সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির ছক, বাড়ছে অনিয়মের অভিযোগ
৫২৪ কোটি থেকে ৬২১ কোটি টাকার প্রকল্প, মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত; ভবন নির্মাণের আগেই লিফট-এসি কেনা, ভাড়ায় মাসে ২২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়
সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার আধুনিকীকরণ ও নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পে একের পর এক ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীর শাহবাগে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক বহুতল গ্রন্থাগার কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে ২০২১ সালে নেওয়া প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ। একই সঙ্গে প্রকল্পের কেনাকাটা, ঠিকাদারি কাজের অগ্রগতি, অস্থায়ী কার্যালয় ও বই সংরক্ষণের ব্যয় এবং পুরোনো ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই), আর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে ডিকন কিউ ডিজাইন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নির্মাণকাজের ব্যয় ও সময় বাড়ানোর ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো প্রস্তুতের আগেই মূল্যবান যন্ত্রপাতি কেনা এবং দীর্ঘ সময় ধরে অস্থায়ী স্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনার কারণে প্রকল্পটির ব্যয়-সাশ্রয় ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই গণগ্রন্থাগারের স্বাভাবিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পাঠক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা।
ব্যয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা, মেয়াদ পেরিয়ে আরও তিন বছর
‘সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার আধুনিকীকরণ ও ২টি বেসমেন্টসহ ৯ তলা আধুনিক ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পটি ২০২১ সালের মে মাসে অনুমোদন পায়। শুরুতে এর প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫২৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ৫৬১ কোটি ৩০ লাখ টাকা করা হয়।
কিন্তু তাতেও ব্যয় বৃদ্ধির ধারা থামেনি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে পূর্তকাজের জন্য আরও প্রায় ৬০ কোটি টাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬২০ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল খাতেও অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘ হচ্ছে প্রকল্পের মেয়াদও। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এত বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও কেন নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা গেল না, ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং সংশোধিত বরাদ্দের যৌক্তিকতা কতটা—এসব প্রশ্নের জবাব এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, কাজের পরিধি পরিবর্তন বা ‘ভেরিয়েশন’-এর মাধ্যমে ধারাবাহিক ব্যয় বৃদ্ধির নামে অর্থ ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোর পরও কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটিতে একদিকে যেমন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে অন্যদিকে একে আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশেষজ্ঞ মহল।
ঠিকাদারি কাজে ধীরগতি, জবাবদিহি কোথায়?
শাহবাগে গ্রন্থাগারের পুরোনো ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের এপ্রিলে। এরপর নতুন ভবন নির্মাণ করে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে না হওয়ায় প্রকল্পের সময়সীমা বারবার পরিবর্তন করে বর্তমানে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ (জুন-ডিসেম্বর) নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মালামাল আমদানিতে জটিলতা ও ডলার সংকটের মতো কারণ তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রকল্প তদারকির সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোর অভিযোগ, নির্মাণস্থলে প্রয়োজনীয় জনবল, কাজের সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও বিলম্বের কারণ হতে পারে।
সরকারি ক্রয় ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি ও চুক্তির বিধান অনুসারে বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু এই প্রকল্পে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বারবার সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বর্ধিত সময়ের বাজারের মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে মূল বাজেটে প্রায় ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ বৃদ্ধির পেছনে মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সাথে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ বা অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের গভীর ইঙ্গিত রয়েছে। এজন্য সম্ভাব্য অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন, বিলম্বের জন্য দায় নির্ধারণ এবং চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে, ঠিকাদারের বিলম্বের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে থাকলে সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় কে বহন করবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। বাজারদরের পরিবর্তন, নকশাগত সংশোধন, প্রশাসনিক বিলম্ব কিংবা ঠিকাদারের অদক্ষতা—কোন কারণে কতটা ব্যয় বেড়েছে, তার পৃথক হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভবন প্রস্তুতের আগেই লিফট-এসি ক্রয়, নিরীক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ
প্রকল্পের অন্যতম বড় অডিট ও কার্যকারিতা সংক্রান্ত আপত্তি উঠেছে ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি কেনা ও সংরক্ষণ নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে। অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ৬ বছরেও মূল ৯ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ করা যায়নি, সেখানে মূল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই লিফট, এস্কেলেটর ও কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (সেন্ট্রাল এসি) কিনে ফেলা হয়েছে।
যে ভবনে যন্ত্রপাতিগুলো স্থাপন করা হবে, সেটি প্রস্তুত হওয়ার আগে সেগুলো কেনার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এসব কেনাকাটায় তাড়াহুড়ো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে আগাম কেনাকাটায় আগ্রহী ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, ভবন প্রস্তুত না হওয়ায় এই মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে খোলা বা অনুপযুক্ত স্থানে পড়ে থাকায় একদিকে যেমন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে এগুলোর ওয়ারেন্টির মেয়াদও ব্যবহারের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া যন্ত্রপাতিগুলো রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে। সময়ের আগেই যন্ত্রপাতি ক্রয় করায় বর্তমানে সেগুলোর সংরক্ষণব্যবস্থা, স্থাপনের সময়সূচি, ওয়ারেন্টির শর্ত এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদী ভাড়ায় আর্থিক লোকসান - দুর্নীতি - জনভোগান্তি
নতুন ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে লাইব্রেরির প্রায় ৩ লাখ বই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনে সাময়িকভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, স্থানান্তরিত এই বই ও মালামাল সংরক্ষণের জন্য "১ টাকার বইয়ের পেছনে ৮ টাকা ভাড়া" দেওয়ার মতো অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের শামিল।
এদিকে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাতে গিয়ে সরকারকে প্রতি মাসে ১৬ লাখ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশে বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) ফ্লোরে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত ৬ লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে স্থায়ী ভবন না থাকায় প্রতি মাসে ২২ লাখ টাকারও বেশি অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সরকারকে। প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় ৩ বছর বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধুমাত্র ভাড়া বাবদই সরকারকে বছরে দুই কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে যা জনগণের করের টাকার সরাসরি অপব্যবহার।
প্রকল্পের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অস্থায়ী স্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয়ও বাড়ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কতটা অনিবার্য ছিল এবং সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করা গেলে কতটা অর্থ সাশ্রয় সম্ভব হতো, তার একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, অস্থায়ী স্থাপনায় (ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে) সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাতে গিয়ে সাধারণ পাঠক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা আগের মতো গ্রন্থাগারসেবা পাচ্ছেন না। দীর্ঘসূত্রতার আর্থিক মূল্য শুধু সরকারি কোষাগারকেই দিতে হচ্ছে না; এর প্রভাব পড়ছে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার পরিবেশেও।
ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙা নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গ্রন্থাগারের পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে পুরোনো স্থাপনার ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে সমালোচনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
অভিযোগ অনুযায়ী, পুরোনো ভবনের পিরামিড আকৃতির সিঁড়ি ও ৬৭ বছরের পুরনো ঐতিহ্য বহনকারী স্থাপত্য উপাদান সংরক্ষণের পরিবর্তে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, গ্রন্থাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের বিকল্পও বিবেচনা করা যেত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) পক্ষ থেকেও পুরোনো স্থাপনা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক্ল সমালোচনা করা হয়েছে। তাঁদের উদ্বেগের মূল বিষয় হলো, আধুনিকায়নের নামে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও নগর ঐতিহ্যের মূল্য যেন উপেক্ষিত না হয়।
তবে ভবনটি সংরক্ষণের উপযোগিতা, কাঠামোগত নিরাপত্তা, সংস্কারের সম্ভাব্য ব্যয় এবং নতুন ভবনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে কী ধরনের কারিগরি ও ঐতিহ্যগত মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তা জানা প্রয়োজন। এসব নথি প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।
উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্পের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএ/এম-৪) নিয়াজ মো. তানভীরের সঙ্গে মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এই বিষয়ে জানতে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
অন্যদিকে, প্রকল্পটির অকাঠামো নির্মাণকাজের সাথে যুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী (বিভাগ-৪) মাসুদ রানার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে কথা বলার জন্য বারংবার সময় চাওয়া হলেও তিনি দ্য ফিন্যান্স টুডে'র অনুসন্ধানী টীমকে সময় না দিয়ে কালক্ষেপন করেন।
সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার কেবল একটি সরকারি ভবন নয়; এটি পাঠক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ মানুষের জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে এর নির্মাণকাজে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অর্থ ব্যবহারে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার প্রভাব সরকারি কোষাগারের ক্ষতির পাশাপাশি জনসেবার ওপরও পড়ে।
প্রকল্পের ব্যয় কেন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ার দায় কার, ভবন প্রস্তুতের আগে যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল এবং অস্থায়ী স্থাপনায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা কতটা—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর প্রয়োজন।
এ জন্য প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), ক্রয়পরিকল্পনা, কার্যাদেশ, ভেরিয়েশন অনুমোদন, ঠিকাদারি বিল, নিরীক্ষা আপত্তি এবং বাস্তব অগ্রগতির তুলনামূলক তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধি ও বিলম্বের কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য অনিয়ম পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়ে থাকলে জাতীয় গণগ্রন্থাগার প্রকল্পটিকেও সেই প্রক্রিয়ার আওতায় এনে প্রয়োজনীয় যাচাই করা যেতে পারে।
জনস্বার্থে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা, দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রন্থাগারটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা। কারণ, একটি আধুনিক গণগ্রন্থাগারের প্রকৃত সাফল্য শুধু ভবনের আকার বা ব্যয়ের পরিমাণে নয়; বরং সময়মতো নির্মাণ, সুশাসন এবং সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
Shamiur Rahman
