বিশ্ব হার্ট দিবস আজ
হার্ট ঠিক রাখুন, সুস্থ থাকুন
হৃদযন্ত্র শরীরের ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন ভালো থাকলে পুরো শরীর ভালো থাকে। হৃদরোগ কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটি জীবনযাপনের রোগ। তাই জীবনযাপন পরিবর্তন করলেই হৃদযন্ত্র ভালো রাখা সম্ভব
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব হার্ট দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ইউজ হার্ট, নো হার্ট। অর্থাৎ হৃদয় দিয়ে হৃদয়কে জানা। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ, র্যালি ও সচেতনতামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ৭৯ লাখ মানুষ হৃদরোগে মারা যায়। যা মোট মৃত্যুর ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশেও হৃদরোগে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানেই না।
আগে ধারণা করা হতো হৃদরোগ শুধু বয়স্কদের হয়। কিন্তু বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী মানুষের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম এবং মানসিক চাপ এর প্রধান কারণ।
হৃদরোগ বাড়ার পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত খাবার, লাল মাংস, ফাস্টফুড, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দ্বিতীয়ত কায়িক পরিশ্রমের অভাব। বর্তমানে মানুষের মধ্যে বসে কাজ করার প্রবণতা বেড়েছে। হাঁটাচলা কমে গেছে। তৃতীয়ত ধূমপান ও তামাক সেবন। ধূমপায়ীদের হৃদরোগের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। চতুর্থত উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। অনেকের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত। পঞ্চমত মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও রাত জাগা হৃদযন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
হৃদরোগ থেকে বাঁচতে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে কিছু নিয়ম মেনে চললে ৮০ শতাংশ হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা হৃদযন্ত্রের জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করা ভালো।
খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন আনতে হবে। বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে। সামুদ্রিক মাছ, ছোট মাছ, ডাল ও বাদাম হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। লাল মাংস, চিংড়ি, মগজ, কলিজা ও অতিরিক্ত ভাজা পোড়া এড়িয়ে চলতে হবে। দিনে এক চা চামচের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় পরিহার করতে হবে।
ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। ধূমপান ছাড়ার এক বছরের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি অর্ধেকে নেমে আসে। অন্যের ধূমপানের ধোঁয়াও ক্ষতিকর।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। উচ্চতা অনুযায়ী ওজন ঠিক রাখতে হবে। বিশেষ করে পেটের চর্বি কমাতে হবে। পুরুষের কোমরের মাপ ৯০ সেন্টিমিটার ও নারীর ৮০ সেন্টিমিটারের মধ্যে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে। ৩০ বছরের পর প্রতি তিন মাসে একবার রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। রক্তচাপ ১২০ বাই ৮০ এবং খালি পেটে ডায়াবেটিস ৬ এর নিচে রাখা ভালো।
৩৫ বছরের পর বছরে অন্তত একবার রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল ১০০ এর নিচে রাখতে হবে।
প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। রাত জাগা ও অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। দিনে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মানসিক চাপ কমাতে পরিবারের সাথে সময় কাটানো, বই পড়া, ধর্মীয় কাজে মন দেওয়া এবং ইতিবাচক চিন্তা করা জরুরি। অতিরিক্ত রাগ ও হতাশা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কে সবার জানা উচিত। বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা, ব্যথা বাম হাত ও চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম ও বমি বমি ভাব হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণ। এমন লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত শুইয়ে দিতে হবে এবং আঁটসাঁট কাপড় ঢিলা করে দিতে হবে। দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হার্ট অ্যাটাকের প্রথম এক ঘণ্টাকে গোল্ডেন আওয়ার বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু হলে রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। তাই সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
বছরে অন্তত একবার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যাদের পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস আছে, যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল বেশি, তাদের নিয়মিত চেকআপ প্রয়োজন।
হৃদযন্ত্র শরীরের ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন ভালো থাকলে পুরো শরীর ভালো থাকে। হৃদরোগ কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটি জীবনযাপনের রোগ। তাই জীবনযাপন পরিবর্তন করলেই হৃদযন্ত্র ভালো রাখা সম্ভব। বিশ্ব হার্ট দিবসে সবার অঙ্গীকার হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখা।
Shamiur Rahman
