ্গ। চক্রের মূল হোতা মারুফ হোসেন সহযোগীদের জানান, ডাকাতিতে মাত্র ছয়টি সোনার দণ্ড পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তথ্যদাতা পক্ষকে তিনটি দণ্ড দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট আছে মাত্রটি তিনটি দণ্ড। বাকি আটটি সোনার দণ্ড মারুফ গোপনে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে প্রতারণা করেন। মারুফের এই চক্রান্ত ধরে ফেলেন চক্রের অন্যতম সদস্য শাকের হোসেন। তিনি নিজের ভাগের সোনা ও টাকার হিসাবের জন্য মারুফকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকেন।
পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, গত ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাতটার দিকে বিষয়টি সুরাহার জন্য মাগুরা ট্রাক টার্মিনালে বসেন শাকের, মাগুরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদ, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মারুফসহ চারজন। বৈঠকে শাকের ও মারুফের মধ্যে ভাগাভাগি নিয়ে হাতাহাতি ও গালিগালাজের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে গোলাম জাহিদ মধ্যস্থতা করে পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি শাকেরকে কিছু টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেন মারুফকে এবং কিছুদিন পর বিষয়টি স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন। পরদিন ৮ অক্টোবর মারুফ হোসেন শাকেরকে পাঁচ লাখ টাকা দিলেও শাকের তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে সোনার দণ্ডের হিসাব এবং নিজের ভাগের দাবিতে চাপ বজায় রাখেন।
পুলিশ সুপার বলেন, অতিরিক্ত চাপে কোণঠাসা হয়ে একপর্যায়ে মারুফ চক্রের গোলাম জাহিদের সঙ্গে পরামর্শ করে শাকেরকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করতে মারুফ ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় গোলাম জাহিদকে ২০ লাখ টাকা দেন। পরদিন ১২ অক্টোবর গোলাম জাহিদ সেই টাকার মধ্য থেকে ১৮ লাখ টাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকের মাগুরা শাখায় নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করেন।
পুলিশ বলছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করে গত ২১ অক্টোবর ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল কাউন্টারের সামনে শাকের হোসেনের মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসানের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল মামলার তদন্তে নামে। এরপর ২টি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানে আসামি মারুফের ঘরের পেছন থেকে ৫১ ভরি ৯ আনা ওজনের ৫টি সোনার বার এবং আসামি মিল্টনের স্ত্রী মারুফার কাছ থেকে ১ ভরি ৭ আনা ওজনের একটি খণ্ডিত সোনার দণ্ড উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল, একটি প্রাইভেট কার, গুলি এবং বুলেটের খালি কার্তুজ জব্দ করা হয়েছে।
শাকের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রনি শিকদার (৩৮), বজরুক শ্রীকুন্ডি এলাকার শামীমা তাবাসসুম (৩১), ঝিনাইদহের সোনা ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদার (৫৫), বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. মারুফ হোসেন (৪৪), মো. গোলাম জাহিদ (৪৫) ও পারনান্দুয়ালী এলাকার বশির আলী।
এর মধ্যে গোলাম জাহিদ ও মারুফ হোসেনকে সোনা ডাকাতির মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তিরা হলেন পারনান্দুয়ালী এলাকার মো. জুয়েল হোসেন (৪৭), তৌকির আহমেদ (২৫), মো. ফরিদ মণ্ডল (৫৯) এবং আনসার কলোনী এলাকার মো. মিল্টন মোল্যা (৩৫) ও তাঁর স্ত্রী মারুফা আকতার (৩২)।
Shamiur Rahman
