পর্যটন খাতের অবদান জিডিপিতে ৮-৯ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য

আবু তাহের বাপ্পা প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:৩৪ পিএম

সোমবার রাজধানীর গুলশানের ক্রাউন প্লাজা ঢাকায় মেলা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান এসব কথা বলেন

দেশের পর্যটন সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ দেশ-বিদেশে তুলে ধরতে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার-২০২৬। বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০০টি বুথে এ মেলায় অংশ নেবে। হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইনস, সরকারি-বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি দূতাবাস ও মিশনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেবেন।

মেলায় দেশের পর্যটন পণ্য ও সেবার প্রদর্শনীর পাশাপাশি ডেস্টিনেশন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাংলাদেশ পর্যটন বিনিয়োগ প্রদর্শনী, ব্যবসায়িক বৈঠক, সেমিনার, প্যানেল আলোচনা, পর্যটন গন্তব্যের উপস্থাপনা, পণ্য প্রচার ও যোগাযোগ কার্যক্রম থাকবে। বাংলাদেশ, নেপাল ও ফিলিপাইনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও হবে। মেলা চলবে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

সোমবার রাজধানীর গুলশানের ক্রাউন প্লাজা ঢাকায় মেলা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা শুধু পর্যটন পণ্য প্রদর্শনের জায়গা নয়, ব্যবসায়িক সংযোগ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন গন্তব্যের প্রচার, জ্ঞান বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বে পর্যটন এখন আর শুধু অবকাশযাপন বা বিনোদনের বিষয় নয়। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পর্যটনকে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ ও পর্যটন খাত প্রায় ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এ খাতে প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

সামীমুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও সম্ভাবনা বাড়ছে। ২০২৪ সালে দেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এ অবস্থানে থেমে থাকতে চায় না সরকার। আগামী দিনে জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

তিনি বলেন, পর্যটনের অন্যতম বড় শক্তি এর বহুমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একজন পর্যটক শুধু হোটেলেই অর্থ ব্যয় করেন না; তার ব্যয়ের সঙ্গে পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, স্থানীয় গাইড, কারুশিল্প, স্থানীয় খাদ্য, কৃষিপণ্য, বিনোদন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যুক্ত থাকেন। ফলে পর্যটনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে তরুণ, নারী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এ খাত বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, বিশ্রামাগারসহ বিভিন্ন পর্যটন সুবিধা উন্নয়নের কাজ চলছে। চট্টগ্রামে ১৫৪ কক্ষবিশিষ্ট মোটেল নির্মাণ করা হয়েছে। বাগেরহাট ও খুলনায় পাঁচ তারকা হোটেল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণের জন্য ভূমি উন্নয়ন ও অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। চট্টগ্রামের পারকি পর্যটন কেন্দ্রও নির্মাণ করা হয়েছে, যা শিগগির বাণিজ্যিকভাবে চালুর আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া নবাবগঞ্জ, নোয়াখালীর হাতিয়া, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, টাঙ্গাইল ও নাটোরে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কক্সবাজারের সৈকত হোটেল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে উন্নত মানের হোটেল ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

সামীমুজ্জামান বলেন, পর্যটন শিল্প মূলত মানুষকেন্দ্রিক শিল্প। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যত আকর্ষণীয়ই হোক, দক্ষ ও অতিথিপরায়ণ সেবাকর্মী ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। এ কারণে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের জাতীয় পর্যটন ও আতিথেয়তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কোর্স চালুর পাশাপাশি শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে। পর্যটনের সুফল স্থানীয় মানুষ, তরুণ ও উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতি ও সংস্কৃতিও সুরক্ষিত রাখতে হবে।

সংবাদমাধ্যমকে পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পর্যটনকে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাংবাদিকরা পর্যটন খাতের দূত হিসেবে কাজ করতে পারেন।

সংবাদ সম্মেলনে পর্যটন বিচিত্রার সম্পাদক ও এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হেলাল বলেন, এবারের মেলা দেশি-বিদেশি পর্যটন অংশীজনদের মধ্যে ব্যবসায়িক সংযোগ, পর্যটন পণ্যের প্রচার এবং বাংলাদেশে পর্যটন বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। মেলায় হাওর, সুন্দরবন, নৌ, অ্যাডভেঞ্চার, কমিউনিটি ও পরিবেশ পর্যটনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিসহ পর্যটন খাতের বিভিন্ন সংগঠন, অংশীদার ও স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সম্পর্কিত