প্রতারণা ও মানব পাচারের শিকার একাধিক ভুক্তভোগীর বনানী থানায় লিখিত অভিযোগ

এসএম এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে সৌদি যাওয়ার স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৩৩ এএম

অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, দেশে থাকা অবস্থায় তাদের নির্দিষ্ট কোম্পানি, নির্দিষ্ট পদ ও নির্দিষ্ট বেতনের কথা বলা হয়েছিল। সেই আশ্বাসে তারা এজেন্সির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং বিদেশ যাওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করেন। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রত্যাশিত চাকরি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য দেখতে পান বলে তাদের অভিযো

সৌদি আরবে গিয়ে ভালো একটি চাকরি করবেন, পরিবারের অভাব দূর করবেন—এমন স্বপ্ন নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ রিক্রুটিং এজেন্সির দ্বারস্থ হন। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ধারদেনা করে, আবার কেউ বছরের পর বছর জমানো টাকা খরচ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই যদি চাকরির প্রতিশ্রুতি, বেতন কিংবা কর্মস্থল নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা, তখন প্রবাসে গিয়ে একজন কর্মীর জীবন হয়ে উঠতে পারে কঠিন ও দুর্বিষহ। এরকম কিছুই জুটেছে একাধিক প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে। হতভাগা এই কর্মীরা যখন মরুর তপ্ত বুকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও কাঙ্ক্ষিত বেতন না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন; তখন এসব কর্মীদের প্রবাসে পাঠানো কতিপয় সুবিধাভোগী এবং অসৎ ব্যবসায়ীরা দেশে এসির ঠান্ডা বাতাসে আরাম করছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত জনশক্তি রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠান এসএম এন্টারপ্রাইজ (আরএল-১৯৮৭)-এর বিরুদ্ধে চাকরি, আকামা ও সঠিক বেতন না দিয়ে সৌদি আরবগামী প্রবাসীদের সাথে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। এই এজেন্সির মাধ্যমে জমি-জমা বিক্রি ও ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়ে কাজ এবং আকামা না পেয়ে অনেক বাংলাদেশি পরিবার ও প্রবাসী বর্তমানে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের বনানী থানায় বেশ কয়েকটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে

অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, দেশে থাকা অবস্থায় তাদের নির্দিষ্ট কোম্পানি, নির্দিষ্ট পদ ও নির্দিষ্ট বেতনের কথা বলা হয়েছিল। সেই আশ্বাসে তারা এজেন্সির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং বিদেশ যাওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করেন। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রত্যাশিত চাকরি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য দেখতে পান বলে তাদের অভিযোগ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে চাকরির কোম্পানি, বেতন ও কাজের ধরন সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে ভিসা ও ম্যানপাওয়ারের কাগজপত্রে তার সঙ্গে অসঙ্গতি দেখা যায়। কেউ নির্দিষ্ট বেতনের চাকরির আশ্বাস পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন, আবার পরবর্তীতে কম বেতনে ম্যানপাওয়ার সম্পন্ন করার অভিযোগ করেছেন। কারও অভিযোগ, সরাসরি কোম্পানিতে চাকরির কথা বলা হলেও পরবর্তীতে সাপ্লাই কোম্পানির মাধ্যমে কাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের কারণে বিদেশ যাওয়ার আগেই অনেক কর্মীর মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। আর যারা ইতোমধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন, তাদের কয়েকজনের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও কঠিন বাস্তবতার চিত্র।

সৌদি আরবে গিয়ে কঠিন সময় পার

এসএম এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়া কয়েকজন প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে থাকার সময় যে ধরনের চাকরি ও আয়ের প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল, সৌদি আরবে যাওয়ার পর তারা সেই প্রত্যাশিত পরিস্থিতি পাননি। কেউ কাজ না পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কেউ নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না, আবার কেউ প্রত্যাশিত আয় না থাকায় পরিবারকে অর্থ পাঠাতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।

প্রবাসীদের কয়েকজনের ভাষ্যমতে, বিদেশ যাওয়ার জন্য তারা নিজেদের জমানো টাকা, ধার করা অর্থ কিংবা পরিবারের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যয় করেছেন। এখন সৌদি আরবে গিয়ে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান না পাওয়ায় একদিকে যেমন তাদের নিজেদের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের প্রতিও তৈরি হয়েছে আর্থিক দায়। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা।

ম্যানপাওয়ার ও চুক্তিপত্র নিয়েও প্রশ্ন

এসএম এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের পাশাপাশি ম্যানপাওয়ার সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন কর্মী। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাদের সঙ্গে যে বেতন ও চাকরির শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, ম্যানপাওয়ারের কাগজপত্রে পরবর্তীতে তার ভিন্নতা দেখা যায়।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—কোন কোন কর্মীর চুক্তিপত্রে ব্যবহৃত স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তারা যে স্বাক্ষর করেননি বা যে স্বাক্ষর ব্যবহারের অনুমতি দেননি, তা কীভাবে চুক্তিপত্রে এসেছে—এই বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, ম্যানপাওয়ারের নথি, স্বাক্ষর এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা সম্ভব।

টাকা ও পাসপোর্ট ফেরত চেয়ে বনানী থানায় একাধিক লিখিত অভিযোগ

বিদেশে যাওয়ার আগে কিংবা সৌদি আরবে গিয়ে সমস্যায় পড়া কয়েকজন কর্মী তাদের জমাকৃত অর্থ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফেরত চাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, চাকরির বিষয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর তারা এজেন্সির কাছে বিষয়টির সমাধান এবং প্রয়োজন হলে অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এনিয়ে তাদের ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। 

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টির তদন্ত এবং আইনানুগ প্রতিকার দাবি করছেন। এসব অভিযোগের মধ্যেই বিষয়টি গড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। ইতিমধ্যে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে বনানী থানায় একাধিক লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হবে এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এজেন্সির বক্তব্য পাওয়া যায়নি

উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এসএম এন্টারপ্রাইজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অদ্যাবধি এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত এজেন্সির পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন এখন একটাই—প্রবাসীদের স্বপ্নভঙ্গের এই দায় কে নেবে? কারণ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন শুধু একজন ব্যক্তির নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য যে অর্থ ব্যয় করেন, তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, পরিবারের ত্যাগ কিংবা ধারদেনা। তাই চাকরির কোম্পানি, বেতন, পদ, কর্মস্থল, ভিসার ধরন এবং চুক্তির শর্তে কোনো অসঙ্গতি তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু ওই কর্মীর ওপর নয়—পুরো পরিবারের ওপর পড়ে।

এসএম এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে কতটা সত্য, কোথায় অনিয়ম হয়েছে এবং কার দায় রয়েছে—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই স্পষ্ট হবে।তবে সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের জন্য এই ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—বিদেশ যাওয়ার আগে শুধু কথার ওপর নয়, চাকরির অফার, বেতন, কোম্পানি, ভিসা, ম্যানপাওয়ার ও চুক্তিপত্রের প্রতিটি তথ্য যাচাই করা জরুরি। অর্থ লেনদেনের রসিদ ও সব কাগজপত্র সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত