যুক্তিবাদ, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীলতার আলোকবর্তিকা
রাজবাড়ীর কৃতী সন্তান ও ‘দ্য ল্যাম্পলাইটার’ কাজী মোতাহার হোসেন
বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে ঢাকায় যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন তার অন্যতম সংগঠক ও পথপ্রদর্শক
বাংলার জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের ইতিহাসে কাজী মোতাহার হোসেন এক উজ্জ্বল নাম। পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও দাবাড়ু—বহুমাত্রিক পরিচয়ে সমৃদ্ধ এই মনীষী ছিলেন রাজবাড়ী জেলার গর্ব। তাঁর জীবন ও কর্ম কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; বরং একটি সমাজকে যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল ও জ্ঞাননির্ভর করে গড়ে তোলার নিরন্তর সাধনার ইতিহাস।
১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন কাজী মোতাহার হোসেন। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম তিনজন জাতীয় অধ্যাপকের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তাঁর কর্মজীবনের বিস্তৃতি প্রমাণ করে, জ্ঞানকে তিনি কোনো একটি শাস্ত্রের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেননি; বরং বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন এক সৃজনশীল সেতুবন্ধ।
বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে ঢাকায় যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন তার অন্যতম সংগঠক ও পথপ্রদর্শক। ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের কয়েকজন প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজে যুক্তিবাদ, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা, জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশ ঘটানো। তৎকালীন সমাজের গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে এটি হয়ে উঠেছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখে। পত্রিকাটির মুখবাণী ছিল—‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত ছিল আন্দোলনটির দার্শনিক ভিত্তি। জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের চিন্তার মুক্তি সম্ভব নয়—এই বিশ্বাসই ছিল কাজী মোতাহার হোসেনের জীবনদর্শনের অন্যতম ভিত্তি। ‘শিখা’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে তৎকালীন বাংলার প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি বিজ্ঞানচর্চায় তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে তিনি জ্ঞানবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার বিকাশে অবদান রাখেন। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের সমন্বিত চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মানবিক বোধ এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি পরস্পরের পরিপূরক। তাঁর সাহিত্যচিন্তায় যুক্তি, মনন ও মানবিকতার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা তাঁকে কেবল একজন বিজ্ঞানী কিংবা সাহিত্যিকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মনীষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সাহিত্য ও বিজ্ঞান—উভয় ক্ষেত্রেই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মানসূচক ডি.এসসি. ডিগ্রি প্রদান করে। এসব সম্মাননা তাঁর অর্জনের স্বীকৃতি হলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে জ্ঞান ও যুক্তির প্রতি আজীবন দায়বদ্ধতায়।
কাজী মোতাহার হোসেনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় ছিল দাবা খেলোয়াড় ও দাবা সংগঠক হিসেবে। দাবার মতো মনননির্ভর খেলায় তাঁর আগ্রহ তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও যুক্তিনিষ্ঠ মানসিকতার পরিচায়ক। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর এই বহুমুখী সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর কাছে জ্ঞানচর্চা ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।সাহিত্য ও বিজ্ঞান—উভয় ক্ষেত্রেই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মানসূচক ডি.এসসি. ডিগ্রি প্রদান করে। এসব সম্মাননা তাঁর অর্জনের স্বীকৃতি হলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে জ্ঞান ও যুক্তির প্রতি আজীবন দায়বদ্ধতায়।
কাজী মোতাহার হোসেনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় ছিল দাবা খেলোয়াড় ও দাবা সংগঠক হিসেবে। দাবার মতো মনননির্ভর খেলায় তাঁর আগ্রহ তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও যুক্তিনিষ্ঠ মানসিকতার পরিচায়ক। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর এই বহুমুখী সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর কাছে জ্ঞানচর্চা ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর ঢাকায় এই মহান মনীষীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু মানুষের চিন্তার জগতে তাঁর অবদান আজও প্রাসঙ্গিক। যে সমাজে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, যুক্তির চর্চা ও জ্ঞানের বিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়, সেখানে কাজী মোতাহার হোসেনের জীবনদর্শন নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন।
রাজবাড়ী জেলার এই কৃতী সন্তানকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন গুণী মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ মনে রাখা নয়; বরং তাঁর আদর্শ, মনন ও জ্ঞানসাধনাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। রাজবাড়ীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মনীষীদের পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর জীবন ও কর্ম এক মূল্যবান অধ্যায়।
কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন সেই আলোকবাহকদের একজন, যাঁরা নিজেরা আলো জ্বালানোর পাশাপাশি অন্যের চিন্তার পথও আলোকিত করেন। তাঁর জীবন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তির প্রথম শর্ত মুক্তচিন্তা, আর মুক্তচিন্তার প্রথম শর্ত জ্ঞান। সেই অর্থে তিনি কেবল রাজবাড়ীর গর্ব নন, সমগ্র বাঙালি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় আলোকবর্তিকা।
Shamiur Rahman
