বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছাকে ওএসডি

দুর্নীতি-অনিয়মের জেরে নরসিংদী গণপূর্তে রদবদল

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:২০ পিএম

৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই রদবদলের আদেশ দেওয়া হয়

নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগের মধ্যেই বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মূসাকে বদলি করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। সম্প্রতি নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ১৫ কোটি টাকার কাজ না করেই বিল উত্তোলন করে। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে গণপূর্ত অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মুসাকে বদলি করেছে।

৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো: খালেকুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই রদবদলের আদেশ দেওয়া হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছাকে বদলি করে ঢাকাস্থ গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীদের রিজার্ভ বেঞ্চে পদায়ন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রেষণ প্রত্যাগত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন খানকে নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পদায়ন করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বদলিকৃত কর্মকর্তাদের আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য হবেন বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এ এস এম মুসা।

অভিযোগের মধ্যেই কেন এই রদবদল?

নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগে এই রদবদল এমন সময়ে হলো, যখন নির্মাণকাজ ও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন নরসিংদী জেলা কারাগারের প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ও উত্তোলিত বিলের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

সূত্র মতে, নরসিংদীতে নির্মাণাধীন নতুন জেলা কারাগারটি প্রায় ২৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। তিনটি প্যাকেজের মধ্যে ‘সি’ প্যাকেজের কাজ পায় মেসার্স বিশ্বাস বিল্ডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। এই প্যাকেজের মূল্য ছিল প্রায় ৬২ কোটি টাকা।

অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৪৮ কোটি ৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও সহকারী প্রকৌশলী জহিরুল হক অর্থ ছাড়ের সুপারিশ করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

পরবর্তীতে নির্ধারিত ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হলেও প্রায় ১৪ থেকে ১৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। পরে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স দুই বছরের জন্য বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

এদিকে নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের দুটি প্যাকেজের কাজ ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে শেষ হলেও বিলের ৩২ লাখ টাকার চেক আটকে রাখার অভিযোগ উঠে নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসার বিরুদ্ধে। ৫ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় চেক আটকে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ করে গণপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মেসার্স আর কে ট্রেডার্সের মালিক রবিউল্লাহ। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আরও তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এ এস এম মুসা বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্বাস বিল্ডার্স কাজ শেষ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কারাগারের নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

সামগ্রিক বিবেচনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনে এই বদলির কারণ হিসেবে নিয়মিত রদবদল বলা হলেও কার্যালয় জুড়ে জোর গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, উত্থাপিত অভিযোগের তদন্তের স্বার্থেই এই রদবদল করা হয়েছে।

এ এস এম মুছাকে রিজার্ভে পদায়ন

নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এ এস এম মুছাকে এবার সরাসরি কোনো প্রকল্প বা গণপূর্ত বিভাগের মাঠপর্যায়ে না রেখে কার্যালয়ে রিজার্ভে পদায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নরসিংদীতে নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. নাসির উদ্দিন খানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হলে তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই, কাজের অগ্রগতি এবং ঠিকাদারকে দেওয়া অর্থের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বেরিয়ে আসতে পারে প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র

নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পসহ গণপূর্ত বিভাগের অধীন বিভিন্ন কাজের প্রাক্কলন, টেন্ডার, কার্যাদেশ, পরিমাপ বই, বিল পরিশোধের নথি এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ বা সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল, কত টাকার কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে এবং তার বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন ও নথিপত্র যাচাই করলে কাজের বিপরীতে অর্থ পরিশোধে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কার দায় কতটুকু—তা স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত