পরিচিত ঝুঁকি ⊕ নিরাপত্তার ঘাটতি ⊕ জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প: শ্রমিকের জীবন কি অপারেটিং কস্ট?

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩০ পিএম

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাহাজভাঙা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির সঙ্গে এ শিল্প জড়িত। তাই শিল্প বন্ধের প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো—শিল্পটি কতটা নিরাপদ

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিচিত ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা?

জাহাজভাঙা শিল্পে বিষাক্ত গ্যাস, কনফাইন্ড স্পেস, আগুন, বিস্ফোরণ ও বিপজ্জনক পদার্থের ঝুঁকি নতুন নয়। তাই তদন্তের প্রশ্ন শুধু ‘কী ঘটেছিল’—এতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জানতে হবে, যে ঝুঁকি আগে থেকেই জানা ছিল, তা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া  হয়েছিল এবং সেই ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর ছিল কি না।

গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেটই কি যথেষ্ট?

পুরোনো জাহাজ কাটার আগে সেটি যথাযথভাবে গ্যাস-ফ্রি করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা নিরাপত্তার মৌলিক শর্ত। এ ক্ষেত্রে জানতে হবে—গ্যাস পরীক্ষা কে করেছেন, কোন যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যন্ত্রটি ক্যালিব্রেটেড ছিল কি না এবং কাজ শুরুর আগে সর্বশেষ পরীক্ষা হয়েছিল কি না।

শুধু একটি সার্টিফিকেট থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন ভেরিফিকেশন ট্রেইল—সার্টিফিকেটের পেছনে বাস্তবে কী পরীক্ষা হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। কারণ কাগজ নয়, কার্যকর সেফটি সিস্টেমই শ্রমিকের জীবন রক্ষা করে।

আর যদি জাহাজটি সত্যিই গ্যাস-ফ্রি হয়ে থাকে, তাহলে টক্সিক অ্যাটমসফিয়ার তৈরি হলো কীভাবে—সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রেসিডুয়াল গ্যাস, কাটিংয়ের ফলে নতুন গ্যাস তৈরি, ভেন্টিলেশনের ঘাটতি কিংবা পাশের কমপার্টমেন্ট থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দায় শুধু শ্রমিকের?

দুর্ঘটনার পর অনেক সময় শ্রমিকের অসাবধানতাকে দায়ী করা হয়। কোনো শ্রমিক নিয়ম ভেঙে থাকলে সেটি তদন্তের অংশ হতে পারে। কিন্তু সেখানেই তদন্ত শেষ করা যায় না।

প্রশ্ন হলো—কর্মস্থলটি কেন নিরাপদ ঘোষণা করা হয়েছিল? প্রবেশের আগে অ্যাটমসফেরিক মনিটরিং হয়েছিল কি? পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ছিল কি? গ্যাস ডিটেক্টর, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল কি?

একটি কার্যকর সেফটি সিস্টেমের পরীক্ষা হলো—মানুষ ভুল করলেও সে বেঁচে ফিরতে পারে কি না।

আইন আছে, বাস্তবায়ন কোথায়?

শিপ রিসাইক্লিং খাতে আইন, লাইসেন্স, ইন্সপেকশন ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব ব্যবস্থা বাস্তবে শ্রমিকের জীবন রক্ষা করছে, নাকি অনেক ক্ষেত্রে কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ?

কোন ইয়ার্ড কখন পরিদর্শন করা হয়েছে, কী ত্রুটি পাওয়া গেছে এবং কী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে অপারেশন বন্ধের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত

সীতাকুণ্ডের ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে একটি স্বাধীন ও বহুমাত্রিক তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে অকুপেশনাল সেফটি, টক্সিকোলজি, শিপ রিসাইক্লিং, ফায়ার ও ইমার্জেন্সি রেসপন্স এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিশেষজ্ঞদের থাকা উচিত।

গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট, গ্যাস-টেস্টিং রেকর্ড, ওয়ার্ক পারমিট, ইন্সপেকশন রিপোর্ট, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও পিপিই রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং জাহাজটির পূর্ববর্তী কার্গো হিস্ট্রি সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ এভিডেন্স হারিয়ে গেলে অ্যাকাউন্টেবিলিটিও দুর্বল হয়ে যায়।

নিহত শ্রমিকের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তদন্ত বন্ধ করা যাবে না। কমপেনসেশন ক্ষত পূরণ করতে পারে; অ্যাকাউন্টেবিলিটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

শিল্প থাকবে, তবে নিরাপদ হতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাহাজভাঙা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির সঙ্গে এ শিল্প জড়িত। তাই শিল্প বন্ধের প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো—শিল্পটি কতটা নিরাপদ।

সীতাকুণ্ডের ঘটনাকে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। দেশের সব শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে জরুরি সেফটি অডিট, কনফাইন্ড-স্পেস সেফটি প্রটোকল, গ্যাস মনিটরিং, প্রশিক্ষিত রেসকিউ টিম, মেডিকেল সাপোর্ট ও অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জিরো ফ্যাটালিটিকে জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া উচিত।

শ্রমিকের জীবন কোনো অপারেটিং কস্ট নয়

সীতাকুণ্ডের এই ঘটনা শুধু একটি ইয়ার্ডের দুর্ঘটনা নয়; এটি দেশের সেফটি গভর্ন্যান্সের জন্যও একটি পরীক্ষা। প্রশ্ন হলো—কোন নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল, কে পরীক্ষা করেছিলেন, কে অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং কেন পরিচিত ঝুঁকি প্রতিরোধ করা যায়নি?

আমরা শিপ রিসাইক্লিং শিল্প বন্ধ করতে চাই না; আমরা অনিরাপদ শিপ রিসাইক্লিং বন্ধ করতে চাই। কারণ শিল্পের অর্থনৈতিক মূল্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, কোনো শ্রমিকের জীবন তার চেয়ে কম মূল্যবান নয়।

শিল্প বাঁচবে, অর্থনীতি এগোবে—কিন্তু তার প্রথম শর্ত হলো, শ্রমিকও যেন নিরাপদে জীবিত বাড়ি ফিরতে পারেন।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত