গভীর উৎকন্ঠায় স্থানীয় কর্মসংস্থান ⊕ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

সুন্দরবন ঘেঁষে ১৮ অনুমোদনহীন রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০১:২২ এএম

গত ৪ঠা অক্টোবর (রোববার) পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট মালিকদের লিখিতভাবে এই নির্দেশ দেন

সুন্দরবনের পেরিফেরি এলাকায় পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধ এবং স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে ১০টি রিসোর্টকে ৩০ দিনের মধ্যে এবং নতুন তৈরি হওয়া আটটি রিসোর্টকে ১৫ দিনের মধ্যে সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত ৪ঠা অক্টোবর (রোববার) পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট মালিকদের লিখিতভাবে এই নির্দেশ দেন।

নির্দেশনা অমান্য করলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নিয়মিত মামলা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও মঙ্গলবার পর্যন্ত উক্ত চিঠি না পাওয়ার অভিযোগ করেন রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাওন।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের এই সিদ্ধান্তে একদিকে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে রিসোর্টকেন্দ্রিক স্থানীয় কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং পর্যটননির্ভর অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা পাওয়া ১৮টি রিসোর্ট হলো, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, অরণ্যছায়া, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।

সুন্দরবনসংলগ্ন ঢাংমারী, কৈলাসগঞ্জ ও বানিশান্তা এলাকায় এসব রিসোর্ট অবস্থিত। এলাকাগুলো খুলনা জেলা কার্যালয়ের আওতাধীন হওয়ায় পরিবেশ আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগে এর আগে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা শোকজের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তারা দিতে পারেননি। ফলে গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের আবেদন বাতিল করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন করে তৈরি হওয়া আটটি রিসোর্টকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাত দিনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্থানে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবার আরও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব রিসোর্টের কার্যক্রম সাত দিনের মধ্যে বন্ধ করতে হবে এবং ১৫ দিনের মধ্যে স্থাপনা অপসারণ করতে হবে।

তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, সুন্দরবন ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন ব্যবস্থা এখন কেবল কয়েকটি রিসোর্টের ব্যবসা নয়, এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ। উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের পেরিফেরিতে প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বর্তমানে ১৫টি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ১৫৩ জন কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে ১৩৫ জনই স্থানীয় বাসিন্দা।

রিসোর্টগুলোকে কেন্দ্র করে এলাকায় আরও অন্তত ৫৮টি ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় দোকান, বিভিন্ন পণ্য ও খাবারের ভেন্ডর, অটো সার্ভিস, নৌযান বা বোট সার্ভিস, হাঁস-মুরগির খামার এবং পর্যটকদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবাভিত্তিক উদ্যোগ। ফলে রিসোর্টগুলো বন্ধ হলে শুধু মালিক বা কর্মচারীরাই নয়, এসব ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আয়-রোজগারেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টগুলো বানিশান্তা ও কৈলাসগঞ্জ ইউনিয়নের মোট তিনটি ওয়ার্ডের মধ্যে অবস্থিত। এসব এলাকায় প্রায় ৭ হাজার ৩০০ মানুষের বসবাস। তাদের দাবি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। সংখ্যার হিসাবে এ জনগোষ্ঠী ২ হাজার ২৬০ জনের বেশি। পর্যটনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি রিসোর্টের কক্ষ ভাড়া বা খাবার বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবহন, নৌযান, স্থানীয় বাজার, কৃষিপণ্য, খাদ্য সরবরাহ, খামার, দোকান এবং বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ড। তাদের ভাষায়, এভাবে সুন্দরবনকেন্দ্রিক একটি ‘কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম ইকোনমি’ বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীনির্ভর পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।

রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাওন বলেন, পর্যটন কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই আমাদের কাজ। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প ও সম্মানজনক জীবিকার সুযোগও বাড়ানো যেতে পারে।

স্থানীয়রা বলছে, সুন্দরবন সংরক্ষণ যেমন জাতীয় ও বৈশ্বিক দায়িত্ব, তেমনি বনসংলগ্ন মানুষের জীবন-জীবিকাও বাস্তবতা। ফলে অনুমোদনহীন স্থাপনার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবেশসম্মত, পরিকল্পিত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে উভয় লক্ষ্য অর্জনের পথ তৈরি হতে পারে। সুন্দরবনকে রক্ষা করেই পর্যটনকে স্থানীয় অর্থনীতির টেকসই ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলাই হতে পারে এই অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত