নবায়নযোগ্য জ্বালানি: সমস্যা কি মন্ত্রণালয়ে, নাকি দায়িত্বের অস্পষ্টতায়?
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত না—কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিষয়টি থাকবে? তার আগে প্রশ্ন হওয়া দরকার—কোন কাজের মালিক কে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার, বাস্তবায়ন করবে কে এবং ব্যর্থ হলে জবাবদিহি করবে কে?
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন বিভাগ, করপোরেশন বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠনের কথাও সামনে আসছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার মনে হয়, আলোচনার শুরুটা হওয়া উচিত অন্য জায়গা থেকে—সমস্যাটি আসলে কোথায়? মন্ত্রণালয়ের কাঠামোয়, নাকি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব, ক্ষমতা ও জবাবদিহির সীমা স্পষ্ট না থাকায়?
আমার নিজের এই প্রশ্নের সূত্রপাত খুব সাধারণ একটি কাজ থেকে। কোস্ট ফাউন্ডেশনের মাঠপর্যায়ের অফিস, জেলা শহরের অফিস ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার সম্ভাবনা পর্যালোচনার দায়িত্ব পেয়েছি। আমি সৌরপ্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ নই। শুরুতে মনে হয়েছিল, বিষয়টি মূলত ছাদে কতগুলো সৌরপ্যানেল বসানো যাবে—সেটুকুই কিন্তু কাজ করতে গিয়ে সেই ধারণা বদলে যায়। একটি ভবনে দিনে ও রাতে কত বিদ্যুৎ লাগে, কখন সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হয়, ছাদ কতটা উপযোগী, কত কিলোওয়াট সৌরপ্যানেল প্রয়োজন, ইনভার্টারের ক্ষমতা কত হওয়া উচিত, গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ কীভাবে হবে, নেট মিটারিং কীভাবে কাজ করবে, ব্যাটারি বা অন্য কোনো স্টোরেজ দরকার হবে কি না, প্রাথমিক বিনিয়োগ কত এবং সেই বিনিয়োগ কত সময়ে ফিরে আসতে পারে—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
অর্থাৎ বাস্তব ফলাফলটি খুব স্পষ্ট: সৌরপ্যানেল স্থাপন কেবল একটি যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিদ্যুৎ ব্যবহার, প্রযুক্তি, গ্রিড, অর্থনীতি, নিয়মকানুন এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত। একটি ভবনের ছাদে প্যানেল বসানো একটি প্রকল্প হতে পারে; কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্ভরযোগ্যভাবে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা একটি ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎব্যবস্থার কাজ।
এই ছোট অভিজ্ঞতা থেকেই জাতীয় পর্যায়ের প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু গবেষণাগারের প্রযুক্তি নয়। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, বিনিয়োগ, ভোক্তা এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এর দায়িত্বও এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে দেখার সুযোগ কম।
এখানেই বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নতুন করে দেখা দরকার, বাংলাদেশে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—স্রেডা—কেন তৈরি করা হয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য এবং বর্তমানে তার বাস্তব দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে, সেটি আগে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোথায় তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কোথায় জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতি, কোথায় অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দায়িত্বের ওভারল্যাপ—এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু নতুন কাঠামো তৈরি করলে সমস্যার জায়গা বদলাতে পারে, সমাধান নাও হতে পারে। আমার প্রস্তাবটি তাই খুব সরল: আগে দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট করা হোক।
বিদ্যুৎ বিভাগ থাকবে জাতীয় নীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য নির্ধারণ, বিদ্যুৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় এবং বড় প্রকল্পের নীতিগত কাঠামোর দায়িত্বে। স্রেডা থাকবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতার উন্নয়ন, পরিকল্পনা, সম্পদ-মানচিত্র ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ, নেট মিটারিংয়ের কাঠামো, বিনিয়োগ সহায়তা এবং প্রকল্প উন্নয়নের সমন্বিত দায়িত্বে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্রিড সংযোগ, অবকাঠামো পরিচালনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক ভূমিকা অনুযায়ী লাইসেন্স, ট্যারিফ, ভোক্তা সুরক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি ও বাজারের ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে। আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো মনোযোগ দিতে পারে গবেষণা ও উদ্ভাবনে—উন্নত সৌরপ্রযুক্তি, ব্যাটারি ও এনার্জি স্টোরেজ, প্যানেল পুনর্ব্যবহার, উপকূলীয় এলাকার জন্য টেকসই প্রযুক্তি, কৃষির সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির উন্নয়নে,এই বিভাজনের মূল কথা হলো—কেউ কারও বিকল্প নয়।
স্রেডা বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা নয়। বিদ্যুৎ বিভাগ স্রেডার কারিগরি ও উন্নয়নমূলক সব কাজের বিকল্প নয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠানও বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনার প্রতিষ্ঠান নয়। দায়িত্বের এই সীমা অস্পষ্ট হলে একটি প্রকল্পে একাধিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি তৈরি হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নেওয়ার মতো একটি প্রতিষ্ঠান পাওয়া নাও যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই ধরনের একটি শিক্ষা দেয়। নেপালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে Alternative Energy Promotion Centre-এর মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নীতি, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, মানদণ্ড ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ভারতে আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নীতি প্রণয়ন, প্রকল্প উন্নয়ন ও অর্থায়নের জন্য আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতার শিক্ষা কেবল নতুন মন্ত্রণালয় বা নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা নয়; বরং নীতি, প্রকল্প, অর্থায়ন, গবেষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রাতিষ্ঠানিক অডিট—কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে কী দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্ব পালনের জন্য কী ক্ষমতা আছে, কোথায় সমন্বয়ের ঘাটতি, কোথায় দায়িত্বের দ্বৈততা এবং কোথায় জবাবদিহির শূন্যতা। এর পাশাপাশি কয়েকটি বাস্তব বিষয়ে দ্রুত অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। সরকারি ভবনের ছাদগুলোকে জাতীয় সৌরসম্পদ হিসেবে পরিকল্পনার আওতায় আনা যেতে পারে। রুফটপ সোলারের অনুমোদন ও গ্রিড সংযোগ সহজ করতে একক জানালা বা সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। নেট মিটারিংকে আরও ব্যবহারবান্ধব করতে হবে। সৌরবিদ্যুতের সাফল্য শুধু কত মেগাওয়াট স্থাপিত হলো, তা দিয়ে মাপলে হবে না; বাস্তবে কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, কত জীবাশ্ম জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে, গ্রিডে কতটা অবদান রাখছে, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক ফল কী এবং ভোক্তার খরচ কতটা কমছে—এসবও হিসাবের অংশ হতে হবে।
আর একটি বিষয় এখন থেকেই সামনে রাখা দরকার—সৌরবিদ্যুৎ ও এনার্জি স্টোরেজকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। সৌরবিদ্যুৎ যত বাড়বে, ততই ব্যাটারি, স্টোরেজ, গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সবশেষে ফিরে আসি সেই ছোট অভিজ্ঞতায়—কোস্ট ফাউন্ডেশনের একটি ভবনের ছাদ থেকে শুরু হওয়া হিসাবটিতে। সেখানে আমরা দেখেছি, সৌরপ্যানেল বসানোর সিদ্ধান্ত আসলে শুধু প্যানেলের হিসাব নয়। এটি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বোঝা, সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন, গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ, বিনিয়োগের হিসাব এবং ভবিষ্যৎ পরিচালনার প্রশ্ন। জাতীয় পর্যায়েও বিষয়টি একই—শুধু পরিসর অনেক বড়। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত না—কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিষয়টি থাকবে? তার আগে প্রশ্ন হওয়া দরকার—কোন কাজের মালিক কে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার, বাস্তবায়ন করবে কে এবং ব্যর্থ হলে জবাবদিহি করবে কে?
কাঠামো বদলানো প্রয়োজন হতে পারে। নতুন প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তার আগে বিদ্যমান কাঠামোর দায়িত্ব ও সক্ষমতার সৎ মূল্যায়ন জরুরি। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য এখন সবচেয়ে দরকার নতুন নাম নয়—কাজের মালিকানা স্পষ্ট করা।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক এবং উন্নয়ন কর্মী
Shamiur Rahman
