জাতীয় পর্যটন নীতিতে চাই সামাজিক পর্যটনের স্বীকৃতি
পর্যটন কেবল অর্থনীতির খাত নয়, এটি মানুষের জীবনের মানেরও অংশ। একটি দেশ তখনই পর্যটনে প্রকৃত অর্থে সফল, যখন তার নিজের নাগরিকেরাও নিজের দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পায়
পর্যটনের কথা উঠলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সমুদ্রসৈকত, পাহাড়ের চূড়া, পাঁচ তারা হোটেল আর বিদেশি পর্যটকের ভিড়। নীতির আলোচনাতেও প্রায়ই সেই দিকেই জোর পড়ে: কত পর্যটক এলো, কত বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলো, কতটি নতুন রিসোর্ট গড়ে উঠল। এসব হিসাব জরুরি। কিন্তু এর আড়ালে থেকে যায় একটি বড় প্রশ্ন। যে মানুষটি সারা বছর পরিশ্রম করেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠান, অথচ বছরে একবারও পরিবার নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন না, পর্যটন নীতিতে তাঁর জায়গা কোথায়। এই প্রশ্ন থেকেই আসে সামাজিক পর্যটনের কথা, যার স্বীকৃতি আমাদের জাতীয় পর্যটন নীতিতে স্পষ্টভাবে থাকা উচিত।
সামাজিক পর্যটন বলতে বোঝায় এমন পর্যটন, যা সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। এর লক্ষ্য কেবল মুনাফা নয়, মানুষের বিশ্রাম, বিনোদন, জ্ঞান ও সামাজিক বন্ধন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, শিক্ষার্থী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শ্রমজীবী মানুষ, সবার জন্য ভ্রমণের সুযোগ তৈরি করাই এর মূল ভাবনা। ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের নানা জায়গায় এই ধারণা বিভিন্ন রূপে চালু আছে, যেমন শিক্ষার্থীদের জন্য ছাড়যুক্ত ভ্রমণ, প্রবীণদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি কিংবা স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা। আমাদের প্রেক্ষাপটে এর রূপ হতে পারে আরও স্থানীয় ও বাস্তবসম্মত।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এটি কি আমাদের মতো দেশে বিলাসিতা নয়। আমার উত্তর, বরং এটি একটি প্রয়োজন। প্রথমত, ভ্রমণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার জন্য উপকারী। বিশ্রাম ও পরিবেশ বদলের সুযোগ পেলে মানুষ নতুন উদ্যমে কাজে ফেরে। দ্বিতীয়ত, দেশের নাগরিকেরা নিজের দেশকে চেনার সুযোগ পেলে দেশের প্রতি টান বাড়ে, ঐতিহ্য ও প্রকৃতি রক্ষার সচেতনতা তৈরি হয়। যে শিক্ষার্থী কখনো সুন্দরবন, পাহাড় বা ঐতিহাসিক স্থাপনা নিজের চোখে দেখেনি, সে এগুলোর মূল্য বইয়ের পাতা থেকে পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ পর্যটন আমাদের পর্যটন খাতের স্থিতিশীলতার ভিত্তি। বিদেশি পর্যটকের আসা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ভ্রমণ সতর্কতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর। কিন্তু দেশের ভেতরের পর্যটক বছরজুড়ে হোটেল, পরিবহন, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের বাজারকে সচল রাখতে পারেন। সামাজিক পর্যটন এই অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে প্রসারিত করে। বিশেষ করে অফ সিজনে, যখন হোটেল ও পর্যটন সেবাদাতারা ফাঁকা বসে থাকেন, তখন শিক্ষা সফর বা প্রবীণদের ভ্রমণের মতো কর্মসূচি তাঁদের আয়ের একটি ধারাবাহিক উৎস হতে পারে।
চতুর্থত, সামাজিক পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনে। যখন ভ্রমণ কেবল বড় রিসোর্টে সীমাবদ্ধ না থেকে ছোট অতিথিশালা, গ্রামীণ বাড়ি, স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও কারিগরদের কাছে পৌঁছায়, তখন আয় ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের হাতে। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় অঞ্চলে সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদ, গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে এমন সম্ভাবনা অনেক। স্থানীয় যুবক-যুবতীরা গাইড, নৌকার মাঝি, হোমস্টে পরিচালক ও খাবার সরবরাহকারী হিসেবে কাজ পেতে পারেন।
এখন দেখা যাক আমাদের বর্তমান পর্যটন নীতির বাস্তবতা। জাতীয় পর্যটন নীতিতে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বিপণনের কথা আছে, এসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু নাগরিকের ভ্রমণের অধিকার, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যটনের স্পষ্ট কাঠামো, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ বান্ধব সুবিধা, শিক্ষার্থীদের জন্য পরিকল্পিত সফরের মতো বিষয়গুলো সেখানে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় বলে আমার মনে হয় না। নীতিতে স্বীকৃতি না থাকলে এসব বিষয় বাজেট, পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের বাইরে থেকে যায়। যা নীতিতে নেই, তা বাস্তবায়নের তালিকায়ও আসে না।
তাহলে সামাজিক পর্যটনের স্বীকৃতি দিতে নীতিতে কী কী থাকা উচিত। প্রথমত, নীতির উদ্দেশ্যের অংশে সামাজিক পর্যটনের একটি স্পষ্ট সংজ্ঞা ও লক্ষ্য যুক্ত করতে হবে, যাতে সব সরকারি সংস্থা একই ধারণার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী ভ্রমণ প্যাকেজ ও ছাড়ের কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে পরিবহন ও পর্যটন সেবাদাতারা অংশ নিতে পারবেন। তৃতীয়ত, অফ সিজনে সামাজিক পর্যটনকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এতে সেবাদাতাদের আয় ও সাধারণ নাগরিকের সুবিধা, দুটিই নিশ্চিত হবে।
চতুর্থত, পর্যটনস্থলে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। হুইলচেয়ার চলাচলের পথ, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নারী ও শিশুবান্ধব ব্যবস্থা, প্রবীণদের জন্য বিশ্রামের জায়গা, এগুলো থাকলে পর্যটনস্থল সবার জন্য সত্যিকার অর্থে উন্মুক্ত হয়। পঞ্চমত, স্থানীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটনকে উৎসাহিত করতে হবে এবং স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ দিয়ে এই খাতে যুক্ত করতে হবে। ষষ্ঠত, বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা সফরকে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে উৎসাহিত করতে হবে এবং এ জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত গন্তব্যের তালিকা তৈরি করতে হবে।
এখানে আমার নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি কথা বলতে চাই। আমি এমন একটি বিভাগে পড়াই, যেখানে ভবিষ্যৎ পর্যটন পেশাজীবীদের তৈরি করা হয়। আমার শিক্ষার্থীদের শেখাই অতিথিকে সম্মান করতে, সেবায় আন্তরিক হতে। কিন্তু সামাজিক পর্যটনের ধারণা যদি নীতিতে না থাকে, তাহলে তারা কেবল উচ্চ আয়ের পর্যটকের সেবার কথাই শিখবে, সাধারণ নাগরিককে অতিথি হিসেবে আপন করার মানসিকতা গড়ে উঠবে না। পর্যটন শিক্ষায় সামাজিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যটনের বিষয় যুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের পেশাজীবীরা এই খাতকে আরও মানবিক ও টেকসই দিকে এগিয়ে নিতে পারবেন।
পরিবেশ ও টেকসইতার প্রশ্নও এখানে জরুরি। পর্যটক বাড়লে পর্যটনস্থলের ওপর চাপ বাড়ে। সুন্দরবন, সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ের মতো সংবেদনশীল স্থানে নিয়ন্ত্রণহীন ভিড় ক্ষতি করতে পারে। তাই সামাজিক পর্যটন সম্প্রসারণের সময় বহন ক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সচেতনতার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পেতে হবে। অন্তর্ভুক্তি মানে যেনতেনভাবে ভিড় বাড়ানো নয়, পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল ভ্রমণ।
এই কথা অস্বীকার করা যাবে না যে এর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে। ছাড় ও প্রণোদনার ব্যয় কে বহন করবে, সেবার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে, অপব্যবহার কীভাবে রোধ হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকে ভাবতে হবে। এজন্য প্রথমে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যেমন নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলায় শিক্ষা সফর বা প্রবীণ ভ্রমণ কর্মসূচি। তা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরে পরিসর বাড়ানো সম্ভব। সরকার, বেসরকারি খাত, স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এটি সম্ভব।
সবশেষে বলি, পর্যটন কেবল অর্থনীতির খাত নয়, এটি মানুষের জীবনের মানেরও অংশ। একটি দেশ তখনই পর্যটনে প্রকৃত অর্থে সফল, যখন তার নিজের নাগরিকেরাও নিজের দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পায়।
জাতীয় পর্যটন নীতিতে সামাজিক পর্যটনের স্বীকৃতি সেই সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে। এতে লাভবান হবেন সাধারণ নাগরিক, পর্যটন সেবাদাতা, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং দেশ। আজ নীতিতে এই স্বীকৃতি যুক্ত করলে আগামী দিনের পর্যটন হবে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক এবং সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান
Shamiur Rahman
