কালোতালিকায় থাকা ঠিকাদাররাই কাজ পাচ্ছে
সওজে নীরবে চলছে ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন
প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রয়োজনের তুলনায় কম উপকরণ ব্যবহার এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে শিথিলতার মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রকল্পে বরাদ্দ থাকা কাজ বাস্তবায়ন না করেও অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে ১৫ ঠিকাদার বাগিয়ে নিয়েছে ৭৫ হাজার কোটি টাকার কাজ
দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে গত দেড় দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে সরকার। মহাসড়ক সম্প্রসারণ, উড়ালসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বদলে গেছে দেশের সড়ক যোগাযোগের চিত্র। তবে এই উন্নয়নের আড়ালে বড় অঙ্কের অর্থ অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে কতিপয় প্রকৌশলী-ঠিকাদার রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সওজের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকার কাজ পেয়েছে মাত্র ১৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ মোট কাজের বড় একটি অংশই ঘুরেফিরে গেছে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কিছু অসাধু প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ঠিকাদারের পারস্পরিক যোগসাজশেই এই বলয় তৈরি হয়েছিল। কাজ পেতে রাজনৈতিক তদবির, প্রভাব এবং কমিশন লেনদেনের অভিযোগও ছিল অনেক। এক্ষেত্রে বিগত সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা ছিল অনেকটাই অপরাধ রক্ষায় ভ্যানগার্ডের মতো।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও ফ্যাসিবাদের কালোছায়া পড়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষনা করেছেন তা অনেকটাই ফিকে হয়ে আছে সওজে। কারণ বিগত সরকারের আমলে সড়ক যোগাযোগ খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেট বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারক এবং বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের সাথে গোপন আঁতাত করে সওজে পুনর্বাসিত হচ্ছে। এই চক্রের গুরুত্বপূর্ন অংশীদার কতিপয় দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী নামে বেনামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুলে কাজ হাতিয়ে নেওয়ার যে প্রচেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে তারা অঢেল অর্থ বিনিয়োগ করে নিজেদের অনুসারী প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়ন সম্পন্ন করেছেন
এর ফলে দীর্ঘদিন কোনঠাসা থাকা সাধারন প্রকৌশলী-ঠিকাদারদের বঞ্চনার ইতিহাস আরও দীর্ঘায়িতই হবে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের। এমনটা হলে দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হবে এই সরকার, বাধাগ্রস্থ হবে উন্নয়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে সামগ্রিক অর্থনীতি।
উন্নয়নের সঙ্গে বেড়েছে বরাদ্দ
স্বাধীনতার পর দেশের বাজেটগুলোতে পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সড়ক, মহাসড়ক ও সেতু অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়।
এই সময়ে এডিপির আওতায় সড়ক ও সেতু খাতে সরকারের প্রকল্প বরাদ্দ ও ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৩৯ হাজার ১১০ কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেতু, রেল ও নৌপথসহ পরিবহন খাতে রেকর্ড ৮৭ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যয় সংকোচন ও বড় প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ কমানো হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সড়ক ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ ছিল ৭১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। পরে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা কাটছাঁট করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা—যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা কম।
দুর্নীতিতে বিফলে উন্নয়ন ব্যয়
সওজের উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অপচয় বা আত্মসাৎ হয়েছে বলে একটি গবেষণায় উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের হিসাবে, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার কোটি থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা।
টিআইবির গবেষণায় দুর্নীতির সঙ্গে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, আমলা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারদের ত্রিপক্ষীয় যোগসাজশের কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রয়োজনের তুলনায় কম উপকরণ ব্যবহার এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে শিথিলতার মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রকল্পে বরাদ্দ থাকা কাজ বাস্তবায়ন না করেও অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকৌশলী-ঠিকাদার যোগসাজশে ডিপিপি প্রনয়ণ
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হতো ডিপিপি তৈরি থেকে। প্রকৌশলী-ঠিকাদারদের যোগসাজশে উন্নয়ন প্রকল্প ছক বা ডিপিপি তৈরি করা হতো কয়েক দিনে। ফরমায়েশি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন প্রণয়ন করে তা ডিপিপির সঙ্গে জমা দেওয়া হতো। প্রকল্পের কাজ হাতে রাখতে সওজের বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যালয়প্রধান নিজে ডিপিপি তৈরি করতেন। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প অনুমোদন সভায় ডিপিপির ওপর পর্যবেক্ষণ জানতে সওজ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুই থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের চক্রও জড়িত ছিল।
ডিপিপি প্রণয়নে অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য ২৫-৩০ শতাংশ বাড়তি ব্যয় প্রাক্কলন করা হতো। সওজের স্থানীয় দপ্তর ডিপিপি তৈরি করার সময় কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও ঠিকাদাররা নিজেদের লাভের অংশ নিশ্চিত করতেন।
কমিশন বানিজ্য
২০১১ সালে ওবায়দুল কাদেরকে সড়কমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই ফেনীর সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা, ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের ও নোয়াখালীর সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর প্রভাব বলয় শক্তিশালী হয়ে ওঠে সড়ক ভবনে। পছন্দের ঠিকাদারের যোগ্যতার সঙ্গে তাল রেখে দরপত্রের শর্তও দেওয়া হতো। এজন্য গড়ে উঠেছিল প্রকৌশলী-ঠিকাদারদের চক্র।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি প্রকল্পের কাজ পেতে ঠিকাদারদের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ কমিশন দিতে হতো। এই কমিশন পেতেন তদবিরকারী রাজনীতিক ও প্রকৌশলীরা। এছাড়া এককালীন ঘুষও পেতেন তাঁরা।
১৫ প্রতিষ্ঠানের হাতেই ৭৫ হাজার কোটি টাকার কাজ
সওজ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ২০১১-১২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকার কাজের মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকার কাজ পেয়েছে ১৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো একক ও যৌথভাবে বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যাদেশ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং কমিশনভিত্তিক দরপত্র বাণিজ্যের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পেয়েছে।
আলোচিত ১৫ প্রতিষ্ঠান হলো—হাসান টেকনো বিল্ডার্স, রানা বিল্ডার্স, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ, মো. মঈনউদ্দিন (বাঁশি), ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) লিমিটেড, তাহের ব্রাদার্স, মোহাম্মদ আমিনুল হক লিমিটেড, মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ার্স, স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স, এমএস সালেহ আহমেদ, এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স, রিলায়েবল বিল্ডার্স, তমা কনস্ট্রাকশন, মাহফুজ খান লিমিটেড ও আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন।
সওজের তথ্য অনুযায়ী, অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৫টি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। আলোচিত ১৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩টিই কোনো না কোনো সময়ে কালো তালিকাভুক্তির আওতায় এসেছে বলে সূত্রের দাবি।
এনডিই-কে ঘিরে বিতর্ক
২০১৭ সাল থেকে সওজের বড় বড় কাজে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) লিমিটেড। মাত্র ছয় বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর আশীর্বাদপুষ্ট এনডিইর কর্ণধার কর্ণধার রায়হান মোস্তাফিজ ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে পতিত সরকারের সাবেক চিফ হুইপ নুর-ই-আলম চৌধুরী লিটনের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্ক ব্যবহার করে রায়হান সওজ থেকে কাজ বাগিয়ে নিতেন। একই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মাধ্যমে সড়ক ভবনে প্রভাব বিস্তার করতেন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওবায়দুল কাদের আগেই সবুজ সংকেত দিয়ে রাখায় কাজ পেয়ে যেত এনডিই।
উল্লেখ্য, হাসান টেকনো বিল্ডার্স, রানা বিল্ডার্স, মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ার্স ও সাগর ইনফো বিল্ডার্স যৌথভাবে এনডিইর সঙ্গে কাজ করে থাকে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, হাসান টেকনো বিল্ডার্স প্রায় ১১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা এবং রানা বিল্ডার্স প্রায় ১০ হাজার ৯১১ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। হাসান টেকনোর স্বত্বাধিকারী নাজমুল হাসান ও রানা বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আলম সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে। জালিয়াতির অভিযোগে এই দুটি প্রতিষ্ঠানকেই কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
মো. আলমের আরেক ভাতিজা জুলফিকার হোসেনের মালিকানাধীন মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ার্স ৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকার কাজ পেয়েছিল। জুলফিকারের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠতা ছিল। অন্যদিকে সাগর ইনফো বিল্ডার্স ৩৯টি কাজ পায়।
পরবর্তীতে জাল ও ভুয়া নথি জমা দিয়ে কাজ নেওয়ার অভিযোগে এনডিইকে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।
শেখ পরিবারের ৩ সদস্যের হাতে ১১ হাজার কোটি টাকার কাজ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে শেখ পরিবারের প্রভাব ছিলো সবচেয়ে বেশী। সওজের বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যাদেশ এই পরিবারের সদস্যদের ঘনিষ্ঠরাই পেয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩ জন চাচাতো-ফুফাতো ভাইয়ের হস্তক্ষেপে সওজের ১১ হাজার কোটি টাকার কাজ পেয়েছিলো ৩টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাগেরহাটের সাবেক এমপি শেখ হেলাল উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ কাজী মোজাহারুল ইসলামের মালিকানাধীন মোজাহার এন্টারপ্রাইজ প্রায় ৬ হাজার ৫৩১ কোটি টাকার কাজ, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ঘনিষ্ঠ শফিকুল আলমের রিলায়েবল বিল্ডার্স ২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার কাজ এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ মাহফুজ খানের মালিকানাধীন মাহফুজ খান লিমিটেড দুই হাজার ২৮১ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়।
রাজনৈতিক অনুকূল্যে সর্বেসর্বা ঠিকাদার সিন্ডিকেট
বিগত সরকারের শাসনামলে শেখ পরিবার ব্যতিত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, নিজাম উদ্দিন হাজারী, ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা, ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের ও নোয়াখালীর সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয়।
সূত্রমতে, এমএস সালেহ আহমেদ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সওজের দুই হাজার ৯৫৯ কোটি টাকার কাজ পায়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সালেহ আহমেদ ছিলেন ফেনীর সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এদিকে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম ও সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান ভূঁইয়া দুই হাজার ৩০৯ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেন সহজেই।
এছাড়া ওবায়দুল কাদেরের ভাগ্নে পরিচয়ে আবেদ মনসুরের মালিকানাধীন আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন ছয় বছরে এক হাজার ৯১৪ কোটি টাকার কাজ পায়। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘পিয়ন’ জাহাঙ্গীর আলমের তদবিরে জে এন্টারপ্রাইজ প্রায় ১৯৭ কোটি টাকার কাজ।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ব্যতিরেকে মঈনউদ্দিন (বাঁশি) লিমিটেড প্রায় ৬ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা এবং মোহাম্মদ আমিনুল হক লিমিটেড প্রায় ৪ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।
কালো তালিকায় প্রভাবশালী ঠিকাদারগং
সওজের বিভিন্ন সময়ে নেওয়া ব্যবস্থা থেকে দেখা যায়, কাজের অনিয়ম, ধীরগতি, জাল সনদ ও অন্যান্য জালিয়াতির অভিযোগে একাধিক আলোচিত প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
রানা বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে ধীরগতিতে কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে। হাসান টেকনো বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে জাল সনদ ও অনিয়মের অভিযোগে দুই বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞার তথ্য রয়েছে।
আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন, এমএস সালেহ আহমেদ, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ ও মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ার্সের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে।
এছাড়া নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে কাজের মেয়াদ শেষ না করায় জামানত বাজেয়াপ্তসহ কালো তালিকাভুক্ত করার তথ্য পাওয়া যায়।
সওজের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাল সনদ ও অনিয়মের অভিযোগে ৪৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পটপরিবর্তনের পরও সক্রিয় পুরনো সিন্ডিকেট!
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সওজে পুরনো ঠিকাদার সিন্ডিকেটের পুনর্বাসনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিগত সরকারের আমলে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একচেটিয়াভাবে বড় বড় ঠিকাদারি কাজ পাওয়া বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী ঠিকাদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা কালো তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো। পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে তদবিরের মাধ্যমে ও চাপের মুখে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামীপন্থী অনেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারণী পদে আবার পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বড় কাজ পাওয়া মঈনউদ্দিন (বাঁশি), আমিনুল হক (প্রা.) লিমিটেড, এনডিইসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত প্রতিষ্ঠান নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও কাজ পেতে সক্ষম হয়েছে তদবির এবং মোটা টাকা খরচ করে।
তথ্যমতে, মঈনউদ্দিন (বাঁশি) ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সওজে ৭০২টি কার্যাদেশ পেয়েছে, যার চুক্তিমূল্য প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রতিষ্ঠানটি আরও ৩১৫টি কার্যাদেশ পেয়েছে, যার চুক্তিমূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
একইভাবে মুহাম্মদ আমিনুল হক (প্রা.) লিমিটেড ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৮৯৪টি কার্যাদেশ পেয়েছে, যার চুক্তিমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রতিষ্ঠানটি আরও ১৫৪টি কার্যাদেশ পেয়েছে, যার চুক্তিমূল্য প্রায় ২৩৮ কোটি টাকা বলে সূত্রের দাবি।
এসব তথ্যের ফলে প্রশ্ন উঠেছে—রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কি সওজের ঠিকাদারি কাঠামোয় পুরনো প্রভাবশালী বলয়ের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভাঙেনি?
প্রকৌশলী বদল, কিন্তু বলয় কি বদলেছে?
সওজের ভেতরে পুরনো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
১১ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে বহুল আলোচিত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সওজের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু পদায়ন বা বদলির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা-ঠিকাদার বলয় ভাঙা সম্ভব নয়। কারণ, এই বলয়ের সঙ্গে প্রকল্প, দরপত্র, কার্যাদেশ ও আর্থিক স্বার্থের একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়েছে।
স্বাধীন তদন্ত ও ফরেনসিক অডিট অত্যাবশ্যক
সওজের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, অতীতের অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বের করতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। শুধু বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে না।
তাদের মতে, বড় প্রকল্পগুলোর দরপত্র, কার্যাদেশ, ব্যয়, বিল পরিশোধ এবং কাজের মান—সবকিছু পুনঃপরীক্ষা করা দরকার। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের সম্পদের ফরেনসিক অডিট এবং অর্থের গতিপথ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
কারণ, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের নামে যদি বিপুল সরকারি অর্থ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হয়, তাহলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে। তাই উন্নয়নের গতি ধরে রাখার পাশাপাশি সওজের ঠিকাদারি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
Shamiur Rahman
