তথ্যের ঘাটতিতে দালাল-এজেন্সির দাপট; ৪৯ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল;

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: ৩৩৮ এজেন্সির আড়ালে পুরোনো সিন্ডিকেটের ছায়া

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০০ পিএম

নতুন বাজার খোলার মুহূর্তে বাংলাদেশ এমন একটি ব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার অতীত ইতিহাসে রয়েছে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির আধিপত্য, কর্মী শোষণ, চাকরির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং শেষ পর্যন্ত হাজারো কর্মীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে যাচ্ছে। এতে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন বিদেশে যেতে আগ্রহী হাজারো তরুণ। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম দলটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড—বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে যাওয়ার কথা। তবে বাজার খোলার আগেই শুরু হয়েছে বিভ্রান্তি। মালয়েশিয়া সরকার প্রায় এক মাস আগে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রকাশ করলেও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের বড় অংশই জানেন না—কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন।

এই তথ্যশূন্যতার সুযোগ নিয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা ধরনের প্রচারণা। দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর আশ্বাস, চাকরির প্রলোভন এবং নানা অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগও উঠছে। ফলে সরকারি ঘোষণার চেয়ে দালালের কথাই অনেক চাকরিপ্রত্যাশীর কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা না দিতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে বলেছে। কিন্তু এর মধ্যেই কিছু লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও দালালের তৎপরতা থেমে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী গেছেন ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট ব্যবস্থার আওতায়। সরকারি নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় যেখানে ছিল প্রায় ৭৯ হাজার টাকা, সেখানে কর্মীদের কাছ থেকে ৪ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই সময়ের নিয়োগ ব্যবস্থায় জড়িত থাকার অভিযোগে সরকার ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে।

অর্থাৎ, নতুন বাজার খোলার মুহূর্তে বাংলাদেশ এমন একটি ব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার অতীত ইতিহাসে রয়েছে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির আধিপত্য, কর্মী শোষণ, চাকরির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং শেষ পর্যন্ত হাজারো কর্মীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

পুরোনো সংকটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। কিন্তু কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগও পুরোনো। ভিসা কেনাবেচা, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ঘুষ, মেডিকেল পরীক্ষা ও বিমান টিকিটে বাড়তি টাকা নেওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়ার মতো অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। এর ফলে কয়েক দফা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধও হয়েছে। পরে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগে বাজার খুললেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আবারও তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ কর্মীকে। অনেকেই ধারদেনা করে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে গিয়ে চাকরি পাননি। কেউ বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন, কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ অনিয়মিত হয়ে আইনি ঝুঁকিতে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত অনেককে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে। এবারও যদি তথ্যের ঘাটতি, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসে, তাহলে নতুন করে একই সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২২ সালের শুরুতে বাংলাদেশে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ছিল ১,৫০০-এর বেশি। কিন্তু সেসময় মাত্র ২৫টি প্রভাবশালী এজেন্সি এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে নিয়োগব্যবস্থা গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল মালয়েশিয়াও তখন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে সীমিতসংখ্যক এজেন্সির হাতে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলে গেলে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং কর্মীদের ব্যয় বেড়ে যাবে।

পরবর্তী সময়ে প্রায় ১০১টি এজেন্সির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪.৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান—এ তথ্য ২০২৪ সালে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে আসে। একই সময়ে রিক্রুটিং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস—বায়রা।

৩৩৮ এজেন্সি নিয়ে প্রশ্ন

নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে। তালিকায় রয়েছে ২৫টি প্রধান এজেন্সি, তাদের অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড—বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সি।

এখন বড় প্রশ্ন—২৫০টি সহযোগী এজেন্সি কি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী পাঠাতে পারবে, নাকি তারা ২৫টি প্রধান এজেন্সির অধীন সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় ‘সহযোগী এজেন্সি’ কাঠামোর আড়ালে কার্যত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তালিকাভুক্ত কিছু এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। কিছু প্রধান এজেন্সির বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম নতুন ব্যবস্থাকে অতীতের সিন্ডিকেশন পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, অতীতেও অনেক এজেন্সির নাম তালিকায় থাকলেও বাস্তবে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ সীমিত ছিল।

তবে সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ৩৩৮টি এজেন্সির তালিকা বাংলাদেশ তৈরি করেনি; বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষই তালিকাটি তৈরি করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো যাচাই-বাছাই করেছে। সরকার এ তালিকাকে ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবেও উল্লেখ করেছে।

তবে তালিকা প্রকাশ করাই শেষ কথা নয়। কোন এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে, চাহিদাপত্র কে সংগ্রহ করবে, সহযোগী এজেন্সির ভূমিকা কী হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

১০ হাজার কর্মী পাঠানোর বিশেষ উদ্যোগ

এরই মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় আগামী তিন মাসে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির সেবা খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় এসব কর্মী নিয়োগ করা হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মালয়েশিয়া ডিসেম্বরের মধ্যে ওই খাতে মোট ১৫ হাজার কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

২০২৪ সালের ১ জুনের সময়সীমার আগে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে প্রথম দফায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম দলকে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বিমানভাড়া ও অন্যান্য অভিবাসন ব্যয় বহনের কথাও বলা হয়েছে।

এই উদ্যোগ সফল হলে এটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ কর্মী পাঠানোর একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো—শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের এই ব্যবস্থা কি কেবল সীমিতসংখ্যক কর্মীর মধ্যে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতের বৃহত্তর নিয়োগ ব্যবস্থাতেও এর প্রতিফলন ঘটবে?

চাকরি নেই, অথচ ঋণ আছে

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে শুধু কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক কারণ ছিল না। শ্রমিক শোষণ ও নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগও বড় ভূমিকা রেখেছে।

২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময়ও শ্রমিক শোষণ, ঋণদাসত্ব এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ সীমিত করেছিল শ্রমিক শোষণ ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে। এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় গিয়ে দেখেছেন প্রতিশ্রুত চাকরিই নেই।

এই ধরনের ঘটনায় একজন কর্মীর ক্ষতি শুধু চাকরি না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রথমে যায় কয়েক লাখ টাকা। এরপর শুরু হয় ঋণের সুদ। তারপর বিদেশে থাকার খরচ। কাজ না থাকলে আয় নেই। আয় না থাকলে ঋণ পরিশোধ নেই। একসময় অনেকে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। আর তখন শুরু হয় গ্রেপ্তার, আটক বা দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি। অর্থাৎ, নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপের অনিয়মই পরবর্তী সময়ে মানবিক সংকটে রূপ নেয়।

মালয়েশিয়ারও দায় আছে

শুধু বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিকে দায়ী করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। মালয়েশিয়ায় নিয়োগদাতা, স্থানীয় এজেন্ট, কোটা অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

২০২৪ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অতিরিক্ত ফি এবং চাকরি না পাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অনেক কর্মী মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে অনিয়মিত অবস্থায় পড়েছেন এবং শোষণের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

২০২৬ সালের জুনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও স্পষ্টভাবে বলেছেন, কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা ও শ্রমিকের কল্যাণ নিশ্চিত করতে দুই দেশকে ব্যবস্থা নিতে হবে।

অর্থাৎ, নতুন ব্যবস্থায় শুধু বাংলাদেশি এজেন্সির ওপর নজরদারি যথেষ্ট নয়; মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতারাও একই কাঠামোর আওতায় আসতে হবে।

সরকারি সেবা থাকলেও দালালের ওপর নির্ভরতা কেন?

বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের বিএমইটিতে নিবন্ধন করতে হয়। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র—টিটিসিতেও এ নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। তারপরও মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী বহু তরুণকে সরকারি ব্যবস্থার বদলে দালাল ও এজেন্সির দ্বারস্থ হতে দেখা যায়।

প্রশ্ন হলো, সরকারি সেবা যদি মানুষের দোরগোড়ায় থাকে, তাহলে চাকরিপ্রত্যাশীরা কেন দালালের ওপর বেশি নির্ভর করবেন?

রামরুর গবেষণাতেও দেখা গেছে, চাকরিপ্রত্যাশীরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে কাছের দালালের তথ্যকে বেশি বিশ্বাস করেন। এটি শুধু নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি নয়; সরকারি তথ্য কত দ্রুত, কীভাবে এবং কতটা সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে—সেই প্রশ্নও সামনে আনে।

মোবাইলভিত্তিক নিবন্ধন ও আঙুলের ছাপ গ্রহণের মতো ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা গেলে চাকরিপ্রত্যাশীদের ঢাকায় এসে অযথা অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে টিটিসিগুলোকে শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্র না রেখে নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের তথ্য ও পরামর্শকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

এবার কি বদলাবে অভিবাসন ব্যবস্থার চিত্র?

বিদেশি শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ঘিরে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। বাজার বন্ধ থাকলে আগাম প্রচারণা ও অর্থ সংগ্রহ, আর বাজার খোলার পর তাড়াহুড়ো করে কর্মী পাঠানোর প্রবণতা—এই ধরনের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে নতুন করে সংকট তৈরি হতে পারে। শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, সেটি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং কত কম খরচে, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, কতটা নিরাপদে এবং কতটা দক্ষ কর্মী বিদেশে গেলেন—সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মানদণ্ড।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার তাই শুধু নতুন করে খোলার একটি সুযোগ নয়; এটি পুরোনো ভুল থেকে বেরিয়ে আসারও বড় পরীক্ষা। এই শ্রমবাজারকে সত্যিই নিরাপদ করতে হলে অন্তত পাঁচটি তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা দরকার।

এক. প্রতিটি নিয়োগদাতা ও চাহিদাপত্রের পূর্ণ তথ্য।

দুই. কর্মীর কাছ থেকে নেওয়া যাবে—এমন সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা।

তিন. ২৫টি মূল ও ৩১২টি সহযোগী এজেন্সির দায়িত্ব ও ক্ষমতার স্পষ্ট বিভাজন।

চার. প্রতিটি কর্মীর অর্থ লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে বাধ্যতামূলক করা।

পাঁচ. বিদেশে যাওয়ার পর চাকরি না পাওয়া বা চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে এজেন্সি ও নিয়োগদাতার বিরুদ্ধে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও শাস্তির ব্যবস্থা।

এর সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাও থাকতে হবে, যেখানে কর্মী বাংলাদেশে থাকতেই অভিযোগ করতে পারবেন এবং মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পরও একই অভিযোগের অনুসরণ করা যাবে।

বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এর আগে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে সব যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—এবার কি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলবে কর্মীর স্বার্থে, নাকি আবারও খুলবে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের স্বার্থে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার সত্যিই কতটা ‘নতুন’।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত