রেজিস্ট্রি অফিসে ‘ফিস’ বাণিজ্যের অভিযোগ | বদলির সঙ্গে বদলায়নি অভিযোগ

রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার গোলাম মোর্তজা: সংস্কারের আড়ালে ঘুষ, সম্পদ ও দখলবাণিজ্যের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:২৯ পিএম

গোলাম মোর্তজার কর্মজীবনের বিভিন্ন কর্মস্থল ঘিরে একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি। কুড়িগ্রামের রাজারহাট দিয়ে চাকরি শুরু করে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ, বিরল, মাগুরা সদর, চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন কর্মস্থল পেরিয়ে তিনি বর্তমানে রূপগঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোতেও ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে

বাংলাদেশের ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সম্পদ ও মালিকানার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। একটি দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে কারও সারা জীবনের সঞ্চয় যেমন নিরাপদ হয়, তেমনি অনিয়মের সুযোগ তৈরি হলে একই প্রক্রিয়া হয়ে উঠতে পারে হয়রানি, ঘুষ এবং ভূমিদখলের হাতিয়ার।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার গোলাম মোর্তজাকে ঘিরে ওঠা একাধিক অভিযোগ সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। অভিযোগগুলোতে রয়েছে ঘুষের বিনিময়ে দলিল নিবন্ধন, অফিসকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট, তদবিরের মাধ্যমে পছন্দের কর্মস্থল পাওয়া, জমি ও বাড়িসহ বিপুল সম্পদ অর্জন এবং সেই সম্পদের মালিকানা বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়দের নামে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—গোলাম মোর্তজার কর্মজীবনের বিভিন্ন কর্মস্থল ঘিরে একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি। কুড়িগ্রামের রাজারহাট দিয়ে চাকরি শুরু করে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ, বিরল, মাগুরা সদর, চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন কর্মস্থল পেরিয়ে তিনি বর্তমানে রূপগঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোতেও ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

২০১৩ সালে চাকরি, কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পদের প্রশ্ন

গোলাম মোর্তজা ২০১৩ সালে নিবন্ধন অধিদপ্তরের সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দেন। তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল কুড়িগ্রামের রাজারহাট। এরপর দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ, বিরল, মাগুরা সদরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেন।

একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সম্পদের উৎস নিয়ে।

নথিতে বলা হয়েছে, চাকরিতে যোগদানের আগে তাঁর পিতা গোলাম মোস্তফার পরিবার যশোরের নীলগঞ্জ তাতীপাড়ায় টিনশেড ও জরাজীর্ণ বাড়িতে বসবাস করত। পরবর্তী সময়ে সেখানে কয়েকতলা ভবন নির্মাণ, পাশেই ডুপ্লেক্স বাড়ি এবং যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি ও অন্যান্য সম্পদ গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের একটি অংশ সরাসরি গোলাম মোর্তজার নামে না রেখে পিতা-মাতা, বোন ও চাচার নামে রাখা হয়েছে। এতে প্রকৃত সম্পদ ও মালিকানার উৎস অনুসন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

হেবাদলিলে সম্পদ স্থানান্তরের প্রশ্ন

গোলাম মোর্তজার পরিবারের সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে ‘হেবা’ দলিলের ব্যবহারও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ২০১৫ সালে তাঁর পিতা গোলাম মোস্তফার নানাবাড়ির ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় বিভিন্ন ওয়ারিশের জমি একত্র করে হেবা দলিলের মাধ্যমে নেওয়া হয়।

যশোর সদরের নিমতলী মৌজায় খতিয়ান নং-৩১, জে.এল. নং-২২৫-এর জমি নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৮ মে মোট ৪ একর ৭২ শতক জমির নামজারি অনুমোদনের তথ্য রয়েছে এবং পরবর্তীতে ওয়ারিশদের কাছ থেকে হেবা দলিলের মাধ্যমে জমি নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

এসব হেবা দলিলের প্রকৃত চরিত্র কী, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মূল্য কত ছিল এবং দলিলগুলো প্রকৃত পারিবারিক হস্তান্তর নাকি সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার কৌশল—তা যাচাই করা প্রয়োজন।

নীলগঞ্জে বহুতল ভবন, ডুপ্লেক্স সেফ হোম

যশোরের নীলগঞ্জ তাতীপাড়ায় গোলাম মোর্তজার পরিবারের নামে একাধিক স্থাপনার তথ্য প্রতিবেদনের নথিতে উঠে এসেছে।

একটি পাঁচতলা ভবনে প্রতি তলায় তিনটি করে ইউনিট থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশেই রয়েছে দুইতলা ডুপ্লেক্স ভবন। নথিতে জমি ও ভবন মিলিয়ে ওই সম্পত্তির আনুমানিক বাজারমূল্য পাঁচ কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া কাজীপুর মুড়লী মোড়ে পাঁচতলা ভিত্তির একটি ভবন বর্তমানে একতলা অবস্থায় থাকার তথ্যও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনটি নিয়মিত বসবাসের জন্য ব্যবহার করা হয় না এবং পরিবারের পক্ষ থেকে এর মালিকানা সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

এই সম্পদগুলোর নির্মাণ ব্যয়, অর্থের উৎস, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট জমির ক্রয়মূল্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি স্পষ্ট হতে পারে।

নিকটাত্মীদের নামে সম্পদ

ঢাকার মিরপুর পূর্ব কাজীপাড়া এলাকায় ‘ARONI BUILDING-121 & 122 East Kazipara’ ঠিকানায় গোলাম মোর্তজার বোন নাদিরা পারভীন পলির নামে একটি ফ্ল্যাটের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। ফ্ল্যাটটিতে তিনটি কক্ষ, ডাইনিং, ড্রয়িং ও তিনটি বারান্দা থাকার কথা বলা হয়েছে।

নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গোলাম মোর্তজার সহযোগিতায় তাঁর বোনের স্বামী চাকরি থেকে ব্যবসায় যুক্ত হন।এখানে প্রশ্ন হলো—ফ্ল্যাটটির ক্রয়মূল্য কত, অর্থের উৎস কী এবং ক্রয়ের সময় বোন বা তাঁর পরিবারের ঘোষিত আয় ওই সম্পদ অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না।

যশোর-খুলনা মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় একটি নির্মাণাধীন গাড়ির ওয়ার্কশপ ও মার্কেটের তথ্যও অনুসন্ধানী নথিতে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালে জমি কেনার পর ২০২৪ সালে আরও জমি কেনা হয় এবং মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১৫ শতক। জমির মালিক হিসেবে গোলাম মোর্তজার চাচা জাহাঙ্গীর কবির লাভলুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে খতিয়ান, নামজারি ও দলিলের বিস্তারিত নম্বরও দেওয়া হয়েছে।

বোচাগঞ্জে শুরুঘুষের সিস্টেম’?

গোলাম মোর্তজার বিরুদ্ধে সবচেয়ে পুরোনো অভিযোগগুলোর একটি দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ কর্মস্থলকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বোচাগঞ্জে যোগদানের পর ঘুষ ছাড়া জমি বিক্রির দলিলের প্রক্রিয়া না করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হতো। কেউ ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে হয়রানির শিকার হতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তৎকালীন দিনাজপুর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমানের অভিযোগের কথাও নথিতে উল্লেখ আছে। তাঁর দাবি ছিল, দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় দলিল লেখকদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগের প্রতিবাদে ২০১৬ সালের ২ মার্চ বোচাগঞ্জ উপজেলার দলিল লেখকেরা গোলাম মোর্তজার অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

মাগুরায় সিন্ডিকেট ঘুষের হার নির্ধারণের অভিযোগ

২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর মাগুরা সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পর গোলাম মোর্তজার বিরুদ্ধে নতুন করে সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয় দলিল লেখক ও ভূমিমালিকদের অভিযোগের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অফিসের কিছু কর্মচারীকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দলিল ও জমির ধরন অনুযায়ী ঘুষের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া আন্ডারভ্যালু দলিলের ক্ষেত্রেও কথিত দাবিকৃত অর্থ না দিলে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করা হতো।

আলমডাঙ্গায়গোপন কক্ষেরহিসাব-নিকাশের অভিযোগ

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা কর্মস্থল ঘিরেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। নথিতে বলা হয়েছে, জমির কাগজপত্রে ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের নামে সাব-রেজিস্ট্রারের গোপন কক্ষে অর্থ লেনদেনের হিসাব-নিকাশ করা হতো বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অর্থ সংগ্রহে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

একটি ঘটনায় চার লাখ টাকার জমির নিবন্ধনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে দলিলে কম মূল্য দেখানো হলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয় বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

রূপগঞ্জে এসে আরও বড় অভিযোগ

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে গোলাম মোর্তজাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো ‘প্রাইজ পোস্টিং’।

অভিযোগকারীদের দাবি, নিবন্ধন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনে পদ ও প্রভাব ব্যবহার করে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রূপগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বদলি হন তিনি। রূপগঞ্জে যোগদানের পর অফিস সহকারী, মোহরার, দলিল লেখক ও ভেন্ডারদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে।

নথিতে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের দলিল—সাব-কবলা, দানপত্র, হেবা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও এওয়াজ পরিবর্তনসহ—দাখিলের পর নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে দলিল নিবন্ধনের অভিযোগও রয়েছে।

ফিসনাম দিয়ে ঘুষঅভিযোগ সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের

রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষকে ‘ফিস’ নামে আদায়ের অভিযোগটি বিশেষভাবে গুরুতর। নথিতে বলা হয়েছে, সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ সীমিত। অফিস সহকারী, মোহরার ও অন্যান্য কর্মচারীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সাব-রেজিস্ট্রারের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ গ্রহণে একজন বিশেষ মোহরার থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বদরুল আলমের জমি দখলের অভিযোগ

যশোরের কাজীপুর এলাকার একটি জমিকে কেন্দ্র করে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, বদরুল আলম ২০২৩ সালের ৪ জুলাই তাঁর বড় ফুপুর কাছ থেকে ১.৫ শতক জমি ক্রয় করেন এবং পরে তা ভোগদখল করছিলেন। খতিয়ান, নামজারি ও দলিলের বিস্তারিত তথ্যও প্রতিবেদনে সংযুক্ত রয়েছে।

অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের শুরুতে বদরুল আলম ঢাকায় কর্মরত থাকার সুযোগে গোলাম পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ওই জমির অংশ দখল করে বাড়ি সম্প্রসারণ করেন। বদরুল আলম বাধা দিলে গোলাম মোর্তজার পিতা গোলাম মোস্তফা তাঁকে লোহার শাবল দিয়ে আঘাত করেন—এমন অভিযোগও নথিতে রয়েছে। পরে মামলা, হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগের ধারাবাহিকতা

গোলাম মোর্তজার বিরুদ্ধে অভিযোগের আরেকটি দিক হলো—এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো একক ঘটনা নয় বলে দাবি করা হচ্ছে।

মাগুরা সদর, চুয়াডাঙ্গা ও আলমডাঙ্গায় দায়িত্ব পালনের সময় ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিলো তার বিরুদ্ধে। কোথাও দলিল লেখকদের সঙ্গে বিরোধ, কোথাও নির্ধারিত অর্থের বাইরে টাকা নেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও অফিসকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের অভিযোগ এসেছে। অভিযোগের এই ধারাবাহিকতা সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে—একই ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি বারবার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন?

জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ

একজন সাব-রেজিস্ট্রারের হাতে মানুষের জমি ও সম্পদের মালিকানা নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে। তাই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কেবল ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব, ভূমির মালিকানা এবং নাগরিক সেবার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

নথিতে রেজিস্ট্রেশন বিভাগকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আহরণকারী খাত হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অথচ সংস্কারের সময়েও কিছু কর্মকর্তা ঘুষবাণিজ্যে জড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এখন প্রশ্ন তিনটি—

প্রথমত, গোলাম মোর্তজা ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ কত?

দ্বিতীয়ত, তাঁর সরকারি চাকরি থেকে অর্জিত বৈধ আয় দিয়ে এসব সম্পদ অর্জন সম্ভব কি না?

তৃতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মস্থলে ওঠা ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছে?

যা যাচাই করা জরুরি

এই অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নোক্ত নথি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে—

  • গোলাম মোর্তজার সম্পদ বিবরণী ও আয়কর রিটার্ন;
  • তাঁর পিতা-মাতা, বোন ও চাচার নামে থাকা উল্লেখযোগ্য জমি ও স্থাপনার দলিল;
  • ২০১৫ সালের হেবা দলিলগুলোর মূল কপি;
  • যশোর, মিরপুর, খুলনা-যশোর মহাসড়ক ও কাজীপুরের সম্পত্তির ক্রয়মূল্য;
  • ব্যাংক ঋণ ও ব্যাংক হিসাবের লেনদেন;
  • রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিলভিত্তিক সরকারি ফি ও রাজস্ব আদায়ের হিসাব;
  • দলিল লেখক ও ভেন্ডারদের বিরুদ্ধে/পক্ষে থাকা লিখিত অভিযোগ;
  • মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা ও বোচাগঞ্জে তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ, তদন্ত ও বিভাগীয় নথি;
  • বদরুল আলমের জমি-সংক্রান্ত মামলা, পুলিশি নথি ও আদালতের আদেশ।

শেষ কথা

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন একাধিক কর্মস্থল, সম্পদ অর্জন, আত্মীয়দের নামে সম্পত্তি, দলিল নিবন্ধন এবং অফিসকেন্দ্রিক ঘুষের বিষয়ে ধারাবাহিক অভিযোগ ওঠে, তখন বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। প্রশ্নটি তাই শুধু গোলাম মোর্তজাকে ঘিরে নয়—একজন সাব-রেজিস্ট্রারের সম্পদ কীভাবে বাড়ল, সেই সম্পদের অর্থের উৎস কী, এবং তাঁর দায়িত্বপালনের বিভিন্ন পর্যায়ে ওঠা অভিযোগগুলো কেন বারবার ফিরে আসে—রাষ্ট্র কি তার উত্তর খুঁজবে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত, সম্পদের উৎস যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দলিল-নথির ফরেনসিক পর্যালোচনা। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা—দুই ক্ষেত্রেই জনস্বার্থে সত্য প্রকাশ হওয়া জরুরি।

সম্পর্কিত