বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার সংকট ও অপারেশন ক্লিন হার্ট আলোচনায়

সালাহউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৩৯ এএম

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নারী ও শিক্ষার্থীরা রাতে চলাচলে ভয় পাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন

দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুই দশক আগে পরিচালিত অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো কঠোর অভিযানের প্রসঙ্গ আবার আলোচনায় এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে অপরাধের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডাকাতির মামলা বেড়েছে ৩২ শতাংশ, ছিনতাই ৪৫ শতাংশ, চাঁদাবাজি ২৮ শতাংশ এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ৫০ শতাংশ।

মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, দারুসসালাম, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, উত্তরা পশ্চিম, খিলগাঁও, চট্টগ্রামের বায়েজিদ, পাহাড়তলী, চান্দগাঁও, গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব, গাছা, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও রূপগঞ্জে অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি।

বর্তমান সংকটের পেছনে ৮টি বড় সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। প্রথম সমস্যা হলো লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের ৫৮০টি থানা ও ফাঁড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তখন প্রায় ৩ হাজার ৮৩২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩ লাখ ৫৫ হাজার রাউন্ড গুলি, ২৫ হাজার টিয়ার শেল ও দেড় হাজার সাউন্ড গ্রেনেড লুট হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এর মধ্যে ২ হাজার ৬২০টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এখনো ১ হাজার ২১২টি অস্ত্র বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাইনিজ রাইফেল, এসএমজি, পিস্তল ও শটগান। এই অস্ত্রগুলো বিভিন্ন অপরাধী চক্রের হাতে চলে গেছে।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো নতুন অস্ত্রের অনুপ্রবেশ। লুট হওয়া অস্ত্রের পাশাপাশি সীমান্ত পথে নতুন অস্ত্র আসছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে সীমান্ত থেকে ৩৪৫টি বিদেশি পিস্তল, ১২টি একে-৪৭ রাইফেল ও ৫ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, আটক হওয়া অস্ত্রের তুলনায় অনুপ্রবেশের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি।

তৃতীয় সমস্যা হলো থানা পর্যায়ে কার্যক্রমে দুর্বলতা। মাঠ পর্যায়ে পুলিশের টহল ও অভিযান কমেছে। অনেক থানায় পর্যাপ্ত জনবল নেই। ২০২৪ সালের ঘটনার পর প্রায় ৪০ শতাংশ পুলিশ সদস্য বদলি হয়েছে। নতুন সদস্যরা এলাকা ভালোভাবে চেনেন না। ফলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি রয়েছে। অনেক এলাকায় রাতে নিয়মিত টহল দেখা যায় না।

চতুর্থ সমস্যা হলো কিশোর গ্যাং ও আধিপত্যের লড়াই। ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকায় ৮২টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০। এরা ছুরি, চাপাতি ও বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করছে। মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে গড়ে ৮ থেকে ১০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

পঞ্চম সমস্যা হলো চাঁদাবাজির বিস্তার। ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাস টার্মিনাল, ট্রাক স্ট্যান্ড, ফুটপাত, কাঁচাবাজার, নির্মাণাধীন ভবন ও বালু মহাল থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতি ট্রাক থেকে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না দিলে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে।

ষষ্ঠ সমস্যা হলো মামলা ও জামিন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। গ্রেপ্তার হলেও অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে অস্ত্র ও ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ৬৫ শতাংশ আসামি ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে জামিন পেয়েছে। জামিনে বের হয়ে তারা আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছে।

সপ্তম সমস্যা হলো গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো গোয়েন্দা তথ্য। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় সোর্স ও ইনফর্মার নেটওয়ার্ক ভেঙে গেছে। ফলে সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

অষ্টম সমস্যা হলো আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আশঙ্কা। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে নির্বাচনের সময় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বাইরে থাকায় এবারও একই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সমস্যাগুলোর কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নারী ও শিক্ষার্থীরা রাতে চলাচলে ভয় পাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, ২০০২ সালের অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় ৮২ দিনে ১১ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার ও ২ হাজার ২৮৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হলেও আটক অবস্থায় ৪০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। বর্তমানে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলমান রয়েছে। গত আট মাসে যৌথ বাহিনী সারাদেশে ২ হাজার ১০০টি অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৮০০টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। কিন্তু লুট হওয়া অস্ত্র ও নতুন অনুপ্রবেশের তুলনায় এই সংখ্যা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত