মাদক-চাঁদাবাজিতে অসহায় সাধারণ মানুষ

সালাহউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:০৫ পিএম

অভিযান আছে, গ্রেপ্তার আছে—তবু কমছে না অপরাধ; প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়ে

“রাত ১০টার পর এলাকায় ইয়াবা পাওয়া যায়, চাঁদা না দিলে দোকান খোলা যায় না”—রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমন অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। মাদকের বিস্তার ও চাঁদাবাজির দাপটে কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা কার্যত অসহায় হয়ে পড়ছেন।

প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রের বিশাল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিয়মিত অভিযান এবং কঠোর আইনের পরও মাদক ও চাঁদাবাজি কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না? সমস্যা কি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতায়, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো যোগসূত্র?

সরকার কি অপরাধীদের কাছে জিম্মি—নাকি রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু দুর্বল জায়গাকে ব্যবহার করে অপরাধীরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে?

গ্রেপ্তার বাড়ছে, কমছে না মাদকের বাজার

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারাদেশে মাদক মামলায় ১ লাখ ১ হাজার ৪১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। একই সময়ে জব্দ করা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ পিস ইয়াবা এবং ১ দশমিক ২ টন হেরোইন।

কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এখনও অনেক পিছিয়ে। একই বছরে মাত্র ৮৯২ জন মাদকসেবী চিকিৎসা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে সরকারি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার রয়েছে মাত্র ৮টি, যেখানে মোট বেড ৪৭০টি।

বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন হিসাবে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি। ফলে একদিকে বিপুল চাহিদা, অন্যদিকে সীমিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এই বৈপরীত্য মাদকের বাজারকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থাৎ, শুধু মাদক জব্দ বা গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মাদকের চাহিদা কমানো এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চাঁদাবাজির প্রকৃত চিত্র কতটা বড়?

পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চাঁদাবাজির অভিযোগে ৩ হাজার ২১০টি মামলা হয়েছে।

তবে মামলা সংখ্যার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য থাকার দাবি রয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন জরিপে নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ৪২ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাঁদের নিয়মিত মাসিক চাঁদা দিতে হয়। পরিবহন খাতেও দীর্ঘদিন ধরে প্রতি ট্রিপে ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘টোল’ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যে চাঁদাবাজির বড় অংশ ভুক্তভোগীরা হয়তো থানায় গিয়ে অভিযোগই করেন না, পুলিশের মামলার পরিসংখ্যানে তার কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে?

‘জিম্মি’ হওয়ার চারটি লক্ষণ

১. আইনের অসম প্রয়োগ

মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান হলেও অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের বড় অংশ গিয়ে ঠেকে নিম্নপর্যায়ের অপরাধীদের ওপর।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃতদের ৭০ শতাংশের বেশি ছোট মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতা। আর ১ কেজির বেশি মাদকের চালানসংক্রান্ত মামলা মোট মামলার ১ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম।

চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে অনেক সময় চাঁদা সংগ্রহকারী বা কথিত ‘লাইনম্যান’ ধরা পড়লেও অর্থের মূল উৎস, নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক ও পুরো নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বড় অভিযান তুলনামূলকভাবে কম—এমন ধারণা রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

ফলে প্রশ্ন ওঠে—অপরাধের দৃশ্যমান অংশটিই কি কেবল ধরা পড়ছে, নাকি নেপথ্যের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ধরার সক্ষমতা বা সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে?

২. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ার অভিযোগ

গত কয়েক বছরে মাদক ও চাঁদাবাজির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও যুব সংগঠনের নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৩ সালে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১৭ জন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব ঘটনা অবশ্যই প্রমাণ করে না যে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকার অপরাধীদের সঙ্গে জড়িত। বরং এটি ইঙ্গিত করে, রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু দুর্বল জায়গাকে অপরাধীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

৩. অপরাধের অর্থনীতি

মাদক ও চাঁদাবাজি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থনীতি জড়িয়ে আছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যের বিপুল আর্থিক আকারের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও মাদক পাচারের ঝুঁকি তৈরি করে।

অন্যদিকে একটি বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ঘাট বা পরিবহনকেন্দ্র থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই বিপুল অর্থ কোথায় যাচ্ছে? কারা এর ভাগ পাচ্ছে? অর্থের প্রবাহ অনুসরণ করে নেপথ্যের হোতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে কি?

এই জায়গায় স্বচ্ছতার ঘাটতিই অপরাধী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।

৪. পুনর্বাসনের ঘাটতি

মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু ‘ধরো এবং জেলে পাঠাও’ নীতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। প্রয়োজন চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনঃএকীকরণ।

মাত্র ৮টি সরকারি রিহ্যাব সেন্টার এবং ৪৭০টি বেডের বিপরীতে মাদকসেবীর সংখ্যা যদি কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে থাকে, তাহলে সমস্যাটির ব্যাপকতা সহজেই অনুমান করা যায়।

অন্যদিকে বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণ পরিবেশ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নেয় অপরাধী চক্র। তারা অর্থ, কাজ কিংবা তথাকথিত ‘নিরাপত্তা’ দিয়ে তরুণদের নিজেদের নেটওয়ার্কে টেনে নেয়।

সরকার কি সত্যিই ‘জিম্মি’?

‘জিম্মি’ শব্দটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এর অর্থ হলো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার্যত অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়া।

প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে সরকার বা রাষ্ট্র পুরোপুরি অপরাধীদের কাছে জিম্মি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কারণ রাষ্ট্র এখনো অভিযান পরিচালনা করছে, গ্রেপ্তার করছে, আইন করছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।

মাদকবিরোধী অভিযান, চাঁদাবাজবিরোধী অভিযান এবং আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণের মতো বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

তবে মূল সমস্যা হচ্ছে ধারাবাহিকতা ও সমতা।

আজ বড় অভিযান হয়, কয়েক মাস পর পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। একজন প্রভাবশালী অপরাধী গ্রেপ্তার হলে তার জায়গায় নতুন কেউ উঠে আসে। ফলে অপরাধের মূল কাঠামো অক্ষত থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা

অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, এটি পুরোপুরি ‘জিম্মি রাষ্ট্র’ পরিস্থিতি নয়; বরং অপরাধীদের স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোয় প্রবেশের চেষ্টা। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, চাঁদাবাজি কমাতে হলে ব্যবসা, ট্রেড লাইসেন্স, পরিবহন পারমিট ও বাজার ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতা যত বাড়বে, অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের সুযোগও তত বাড়বে।

সমাজকর্মীদের মতে, মাদকের সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি চাহিদা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং সহজলভ্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

উত্তরণের পাঁচ পথ

১. গডফাদার ও অর্থের উৎসে অভিযান

খুচরা বিক্রেতা বা চাঁদা সংগ্রহকারীর পাশাপাশি অর্থের উৎস, মূল হোতা, সরবরাহকারী ও নেটওয়ার্কের ওপর অভিযান চালাতে হবে। অপরাধলব্ধ সম্পদ শনাক্ত ও আইন অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।

২. থানাভিত্তিক জবাবদিহিতা

প্রতিটি থানায় মাদক ও চাঁদাবাজির মামলা, গ্রেপ্তার, চার্জশিট এবং বড় কারবারি গ্রেপ্তারের তথ্য নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা পরিমাপ করা সহজ হবে।

৩. পুনর্বাসনে বিনিয়োগ

শুধু কয়েকটি সরকারি রিহ্যাব সেন্টারের ওপর নির্ভর না করে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে সরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা বাড়াতে হবে। মাদকপ্রবণ এলাকায় যুব কর্মসংস্থান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও প্রয়োজন।

৪. বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা

বাজার, ঘাট ও বাসস্ট্যান্ডের ইজারা প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও লটারির মতো স্বচ্ছ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ানো হলে অবৈধ অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করা সহজ হবে।

৫. সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা

স্কুল, মসজিদ, স্থানীয় সংগঠন ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মাদক ও চাঁদাবাজিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মাদকসেবীকে শুধু অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যক্তি হিসেবেও দেখতে হবে।

শেষ কথা

সরকার পুরোপুরি মাদক ও চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। কিন্তু রাষ্ট্র যে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে, তা অস্বীকার করার সুযোগও নেই।

অপরাধীরা এখন শুধু গলির অন্ধকারে কাজ করে না; তারা অর্থ, প্রভাব, প্রযুক্তি ও স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো ব্যবহার করে নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা করে। ফলে শুধু অভিযান দিয়ে এই লড়াইয়ে স্থায়ী জয় পাওয়া সম্ভব নয়।

প্রয়োজন আইনের সমান প্রয়োগ, নেপথ্যের অর্থের অনুসরণ, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এবং ব্যাপক পুনর্বাসন ব্যবস্থা।

কারণ একজন মাদক ব্যবসায়ী বা চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা সাময়িক সাফল্য। কিন্তু যে কাঠামো তাকে তৈরি করে, অর্থ জোগায় এবং টিকিয়ে রাখে—সেই কাঠামো ভেঙে ফেলাই রাষ্ট্রের প্রকৃত বিজয়।

তা না হলে একসময় সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণা আরও গভীর হতে পারে—রাষ্ট্রের আইন নয়, পাড়ার মাদক বিক্রেতা ও চাঁদাবাজরাই এলাকার নিয়ম নির্ধারণ করছে। আর সেটিই হবে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয়।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত