সংসদ ভবনে ‘প্রভাবের বলয়ে’ গণপূর্তের আসাদুজ্জামান

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০২:১৯ পিএম

পদায়ন, দীর্ঘদিন সংসদ ভবনে দায়িত্ব, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পদ নিয়ে নানা অভিযোগ; সুষ্ঠু তদন্তের দাবি

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-৩-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান লিপ্টনকে ঘিরে পদায়ন, অতিরিক্ত দায়িত্ব, সংসদ ভবন এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনা সংসদ ভবন এলাকায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন আসাদুজ্জামান। সাম্প্রতিক পদায়ন প্রক্রিয়ায় অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে লটারি ও বদলির নীতিমালা অনুসরণ করা হলেও তাঁর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে, একটি পদ শূন্য হওয়ার পর সেখানে নতুন কর্মকর্তা পদায়ন না করে আসাদুজ্জামানকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায়।

শূন্য পদে নতুন কর্মকর্তার পরিবর্তে অতিরিক্ত দায়িত্ব আসাদুজ্জামানের

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-৩-এর অধীন ই/এম বিভাগ-৭, উপ-বিভাগ-১৩ (শাখা-২)-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী হেলাল আহমদের পদ শূন্য হওয়ার পর সেখানে নতুন কোনো উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদায়ন করা হয়নি।

এর পরিবর্তে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে তাঁর নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি ওই শূন্য পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অফিস আদেশের স্মারক নম্বর ১৭৯৯ এবং তারিখ ১০ মার্চ ২০২৬ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান ওই আদেশ জারি করেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, শূন্য পদে নিয়মিত কর্মকর্তা পদায়ন না করে একই কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ও প্রচলিত বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।

তাঁদের আরও দাবি, অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের এখতিয়ার ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

লটারির বাইরে পদায়ন?

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক কর্মকর্তাকে লটারির মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং একই জেলা, সার্কেল, বিভাগ বা উপ-বিভাগে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ সীমিত করার নীতিও অনুসরণ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, আসাদুজ্জামানের ক্ষেত্রে একই সার্কেলের অধীনে দায়িত্ব অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—পদায়ন নীতিমালা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না এবং লটারি প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যতিক্রম ঘটেছে কি না।

অভিযোগকারীরা এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি প্রকাশ ও প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

সংসদ ভবনে দীর্ঘদিন দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন

সংসদ ভবন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা। নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বিবেচনায় এ ধরনের স্থাপনায় কোনো কর্মকর্তার দীর্ঘদিন একই ধরনের দায়িত্ব পালন করা স্বাভাবিকভাবেই পর্যালোচনার বিষয় বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

তাঁদের অভিযোগ, আসাদুজ্জামান দীর্ঘ সময় ধরে সংসদ ভবন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক ও ই/এম সংক্রান্ত দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ, পদায়নের ধারাবাহিকতা এবং দায়িত্ব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।সূত্র মতে, তিনি বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন এবং ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এমনকি ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ছাত্রলীগের ভিপি মনোনীত প্যানেলের একটি পদে তিনি নির্বাচন করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের কমিটি এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে আসাদুজ্জামানের ছবি সরবরাহ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, এসব নথি ও ছবি তাঁর অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে শুধু ছবি বা কোনো সংগঠনের পদে থাকার তথ্য দিয়ে কোনো কর্মকর্তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বা প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই প্রয়োজন।

সম্পদ ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়েও অভিযোগ

আসাদুজ্জামানের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ির ব্যবসা বা শোরুম, কার্গো ব্যবসা এবং কাভার্ড ভ্যান ব্যবসার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বিদেশে অর্থপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা তাঁর আয়-ব্যয়, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, ব্যবসায়িক মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আসাদুজ্জামান দিনের বিভিন্ন সময়ে দুটি ভিন্ন গাড়ি ব্যবহার করেন। এতে তাঁর ব্যবহৃত গাড়ির মালিকানা ও প্রকৃত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।

তাঁদের আরও অভিযোগ, তিনি সংসদ ভবনের গেট পর্যন্ত গাড়িতে এসে সেখান থেকে হেঁটে অফিসে প্রবেশ করেন।

শামীম পাটোয়ারীকে ঘিরে অভিযোগ

আসাদুজ্জামানের কথিত অর্থ লেনদেন ও অর্থ বহনের সঙ্গে এসি মেকানিক শামীম পাটোয়ারী নামে এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী।

তাঁদের কেউ কেউ ওই ব্যক্তিকে সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির অঘোষিত এপিএস হিসেবে দাবি করেছেন। তবে এ দাবির সমর্থনে কোনো সরকারি নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘মাসোহারার’ অভিযোগ

আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়মিত কথিত ‘মাসোহারা’ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত এই অর্থের একটি অংশ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান এবং সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফের কাছে পৌঁছাত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্টাফ দাবি করেন, বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন ব্যক্তিকেও আসাদুজ্জামান নিয়মিত কথিত ‘মাসোহারা’ দেন।

এছাড়া অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কক্ষে প্রায়ই খাবারের আয়োজন করা হয় এবং সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের উপস্থিতি দেখা যায়।

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম নিয়েও অভিযোগ

সংসদ অধিবেশন চলাকালে সাউন্ড সিস্টেমে বিপর্যয় এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে আসাদুজ্জামানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমের সাম্প্রতিক সমস্যার পেছনে তাঁর দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁরা আরও অভিযোগ করেছেন, নিম্নমানের সাউন্ড সিস্টেম সরঞ্জাম ক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব ছিল।

তবে সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটির প্রকৃত কারণ, ক্রয়কৃত সরঞ্জামের মান এবং ঠিকাদার নির্বাচনে তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকার বিষয়ে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদকের হাতে নেই।

সুষ্ঠু তদন্ত দাবি

অভিযোগকারীরা মোহাম্মদ আফ৪সাদুজ্জামানের সম্পদ বিবরণী ও আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা, পদায়নসংক্রান্ত নথি, অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের আদেশ, সংসদ ভবনে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের যৌক্তিকতা, লটারি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম হয়েছে কি না এবং সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমের সরঞ্জাম ক্রয় ও ঠিকাদার নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কোনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

আসাদুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগগুলোর বিষয়ে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান লিপ্টনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত