কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকর: জন্ম থেকে বিদায়
নানা পাটেকর চলে গেলেও তার সংলাপ, তার রাগ, তার হাসি ভারতীয় সিনেমায় চিরকাল থেকে যাবে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, তারকা হতে সুন্দর চেহারা লাগে না, লাগে সত্যিকারের অভিনয়।
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নানা পাটেকর এক ব্যতিক্রমী নাম। তিনি কখনো নায়কের চকচকে ইমেজে নিজেকে বাঁধেননি। রাগ, যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর মানবতাকে তিনি পর্দায় এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যা নঅন্য কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না।
জন্ম ও শৈশব
নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জাঞ্জিরা নামক এক ছোট উপকূলীয় শহরে। বাবা দিনকর পাটেকর ছিলেন একজন কাপড় ব্যবসায়ী ও চিত্রশিল্পী, মা সঞ্জনাবাই পাটেকর গৃহিণী। মারাঠি মধ্যবিত্ত পরিবারে তার বেড়ে ওঠা।
শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। যখন তার বয়স ১৩ বছর, বাবার ব্যবসা ভেঙে পড়ে। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই তাকে সংসারের হাল ধরতে হয়। স্কুলের পর মাইলের পর মাইল হেঁটে তিনি সিনেমার পোস্টার আঁকতেন, মাত্র ৩৫ টাকা মাসিক বেতন ও এক বেলা খাবারের বিনিময়ে। পরে তিনি নিজেই বলেছেন, ক্ষুধা ও অপমানই তাকে অভিনেতা বানিয়েছে।
পড়াশোনা করেছেন মুম্বাইয়ের দাদারের সমর্থ বিদ্যালয়ে। পরে ভর্তি হন স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অফ অ্যাপ্লায়েড আর্টসে, যেখানে তিনি কমার্শিয়াল আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করেন। আর্ট কলেজে পড়ার সময় তিনি রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকে এবং বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করে জীবিকা চালাতেন। সেখান থেকেই থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। মারাঠি থিয়েটারের কিংবদন্তি বিজয়া মেহতার হাত ধরে তার অভিনয়ে হাতেখড়ি।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিয়ে করেন নীলকান্তি পাটেকরকে ১৯৭৮ সালে। তাদের এক ছেলে মল্লার পাটেকর। যদিও দাম্পত্য জীবনে পরে দূরত্ব তৈরি হয়, কিন্তু পারস্পরিক সম্মান ছিল অটুট।
চলচ্চিত্র জীবনের শুরু
নানা পাটেকরের সিনেমা যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৮ সালে মুজাফফর আলীর গমন ছবি দিয়ে। ফারুক শেখ ও স্মিতা পাতিলের সাথে ছোট একটি চরিত্রে তিনি ছিলেন। এরপর ১৯৮০-এর দশকে তিনি মারাঠি ও হিন্দি সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্র করেন - অঙ্কুশ, প্রতিঘাত, অন্ধ যুদ্ধ এবং মীরা নায়ারের অস্কার মনোনীত সালাম বম্বে (১৯৮৮)।
তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ১৯৮৯ সালের পরিন্দা। বিধু বিনোদ চোপড়ার এই ছবিতে আন্না শেঠ নামের গ্যাংস্টারের চরিত্রে তার অভিনয় ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে।
নব্বই দশকের রাজত্ব
পরিন্দার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনেতা।
১৯৯১ সালে তিনি পরিচালনা করেন প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক। এই ছবির জন্য তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রিতে ৩ বছর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণ তাকে পরে সম্মানসূচক ক্যাপ্টেন পদ এনে দেয়।
১৯৯২ সালে অঙ্গার ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ খলনায়কের পুরস্কার পান। ১৯৯৪ সালে ক্রান্তিবীর ছবি তাকে কিংবদন্তি বানিয়ে দেয়। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার ও স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড জেতেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে। এরপর অগ্নিসাক্ষী (১৯৯৬) ছবির জন্য আবার জাতীয় পুরস্কার পান। খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬) ছবিতে বধির বাবার চরিত্রে তার অভিনয় আজও মানুষের চোখে জল আনে।
বৈচিত্র্যময় চরিত্র
নানা পাটেকর একমাত্র অভিনেতা যিনি ফিল্মফেয়ারে তিনটি বিভাগেই পুরস্কার জিতেছেন - শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা এবং শ্রেষ্ঠ খলনায়ক।
তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো তিরঙ্গা (১৯৯৩), আব তক ছাপ্পান (২০০৪) যেখানে তিনি এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশ, অপহরণ (২০০৫), ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১ (২০০৬), ব্লাফমাস্টার (২০০৫) এবং রাজনীতি (২০১০)।
কমেডিতেও তিনি সমান সফল। ২০০৭ সালে ওয়েলকাম ছবিতে ডন উদয় শেঠি চরিত্রে তার অভিনয় মানুষকে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে দেয়। এই চরিত্র এতটাই জনপ্রিয় হয় যে ২০১৫ সালে ওয়েলকাম ব্যাক ছবিতেও তাকে একই চরিত্রে নেওয়া হয়।
মারাঠি সিনেমায় তার শ্রেষ্ঠ কাজ নটসম্রাট (২০১৬)। এই ছবিতে এক বৃদ্ধ থিয়েটার শিল্পীর চরিত্রে তার অভিনয়কে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সেরা অভিনয় বলা হয়।
দেশপ্রেম ও সেনাবাহিনী
অভিনেতার বাইরেও নানা পাটেকর একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা। প্রহার ছবির প্রস্তুতির সময় সেনাবাহিনীর সাথে তার যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা বাস্তবেও কাজে লাগান তিনি। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজকে ফোন করে যুদ্ধে যেতে চান। পরে সম্মানসূচক ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি দ্রাস, কুপওয়াড়া, বারামুলা ও সোপোরের মতো উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় টহল দেন ও সামরিক হাসপাতালে সেবা দেন।
নিজে একদিন বলেছিলেন, শ্রীনগরে যাওয়ার সময় ওজন ছিল ৭৬ কেজি, ফিরে এসেছি ৫৬ কেজি হয়ে। পরে তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত করা হয়।
সমাজসেবা
২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রে খরা ও কৃষক আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ার পর তিনি অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সাথে মিলে গড়ে তোলেন নাম ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশন খরা কবলিত এলাকায় পানি সংরক্ষণ, কৃষকদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য ও গ্রামীণ উন্নয়নে কাজ করে। তিনি তার সিনেমার আয়ের একটি বড় অংশ এই ফাউন্ডেশনে দান করতেন।
পুরস্কার ও সম্মান
তার ঝুলিতে আছে ৩টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ৪টি ফিল্মফেয়ার, ২টি মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার। ভারত সরকার ২০১৩ সালে তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে শিল্পকলায় অবদানের জন্য।
শেষ অধ্যায়
৮ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) ভোরে গোয়ার দোনা পাওলায় নিজ বাসভবনে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হন তিনি। ৪৫ মিনিট সিপিআর দেওয়ার পরও তাকে বাঁচানো যায়নি বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তার ছেলে মল্লার পাটেকর তখন পুনেতে ছিলেন।
নানা পাটেকর চলে গেলেও তার সংলাপ, তার রাগ, তার হাসি ভারতীয় সিনেমায় চিরকাল থেকে যাবে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, তারকা হতে সুন্দর চেহারা লাগে না, লাগে সত্যিকারের অভিনয়।
Shamiur Rahman
