প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

মো: রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৫১ পিএম

প্রতিবছর ১ অক্টোবর সারাবিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৯০ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এইদিনটি প্রবীণদের অবদান স্বীকৃতি দিতে, তাদের অধিকার রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করতে এবং বার্ধক্যকে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ জীবনের যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাপনা নতুন করে সাজানো”

নদী যেমন বয়ে চলে সাগরের পানে, মানুষের জীবনও তেমনি শৈশব, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে উপনীত হয় বার্ধক্যে। বার্ধক্য কোনো ব্যাধি নয়, এটি জীবনের এক অনিবার্য স্বাভাবিক পরিণতি। আজ যারা তরুণ ও কর্মক্ষম, সময়ের পরিক্রমায় তারাও একদিন প্রবীণ হবেন। অথচ সমকালীন সমাজে এই প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রায়শই নানা বঞ্চনা, অবহেলা ও একাকীত্বের শিকার হচ্ছেন। প্রবীণদের অধিকার রক্ষা, সামাজিক মর্যাদা এবং তাদের জন্য একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রবীণ দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ নির্ধারিত মূল তারিখ ১ অক্টোবর হলেও, বাংলাদেশে সরকারি ও উৎসব গত সমন্বয় সাধনে এই বছর ৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬ বিশেষভাবে উদযাপন করা হবে। এই বিশেষ দিনে প্রবীণদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টা এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে একদিন বাংলাদেশ সত্যিই প্রবীণবান্ধব সমাজে পরিণত হবে। যেখানে বয়স হবে গর্বের বিষয়, বোঝা নয়।

ঢাকার পুরান শহরের সরু গলির এক ছোট্ট ঘরে ৭২ বছরের আব্দুল করিম চাচা (ছদ্মনাম) চেয়ারে বসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভাবছেন। একসময় তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা। চাকরিরত অবস্থায় সংসার চালিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন। কিন্তু অবসরের পর বার্ধক্য এসে সবকিছু বদলে দিয়েছে। শরীর দুর্বল, চোখের দৃষ্টি কমে গেছে, আর সন্তানরা দূরে চাকরি করে। একা থাকার দিনগুলোতে একসময় মনে হতো জীবন যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মাসে মাসে যে অল্প টাকাটা আসে বয়স্কভাতা হিসেবে, তাঁর মুখে হাসি ফুটিয়েছে। সরকারের এই সহায়তা না থাকলে আমার হয়তো কারও দয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো,” বলেন তিনি।

প্রতি তিন মাস অন্তর যখন মোবাইলে টাকা আসে, তিনি হাসতে হাসতে বলেন, সরকার আমাকে ভোলেনি। তাঁর মতো হাজারো প্রবীণের জীবনে আজ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এক নতুন আশার আলো। প্রতিবছর ১ অক্টোবর সারাবিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৯০ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এইদিনটি প্রবীণদের অবদান স্বীকৃতি দিতে, তাদের অধিকার রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করতে এবং বার্ধক্যকে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ জীবনের যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাপনা নতুন করে সাজানো”।

এই প্রতিপাদ্য আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে: মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশিদিন বাঁচছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত বছরগুলো কি স্বাস্থ্যকর, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থপূর্ণ হচ্ছে? নাকি শুধু সময় বাড়ছে, জীবনের মান নয়? বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার এই পরিবর্তনকে ‘লংজেভিটি বিপ্লব’ বলা হচ্ছে। ২০০২ সালে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৩ কোটি। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৬ কোটির কাছাকাছি। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ২১১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে জাতিসংঘের হিসাব।

বৈশ্বিক জনসংখ্যার অনুপাতেও প্রবীণদের অংশ বাড়ছে দ্রুত। দীর্ঘজীবন যদি সুস্থতা, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা অর্থনীতি ও সমাজের জন্য ‘লংজেভিটি ডিভিডেন্ড’ বা দীর্ঘজীবনের লভ্যাংশ তৈরি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক দেশেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পেনশন, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন এবং সামাজিক সুরক্ষা এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। বয়সভিত্তিক বৈষম্য বা এজিজম, একাকীত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাব অনেক প্রবীণকে পিছিয়ে রাখছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও জরুরি। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে দেশটি প্রবীণপ্রবণ সমাজে প্রবেশ করবে এবং ২০৪৭ সাল নাগাদ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত আরও বাড়বে। দেশে এখন প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে প্রায় ৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং অনুপাত দাঁড়াবে প্রায় ১৯ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন প্রবীণ হবেন। এটি কেবল জনমিতিক পরিবর্তন নয়—এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবার এবং রাষ্ট্রের নীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।

এই পরিবর্তন আমাদের সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি ও পরিবারব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। প্রবীণরা আমাদের সমাজের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁরা জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও মূল্যবোধ নিয়ে আমাদের পাশে আছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে ভুগছেন। গ্রামীণ এলাকায় অনেক প্রবীণ একা থাকেন, শহরে অনেকেই ভাড়া বাসায় কষ্টে দিন কাটান। এই বাস্তবতায় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রবীণদের কল্যাণে নানা উদ্যোগ নিয়েছে যা আজ হাজারো পরিবারের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।সরকারের অন্যতম বড়ো অবদান হলো বয়স্কভাতা কর্মসূচি। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী। সাম্প্রতিক সময়ে এই কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬২ লাখ প্রবীণ এই ভাতার আওতায় এসেছেন। সাধারণ উপকারভোগীরা মাসে ৭০০ টাকা করে পাচ্ছেন আর ৯০ বছরের বেশি বয়সিরা পাচ্ছেন ১০০০ টাকা। এই অল্প টাকা অনেক প্রবীণের জন্য ওষুধ কেনা, প্রতিদিনের খরচ মেটানো বা পরিবারের কাছে নিজেকে বোঝা মনে না করার সুযোগ তৈরি করেছে।


সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা চালু করায় ভাতা পাওয়ার প্রক্রিয়াও আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। শুধু ভাতাই নয়। সরকার প্রবীণদের জন্য জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। এই নীতিতে প্রবীণদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। একইসঙ্গে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন ২০১৩ প্রবীণদের পরিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। যারা পরিবারহীন বা অসহায়, তাঁদের জন্য সারাদেশে কয়েকটি প্রবীণ নিবাস স্থাপন করা হয়েছে। এখানে তাঁরা থাকার ব্যবস্থা, খাবার ও চিকিৎসাসেবা পান। সম্প্রতি কমিউনিটিভিত্তিক কেয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রবীণরা নিজেদের পরিচিত পরিবেশেই যত্ন পান।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা। বার্ধক্যের সঙ্গে সঙ্গে নানা রোগ বাড়ে—ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, জয়েন্টের ব্যথা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় কিছু বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে যেখানে গুরুতর অসুস্থ প্রবীণরা আর্থিক সহায়তা পান। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সমাজসেবা কার্যালয়গুলো সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, স্বাস্থ্যশিবির ও সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। প্রবীণ দিবস উপলক্ষ্যে প্রতিবছর সারাদেশে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও প্রবীণদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে প্রবীণদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা তাঁদের মনোবল বাড়ায়। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য। আগে আমাদের সমাজে যৌথ পরিবারব্যবস্থা ছিল, যেখানে প্রবীণরা সম্মান ও যত্ন পেতেন। এখন একক পরিবার বেড়েছে, সন্তানরা কর্মসূত্রে দূরে চলে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রবীণদের একা থাকার হার বাড়ছে। এখানে সমাজের সচেতনতা দরকার। প্রবীণদের শুধু ভাতা দিলেই চলবে না, তাঁদের সঙ্গ দেওয়া, কথা শোনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া জরুরি।

অনেক প্রবীণ আজও সমাজে অবদান রাখতে সক্ষম—তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার বা স্থানীয় উন্নয়ন কাজে।সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান নেতৃত্বে প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় শুধু বয়স্কভাতা নয়, বিধবা ও স্বামীপরিত্যক্তা নারী, প্রতিবন্ধী এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্যও সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রবীণ নারীদের বিশেষ উপকার হচ্ছে, কারণ তাঁরা প্রায়ই দ্বিগুণ ঝুঁকির মুখে থাকেন। সাম্প্রতিক বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে সরকার প্রবীণদের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ভাতার পরিমাণ এখনও অনেকের জন্য পর্যাপ্ত নয় মূল্যস্ফীতির বিপরীতে। অনেক প্রবীণ এখনও তালিকাভুক্ত হতে পারেননি বা তথ্যের অভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত সেবা এখনও সীমিত। শহরাঞ্চলে আবাসন সংকট এবং গ্রামে একাকিত্ব—এসব সমস্যা সমাধানে আরও সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
কমিউনিটিভিত্তিক সেবা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পৃক্ততা এবং বেসরকারিখাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। প্রবীণ দিবস শুধু একদিনের অনুষ্ঠান নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আজকের তরুণরাই আগামীকালের প্রবীণ। তাই এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিবারে প্রবীণদের সম্মান করা, তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনা এবং প্রয়োজনে সহায়তা করা—এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সরকার যদি নীতি ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে, তাহলে সমাজ যদি ভালোবাসা ও সম্মান দেয়, তবেই প্রবীণরা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবেন। আব্দুল করিম চাচার মতো হাজারো প্রবীণ আজ সরকারের সহায়তায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। তাঁদের হাসিমুখ দেখলেই বোঝা যায়, ছোট্ট একটা ভাতাও কতটা বড়ো পরিবর্তন আনতে পারে। প্রবীণ দিবসের এই উপলক্ষ্যে আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রবীণদের শুধু ভরণপোষণনয়, সম্মান ও অংশগ্রহণের সুযোগ দেব। যেখানে বয়স হবে গর্বের বিষয়, বোঝা নয়।
#
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট এবং সিনিয়র তথ্য অফিসার; পিআইডি ফিচার

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত