চাকরি নিয়মিতকরণ, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ

এলজিইডিতে বিতর্কিত জ্যেষ্ঠতার তালিকাঃ আলোচনায় ২৫৭ ‘অনিয়মিত’ প্রকৌশলী

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৮ পিএম

পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি; চাকরির ধারাবাহিকতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ⇔ তদন্তে নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতিতেও অনিয়ম ⇔ আপত্তি উপেক্ষা করে ফের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ

নিয়ম নেই, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ নেই—তবু জ্যেষ্ঠতার তালিকায় নাম। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, চাকরি নিয়মিতকরণ, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ, পদোন্নতি—প্রায় প্রতিটি ধাপেই প্রশ্নের মুখে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ২৫৭ প্রকৌশলীর চাকরি।

২০১০, ২০১১ ও ২০১৩ সালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী প্রকৌশলী পদে স্থানান্তর করা হয় এই ২৫৭ জনকে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা ও উচ্চতর পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের সেই বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে ২০২৬ সালের খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশের পর।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে—২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি; পিএসসির সুপারিশ নেওয়া হয়নি; তাঁদের মধ্যে ৩৬ জনের চাকরির ধারাবাহিকতা ছিল না এবং পাঁচজনের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতাও ছিল না। তদন্ত কমিটির মতে, যথাযথ নিয়মিতকরণ ছাড়া তাঁদের জ্যেষ্ঠতা গণনার সুযোগ নেই। এমনকি সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতিও আইনগতভাবে দেওয়া সম্ভব ছিল না। এরপরও চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ২৫৭ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—জনপ্রশাসনের তদন্ত ও লিখিত মতামতে যখন এতগুলো আপত্তি রয়েছে, তখন কোন ভিত্তিতে তাঁদের ফের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হচ্ছে?

১৮ বছর পর নতুন তালিকা, পুরোনো বিতর্ক

এলজিইডির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকা ২০০৮ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় নতুন তালিকা নিয়ে জটিলতা চলতে থাকে। ২০২৬ সালে নতুন খসড়া তালিকা প্রকাশের পর প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে আসা ২৫৭ প্রকৌশলীর অবস্থান নিয়ে বিরোধ ফের তীব্র হয়েছে।

খসড়া তালিকা নিয়ে আপত্তি জানানোর জন্য ৩০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হলেও তালিকা চূড়ান্ত ও হালনাগাদের লক্ষ্যে মাত্র চার দিনের মাথায়—২৬ এপ্রিল—পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে আহ্বায়ক এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে সমন্বয়ক করা হয়। কমিটি শুনানি শেষে ১৭ আগস্ট তালিকা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সভাও করেছে।

কমিটির আহ্বায়ক এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, শুনানি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নিয়েই বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে এবং এখনো তালিকা চূড়ান্ত হয়নি। তাঁর দাবি, কোনো অনিয়ম বা কারও প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে না।

২০১০–২০১৩: প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে ২৫৭

নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জন প্রকৌশলীকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী প্রকৌশলী পদে স্থানান্তর করা হয়।

তদন্তে বলা হয়েছে, এ ধরনের স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় সম্মতি গ্রহণের বিষয় ছিল। কিন্তু ২৫৭ জনের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। একই সঙ্গে নবম গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী পদে তাঁদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশও নেওয়া হয়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনের জবাবেও এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট জানান, এসব প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে পিএসসির অভিমত গ্রহণ করা হয়নি।

জনপ্রশাসনের লিখিত মতামত ছিল স্পষ্ট

জ্যেষ্ঠতা নিয়ে জটিলতার পর স্থানীয় সরকার বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগ মত দেয়, এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী পদ নবম গ্রেডের হওয়ায় নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে পিএসসির পরামর্শ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

মন্ত্রণালয় আরও মত দেয়, ২০১০, ২০১১ ও ২০১৩ সালে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত ২৫৭ প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে পিএসসির পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই তাঁদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা সমীচীন। পরে স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।

কিন্তু সেই মতামত ও নির্দেশনার পরও ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল ২৫৭ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়।

নিয়মিতকরণ হয়নি, তবু জ্যেষ্ঠতা!

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ২০০৫ সালের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালায় নিয়মিতকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে গণনার কথা বলা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, ২৫৭ জনের মধ্যে ২১২ জনের রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণ এখনো যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। অথচ তাঁদেরও খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এখানেই বড় প্রশ্ন—যে কর্মকর্তার রাজস্ব খাতের চাকরিই যথাযথভাবে নিয়মিত হয়নি, তাঁর জ্যেষ্ঠতা কোন তারিখ থেকে এবং কোন বিধির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে?

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ আরও কঠোর। কমিটির মতে, যথাযথ নিয়মিতকরণ না হওয়ায় তাঁদের জ্যেষ্ঠতা গণনার সুযোগ নেই। এমনকি সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগও ছিল না।

৩৬ জনের চাকরির ধারাবাহিকতা ছিল না

নিয়মিতকরণ বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত চাকরির ধারাবাহিকতা। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, ২৫৭ প্রকৌশলীর মধ্যে ৩৬ জনের চাকরির ধারাবাহিকতা ছিল না। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট সময়ে তাঁরা প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন না।

এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ রয়েছে যে, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। একই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁদের রাজস্ব খাতের সহকারী প্রকৌশলী পদে পদায়ন ও নিয়মিত করার বিষয়টিকেও তদন্ত কমিটি পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করেছে।

পাঁচ প্রকৌশলীর ডিগ্রি নিয়েও প্রশ্ন

এলজিইডির নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদের জন্য পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন। কিন্তু তদন্তে ২৫৭ জনের মধ্যে পাঁচজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের তিনজনের ডিগ্রি বিএসসি ইন অ্যাগ্রিকালচার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং দুজনের বিএসসি ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। অর্থাৎ তাঁরা যে শাখার ডিগ্রি অর্জন করেছেন, সেটি সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। (Prothom Alo)

এর বাইরে খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা কয়েকজনের প্রকল্পে যোগদানের সময় প্রয়োজনীয় ডিগ্রি ছিল না বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের পরবর্তী সময়ে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসে।

এক শাখার প্রকৌশলী, অন্য শাখায় পদ

নথিতে আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কৃষি ও যান্ত্রিক প্রকৌশলসহ ভিন্ন শাখার পাঁচ প্রকৌশলীকে পুরকৌশলের সহকারী প্রকৌশলী পদে নেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—নিয়োগের সময় যদি পদটির নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে তাঁদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ভিত্তি কী ছিল?

তদন্ত প্রতিবেদনে এই ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াকে বিধিবহির্ভূত বলে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

জ্যেষ্ঠতা ছাড়াই পদোন্নতি

তদন্ত প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো—অনুমোদিত জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অবস্থান নির্ধারণ না করেই ২৫৭ প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।এতে ২০০৮ সালের পর পিএসসির মাধ্যমে এলজিইডিতে নিয়োগ পাওয়া সহকারী প্রকৌশলীরা প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ নিয়োগ ও নিয়মিতকরণের প্রশ্নের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির প্রশ্ন। এক পক্ষ সুবিধা পেলে অন্য পক্ষের পদোন্নতি বিলম্বিত বা আটকে যাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

নিয়মিতকরণ ছাড়া ১৮০ জনকে চলতি দায়িত্ব

বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান নীতিমালা, ২০২৩’-এর ৮(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে আসা কোনো কর্মকর্তাকে রাজস্ব বাজেটে নিয়মিত না করা পর্যন্ত চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই।

কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় ২৫৭ জনের মধ্য থেকে ১৮০ জনকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে ২০২৫ সালেও উচ্চতর পদে তাঁদের দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আদালতের কার্যক্রম চলার মধ্যে ৫ম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

আদালতের নির্দেশ ও স্থগিতাদেশেও জটিলতা

২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়োগ, নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতি নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ২০২৪ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রতিবেদন আদালতে জমা হয় ২০২৫ সালের ৩ জুলাই।

তবে এই মামলার ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের একটি রায়ে ২৫৭ প্রকৌশলীর পদোন্নতি বৈধ এবং ২০১৫ সালের জ্যেষ্ঠতা তালিকা সঠিক বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ফলে একই ঘটনায় একদিকে আদালতের আগের রায়, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির গুরুতর আপত্তি—দুই ধরনের অবস্থান সামনে এসেছে। এ কারণেই বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালত ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

তদন্ত কমিটি কী বলেছে?

হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি শুধু ২৫৭ জনের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর নয়, তাঁদের নিয়মিতকরণ, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ধারাবাহিকতাও পরীক্ষা করে।

কমিটির পর্যবেক্ষণের সারকথা হলো - রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি; পিএসসির সুপারিশ নেওয়া হয়নি; ৩৬ জনের চাকরির ধারাবাহিকতা ছিল না; পাঁচজনের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না; যথাযথ নিয়মিতকরণ ছাড়া জ্যেষ্ঠতা গণনার সুযোগ নেই; জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের আগেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে; সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড ও ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির আইনগত ভিত্তি ছিল না।

এখন ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের উদ্যোগ

গুরুতর প্রশ্ন ওঠার পর রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণ না হওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও সামনে এসেছে।

কিন্তু এখানেও রয়েছে আইনি জটিলতা। তদন্ত কমিটির মতে, ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় যথাযথ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নিয়মিতকরণের আদেশ জারি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের ভিত্তিতে অতীত তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে মত দেওয়া হয়েছে। 

অর্থাৎ এখন পিএসসির মতামত নেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—সেই মতামতের ভিত্তিতে অতীতের পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতার সুবিধা কীভাবে বৈধতা পাবে?

‘সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে’

বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের বক্তব্য, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের শুনানি ও মতামত নেওয়া হয়েছে এবং বিধিবিধান অনুসরণ করেই বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।

বাছাই কমিটির আহ্বায়ক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো পক্ষের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে না এবং মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে সন্তুষ্ট।

অন্যদিকে নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, ২৫৭ প্রকৌশলীকে জ্যেষ্ঠতা ও উচ্চতর দায়িত্বের সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ সংকুচিত হচ্ছে।

প্রশ্নের মুখে পুরো প্রক্রিয়া

২৫৭ প্রকৌশলীর বিষয়টি এখন আর শুধু একটি জ্যেষ্ঠতার তালিকা নিয়ে বিরোধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা, পিএসসির সাংবিধানিক ভূমিকা, প্রকল্পের জনবল রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নিয়ম, চাকরির ধারাবাহিকতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো মৌলিক প্রশ্ন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণ যথাযথ না হয়ে থাকে, তাঁদের জ্যেষ্ঠতা গণনার আইনগত ভিত্তি কোথায়? আর যদি তাঁদের নিয়োগ, নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতি বৈধ হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত কমিটির এতগুলো আপত্তির ব্যাখ্যাই বা কী?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু এলজিইডির ২৫৭ প্রকৌশলীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং সরকারি চাকরিতে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে জনবল স্থানান্তর এবং পরবর্তী সময়ে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ নজিরও তৈরি করবে। তাই সংশ্লিষ্ট নথি, আদালতের আদেশ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং জনপ্রশাসন ও পিএসসির মতামত সমন্বয় করে একটি সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জরুরি। অন্যথায় একই সঙ্গে দুই পক্ষের কর্মকর্তার অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি এলজিইডির প্রশাসনিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা আরও বাড়তে পারে।

শেষ প্রশ্নটি তাই থেকেই যাচ্ছে—নিয়মিতকরণ নিয়ে আপত্তি, পিএসসির সুপারিশের অনুপস্থিতি, চাকরির ধারাবাহিকতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তদন্তের প্রশ্নের মধ্যেও ২৫৭ প্রকৌশলী কীভাবে আবার জ্যেষ্ঠতার তালিকায় জায়গা পেলেন?

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত