আকস্মিক বড় রদবদলের নেপথ্যে সাম্প্রতিক বিতর্ক!

বিমানের ঊর্ধ্বতন ১০ কর্মকর্তাকে বদলি

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৩৩ এএম

গত দেড় বছরের ব্যবধানে জনসংযোগ বিভাগের নতুন এই মহাব্যবস্থাপকসহ রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমানের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে অন্তত চার কর্মকর্তা দায়িত্ব পেলেন

রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রশাসনে আকস্মিক বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। সংস্থাটির প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ও উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদমর্যাদার ১০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি, নতুন দপ্তরে সংযুক্তি এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমোদনক্রমে সোমবার (৫ অক্টোবর) বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের ব্যবস্থাপক (পার্সোনেল) ওম্মে কুলছুম স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। 

উক্ত অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, প্রশাসনিক কাজের স্বার্থে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবিলম্বে নতুন কর্মস্থলে দায়িত্বভার গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দাপ্তরিক আদেশ অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর (সিইও) কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকা বোসরা ইসলামকে পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ)-এর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। এক সময়ে জনসংযোগ বিভাগে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তাকে গত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছিল।

এদিকে, মহাব্যবস্থাপক (স্টোর অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট) হিসেবে কর্মরত ইকবাল আহমেদ আলীকে মহাব্যবস্থাপক (কার্গো) এবং মহাব্যবস্থাপক (পোল্ট্রি কমপ্লেক্স) এ এইচ এম শফিউল বারীকে মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) পদে বদলি করা হয়েছে।

এছাড়া মহাব্যবস্থাপক (এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস) শাহনুর আহমেদকে মহাব্যবস্থাপক (গ্রাহক সেবা) পদের মূল দায়িত্বের পাশাপাশি আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

নতুন দায়িত্ব প্রসঙ্গে শাহনুর আহমেদ বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ ও গ্রাহকসেবা আরো কার্যকর ও গতিশীল করতে কাজ করবেন তিনি। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা বিমানের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং উন্নতির প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোও সামনে আনেন।

গত দেড় বছরের ব্যবধানে জনসংযোগ বিভাগের নতুন এই মহাব্যবস্থাপকসহ রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমানের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে অন্তত চার কর্মকর্তা দায়িত্ব পেলেন।

অন্যদিকে গ্রাহক সেবা ও জনসংযোগের দ্বৈত দায়িত্বে থাকা মহাব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আহমেদকে মহাব্যবস্থাপক (এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস) পদে পদায়ন করা হয়েছে।

ফ্লাইট অপারেশন ও পরিকল্পনা বিভাগেও একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। ক্যাপ্টেন বি-৭৮৭ শেখ আব্বাস হোসেনকে তার মূল দায়িত্বের পাশাপাশি করপোরেট প্ল্যানিং অ্যান্ড ট্রেনিং পরিদপ্তরের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উপমহাব্যবস্থাপক (পার্সোনেল) ও ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) খন্দকার বাকী উদ্দিন আহমদকে মহাব্যবস্থাপক (স্টোর অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট) হিসেবে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়া উপমহাব্যবস্থাপক (হিসাব) ও ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) এম এম আরিফুর রহমানকে উপমহাব্যবস্থাপক (করপোরেট প্ল্যানিং অ্যান্ড ট্রেনিং) পদে বদলি করা হয়েছে। উপমহাব্যবস্থাপক প্রশাসন (মানবসম্পদ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. ফজরুল আলমকে মূল পদের সঙ্গে উপমহাব্যবস্থাপক (পার্সোনেল) হিসেবে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপমহাব্যবস্থাপক (বিকেএফসিসি) এ জেড এম আরিফকে উপমহাব্যবস্থাপক (পোল্ট্রি কমপ্লেক্স) হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

বিমান সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রমে গতি আনা, সেবার মান উন্নত করা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা আরও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানের প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে এই নির্দেশ দেওয়া হলেও, এর পেছনে বেশ কিছু সাম্প্রতিক বিতর্ক ও ঘটনাপ্রবাহ অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রশাসনিক অস্থিরতা ও আদেশ বাতিল বিতর্ক

এই রদবদলের ঠিক কয়েকদিন আগে (১ অক্টোবর) বিমানের ৩ জন পরিচালকসহ ৪ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সকালে বদলি এবং বিকেলেই রহস্যজনকভাবে সেই আদেশ স্থগিত করা হয়। এছাড়া কিছুদিন আগে এক কর্মকর্তাকে সকালে পদোন্নতি দিয়ে বিকেলে তা বাতিল করার ঘটনাও ঘটে।

এই ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা বিমানের শীর্ষ প্রশাসনে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও লবিংয়ের দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে এনেছে।

সাবেক এমডির চুক্তি অবসান ও আইনি জটিলতা

বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. মো. শফিকুর রহমানের একটি ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার ও আটকের পর তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। এই ঘটনায় বিমানের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।

উড়োজাহাজ ক্রয় সংক্রান্ত বিতর্ক

সম্প্রতি, মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মোট ১৪টি আধুনিক উড়োজাহাজ সংগ্রহ করবে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা (১ ডলারে ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসাবে)। 

বোয়িংয়ের পর এয়ারবাসের কাছ থেকে নতুন ১০টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের জন্য ৭ অক্টোবর একটি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।

বিমানের যথাযথ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বা নেটওয়ার্ক কৌশল ছাড়াই এত বড় বহর বৃদ্ধির প্রক্রিয়া নিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, তেমনি বোয়িং বনাম এয়ারবাস নিয়ে বিমানের ভেতর ও বাইরে এক ধরণের নীতিগত দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

বোয়িংয়ের গোপন প্রতিবেদন ও রক্ষণাবেক্ষণ সংকট

মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের একটি সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র সংকটে বিমান তার বর্তমান বহর সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি উড়োজাহাজের জরুরি অক্সিজেন মাস্কের মেয়াদ বহু আগে শেষ হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে, যা বিমানের সেবার মান ও ব্যবস্থাপনাকে চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত