মানুষের পৃথিবীতে প্রাণীদের বাঁচার অধিকার কতটা সুরক্ষিত?

আজ বিশ্ব প্রাণী দিবস: প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও সহাবস্থানের অঙ্গীকার

সালাহউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৪২ পিএম

আবাসস্থল সংকোচন, নিষ্ঠুরতা ও পাচারের ঝুঁকিতে প্রাণীজগৎ; প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, আইনের প্রয়োগ ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি

আজ ৪ বিশ্ব প্রাণী দিবস। প্রাণীদের অধিকার রক্ষা, তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধ এবং মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। ১৯২৫ সালে জার্মানির বার্লিনে প্রথম এই দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

লেখক ও প্রাণী অধিকারকর্মী হাইনরিখ জিমারম্যানের উদ্যোগে শুরু হয় দিবসটি। পরে ১৯২৯ সাল থেকে ৪ অক্টোবর তারিখে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এই দিনটি খ্রিস্টান সাধু সেন্ট ফ্রান্সিসের মৃত্যু দিবস, যিনি প্রাণীদের রক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রাণী সুরক্ষা কংগ্রেসে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও প্রাণী কল্যাণ সংস্থা আলোচনা সভা, র‍্যালি, সচেতনতামূলক প্রচারণা ও টিকাদান কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

সুন্দরবনের বাঘ থেকে লোকালয়ের কুকুর—সংকটের ধরন ভিন্ন, প্রয়োজন সমন্বিত সমাধান

বাংলাদেশে প্রাণী দিবসের গুরুত্ব অনেক বেশি। দেশে প্রায় ৩০ লাখ গৃহপালিত ও বেওয়ারিশ কুকুর, ২০ লাখ বিড়াল, ২ কোটির বেশি গরু-ছাগল রয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনে রয়েছে বাঘ, হাতি, হরিণ, বানরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। কিন্তু বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক।

প্রথম সমস্যা হলো বেওয়ারিশ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে প্রায়ই কুকুর-বিড়ালকে পিটিয়ে হত্যা, গরম পানি ঢেলে দেওয়া ও বিষ খাইয়ে মারার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগেও অপরিকল্পিতভাবে কুকুর নিধন করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার। সুন্দরবনে বাঘ, হরিণ শিকার, হাতির আবাসস্থল ধ্বংস, পাখি শিকার ও বিদেশে পাচারের ঘটনা বাড়ছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১২০টি বন্যপ্রাণী পাচারের ঘটনা ধরা পড়েছে।

তৃতীয় সমস্যা হলো আবাসস্থল সংকট। নগরায়ন, বন উজাড় ও জলাশয় ভরাটের কারণে প্রাণীদের আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। ঢাকার আশপাশে শিয়াল, বেজি, গুইসাপের মতো প্রাণী এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

চতুর্থ সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। অনেক মানুষ জানে না যে, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯ অনুযায়ী, কোনো প্রাণীকে অকারণে হত্যা বা নির্যাতন করলে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণী রক্ষা মানে পরিবেশ রক্ষা। একটি প্রাণী বিলুপ্ত হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। যেমন, কুকুর-বিড়াল কমে গেলে ইঁদুর ও পোকামাকড় বাড়বে। পাখি কমে গেলে ফসলের ক্ষতি হবে। বাঘ না থাকলে সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস হবে।

বাংলাদেশের করণীয়

বিশ্ব প্রাণী দিবসের অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রথমত, জাতীয় তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করা। প্রাণীর সংখ্যা, প্রজাতির ঝুঁকি, পাচারের ঘটনা, উদ্ধার ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে। ২০২৬ সালে শুরু হওয়া জাতীয় প্রাণী লাল তালিকা হালনাগাদের কাজ দ্রুত ও বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, আবাসস্থল সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করা। বন, জলাভূমি, নদী ও প্রাণীর চলাচলের করিডর রক্ষায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, পথপ্রাণীর জন্য মানবিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। টিকাদান, বন্ধ্যাকরণ, চিকিৎসা, দায়িত্বশীল দত্তক গ্রহণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

চতুর্থত, বন্যপ্রাণী পাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অভিযোগের তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, আইনের প্রয়োগ এবং অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

পঞ্চমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণীকল্যাণ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে শিক্ষা জোরদার করা। শিশুদের শেখাতে হবে—প্রাণীকে অকারণে আঘাত করা, বাসা বা আবাসস্থল ধ্বংস করা কিংবা বন্যপ্রাণীকে বিনোদনের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

ষষ্ঠত, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষক ও নাগরিক সমাজের অংশীদারত্ব বাড়ানো। প্রাণীকল্যাণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। কার্যকর পরিবর্তনের জন্য নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, স্থানীয় উদ্যোগ এবং নাগরিক সচেতনতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে হবে।

বিশ্ব প্রাণী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সঙ্গে এই পৃথিবী ভাগ করে নেয় অসংখ্য প্রাণী। তাদের অস্তিত্ব কোনো বিলাসিতা নয়; প্রকৃতির ভারসাম্য ও জীবনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে তা গভীরভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশের প্রাণীজগতের ঝুঁকি নিয়ে ২০১৫ সালের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন যেমন সতর্কবার্তা দিয়েছে, তেমনি বাঘের সাম্প্রতিক সংখ্যা বৃদ্ধির মতো কিছু অগ্রগতি দেখায় যে পরিকল্পিত সংরক্ষণ ইতিবাচক ফল দিতে পারে। এখন প্রয়োজন আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য, ধারাবাহিক অর্থায়ন, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার।

আজকের দিনে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা আচরণে, নীতিতে ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিফলিত হবে। কারণ, প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু একটি প্রাণকে রক্ষা করা নয়—এটি মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী সংরক্ষণের অঙ্গীকার।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত