দলীয় কার্যক্রম ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য
ঢাকা মহানগর বিএনপিতে চলছে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া
নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা, দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা এবং দলীয় শৃঙ্খলা মানার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে
ঢাকা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করার পর নতুন কমিটিতে কারা আসছেন, তা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে আলোচনা। পাশাপাশি দক্ষিণ মহানগরের নেতৃত্ব নিয়েও শুরু হয়েছে গুঞ্জন।
দলীয় সূত্র বলছে, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা, দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা এবং দলীয় শৃঙ্খলা মানার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজধানীতে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে যোগ্য ও পরীক্ষিত নেতাদের সামনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সারা দেশে পুরোদমে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে। সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে।
এদিকে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, ঢাকায় দলের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করা, দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নেতৃত্বে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করে বিএনপি। একইসঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
উত্তর মহানগরের কমিটি বিলুপ্তির পর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর কেন্দ্রের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি সামনে আসে।
নেতৃত্বের মানদণ্ড নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির আসন্ন পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে দলের ভেতরে দুটি ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একাংশের মতে, বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামের সময়ে যেসব নেতা মাঠে সক্রিয় ছিলেন না বা নেতাকর্মীদের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারেননি, তাদের পুনরায় নেতৃত্বে আনা হলে সংগঠনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে ত্যাগী ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ার পাশাপাশি সংগঠনের গতিশীলতা কমে যেতে পারে এবং অনুপ্রবেশকারী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এই অংশের মতে, নেতৃত্ব এমন হওয়া উচিত যারা সম্পূর্ণভাবে সংগঠনের জন্য সময় দিতে পারবেন, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন এবং দলীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হবেন। তাদের দৃষ্টিতে, দল ও সরকারের দায়িত্ব আলাদা করে দেখে একজন পূর্ণকালীন সংগঠনকেন্দ্রিক নেতৃত্বই বেশি কার্যকর।
তাদের মতে, এমপি বা মন্ত্রী হলে মূল দায়িত্ব হয়ে যায় রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতি বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কাজ। ফলে সংগঠনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সাংগঠনিক তদারকি কমে যেতে পারে, যা সংগঠনের গতিশীলতাকে প্রভাবিত করে।
অন্যদিকে বিএনপির অন্য একটি অংশের নেতাকর্মীদের মতে, যারা এরই মধ্যে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তারা দলীয় মনোনয়ন ও জনগণের ভোটের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। তাদের মতে, এটি শুধু নির্বাচনই নয়, বরং নেতৃত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এই অংশের যুক্তি হলো, অভিজ্ঞ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব নেতাদের নেতৃত্বে আনা হলে সরকারের সঙ্গে দলের সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে, উন্নয়ন কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে সুষমভাবে পৌঁছাবে, সংগঠন আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয়তাও বাড়বে।
উত্তরে আলোচনায় যাঁরা
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির পর অতি সম্প্রতি বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, নতুন কমিটিতে এমন নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব বা অন্য কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নেই। একই সঙ্গে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোও দ্রুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। রাজধানীতে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করাই এর লক্ষ্য।
সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রশাসক ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান এবং মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের নামও আলোচনায় রয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক বা সদস্যসচিব পদে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সদস্যসচিব মোস্তফা জামান, যুগ্ম আহ্বায়ক আফাজ উদ্দিন এবং দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিক সাজুর নাম আলোচনায় রয়েছে।
একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সাবেক যুবদল নেতা ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান সভাপতি পদে আলোচনায় সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে দাবি করেছে তৃণমূল নেতৃবৃন্দ। তরুণ নেতৃত্ব ও মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন দলের কেউ কেউ।
এছাড়া সদ্য সাবেক আহ্বায়ক আমিনুল হক বিএনপির ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক। দলের হাইকমান্ডের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত হওয়ায় নতুন কমিটিতে তাঁর থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
এদিকে, সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা মোস্তফা জামান মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য সাবেক সদস্যসচিব। মহানগর উত্তরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার কারণে তাঁর নামও আলোচনায় রয়েছে। এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য। তিনি অতীতে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
নতুন কমিটি গঠনের আলোচনায় মহানগর উত্তরের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, সিনিয়র সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, যুগ্ম আহ্বায়ক এ বি এম আবদুর রাজ্জাক, আতাউর রহমান, গাজী রেজাউনুল হোসেন রিয়াজ, কফিল উদ্দিন আহমেদ, হাজী মো. ইউসুফ, আফাজ উদ্দিন এবং অ্যাডভোকেট খন্দকার জিল্লুর রহমানের নামও রয়েছে।
তবে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আমিনুল হক ও সদস্যসচিব মো. মোস্তফা জামানের নেতৃত্বাধীন ৫১ সদস্যের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় নেতৃত্বে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটিয়ে শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমে গতি ফেরানোর চেষ্টা করা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দক্ষিণেও আলোচনায় একাধিক নেতা
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নেতৃত্ব নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলাম, সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ফরহাদ হোসেনের নাম রয়েছে আলোচনায়।
এছাড়াও অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরদার, হারুনুর রশিদ, যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন মাহমুদ নবীউল্লাহ নবী, যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক সভাপতি গোলাম মাওলা শাহীন ও বর্তমান সভাপতি খন্দকার এনামুল হক এনাম সহ আরও অনেকের নাম শোনা যাচ্ছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, দক্ষিণ মহানগরের বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে, নাকি নতুন করে কমিটি গঠন করা হবে- এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে উত্তর মহানগরের কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর দক্ষিণের নেতৃত্ব নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা বেড়েছে। নতুন কমিটিতে কারা থাকবেন, তাঁদের অতীত কর্মকাণ্ড কেমন এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা কতটা-এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, কমিটি পুনর্গঠন সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। এই দলে অনেক যোগ্য ও পরীক্ষিত নেতা রয়েছেন, তাঁরা নেতৃত্বে আসতে চান। দলের নীতিনির্ধারণী মহল সবকিছু বিবেচনা করে নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাকর্মীদের আইন মেনে চলার বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। দল, সরকার বা সংসদ—কোনো পর্যায়েই দলের কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুও বলেন, আইন ও নিয়মের বাইরে গেলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেই এর প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
Shamiur Rahman
