বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল উধাও

জেএমএস গার্মেন্টসে ৫৮৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৩২ পিএম

জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডকে ২০০০ সালে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ারা শামস এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তাফা মাহমুদ। কাগজপত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে বিদেশি পরিচালক হিসেবে স্টেফিন ভুজিংক ও নাগাই ফুং চান রয়েছেন।  শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের ১৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই মূলত বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা

চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান মেসার্স জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল কাস্টমসের অনুমতি ছাড়া সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের সিইপিজেড বিভাগের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৫৮৫ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৩৯১ টাকা ৪২ পয়সা শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে।

কাস্টমসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ জুলাই সিইপিজেডের সেক্টর-৬-এ অবস্থিত জেএমএস গার্মেন্টসের কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন করেন নিরীক্ষাকারী দলের সদস্যরা। পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ।

কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, কারখানার গুদামে তিন ধরনের মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৯ কেজি কাঁচামাল থাকার কথা ছিল। কিন্তু সরেজমিনে পাওয়া যায় মাত্র ২ লাখ ৮২ হাজার ৮০৮ কেজি। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের কোনো হদিস মেলেনি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনুপস্থিত কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ৮৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫৪৭ কেজি কাপড়। এসব কাপড়ের আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮২ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৮৮৪ টাকা।

এছাড়া ৫১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫ কেজি এক্সেসরিজের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এসব এক্সেসরিজের আনুমানিক মূল্য ৭৪ লাখ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৬ টাকা। একইভাবে ৬৭ হাজার ৬ কেজি প্যাকিং উপকরণ অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। এসব উপকরণের বিপরীতে শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ ৮২ লাখ ৬৬ হাজার ২৬০ টাকা।

সব মিলিয়ে কাস্টমসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে হিসাববহির্ভূত বা অবৈধভাবে অপসারিত কাঁচামালের বিপরীতে ৫৮৫ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৩৯১ টাকা ৪২ পয়সা শুল্ক-কর ফাঁকির হিসাব দেওয়া হয়েছে।

বন্ধ ঘোষণার পর কাঁচামাল সরানোর অভিযোগ

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডকে ২০০০ সালে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ারা শামস এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তাফা মাহমুদ। কাগজপত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে বিদেশি পরিচালক হিসেবে স্টেফিন ভুজিংক ও নাগাই ফুং চান রয়েছেন।  শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের ১৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই মূলত বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটি প্রধানত নিট পোশাক বা নিটওয়্যার পণ্য বিশেষ করে টি-শার্ট, পোলো শার্ট, সোয়েটার এবং শিশুদের পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটি চীন, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, শ্রীলঙ্কা থেকে বন্ড সুবিধায় বিভিন্ন ধরনের কাপড়, এক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল আমদানি করে। প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা পোশাক কানাডা, জার্মানি, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষা সম্পন্ন করা থাকলেও ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত কোন নিরীক্ষা করা হয়নি। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত নিরীক্ষা শেষে সম্প্রতি প্রতিবেদন দেওয়া হয়। নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা কাঁচামাল, রপ্তানির তথ্য ও বন্ড সংক্রান্ত দলিলাদি যাচাই করে এই প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ বন্ড সুবিধার কাঁচামালের হদিস পায়নি বন্ড কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড ২০২৩ সালে ১০২৬টি বিল অব এন্ট্রিতে ১ কোটি ৩৩ লাখ ২ হাজার ৩২৩ কেজি বা ১৩ হাজার ৩০২ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৫৮০ কেজি বা এক হাজার ৫৯১ মেট্রিক টন কাঁচামাল ৯১ হাজার ৫৮০ কেজি কাপড় (অপচয় সুবিধাসহ) ব্যবহার করে পোশাক তৈরি ও রপ্তানি করা হয়েছে।

একইভাবে ২০২৪ সালে ১ হাজার ২৭টি বিল অব এন্ট্রিতে ১ কোটি ৬৯ লাখ ৮৬ হাজার ৭৬৪ কেজি বা ১৬ হাজার ৯৮৬ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৪ হাজার ১৫৩ কেজি বা ১ হাজার ৯০৪ মেট্রিক টন কাঁচামাল দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ১৩৬টি বিল অব এন্ট্রিতে এক কোটি ৪৬ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৮ কেজি বা ১৪ হাজার ৬২৬ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৫ কেজি বা ২৬৬ মেট্রিক কাঁচামাল দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৯ কেজি বা ১৩ হাজার ৯৭৯ মেট্রিক টন আমদানি করা কাঁচামালের হদিস পায়নি বন্ড কর্মকর্তারা। যার মধ্যে ৮৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫৪৭ কেজি বা ৮ হাজার ৭৫৩ মেট্রিক টন কাপড়। এছাড়া ৫১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫ কেজি বা ৫ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন এক্সেসরিজ ও ৬৭ হাজার কেজি বা ৬৭ মেট্রিক টন প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা ১৩ হাজার ৯৭৯ মেট্রিক টন কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৬৩৩ কোটি ৬৬ লাখ ১৪ হাজার ৩৫ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ৫৮৫ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৩৯১ টাকা। 

ব্যাংকের পাওনাও শতকোটি টাকা

শুধু কাস্টমস রাজস্ব নয়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক দায় নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। রপ্তানি করতে ব্যর্থতা এবং ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটির লিয়েন ব্যাংক এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডে ১১৭ কোটি ৯৩ লাখ ৯৬ হাজার ৬৬২ টাকা ২৭ পয়সার ‘ফোর্সড লোন’ সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের আর্থিক অনিয়ম ব্যাংক খাতের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছে নিরীক্ষা দল। এর আগে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণের অভিযোগে জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ ৪০ হাজার ৭১৯ টাকা শুল্ক ফাঁকির একটি মামলা হয়েছিল। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটি অর্থ জমা দিলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করে। মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পাওনা আদায়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব স্থগিত অথবা সম্পদ ক্রোকের ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কারণ দর্শানোর নোটিশের সুপারিশ

জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কাস্টমসের নিরীক্ষা দল। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা প্রবীর নাথ, রাজস্ব কর্মকর্তা সারোয়ার আলম এবং যুগ্ম কমিশনার অনুপম চাকমার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবিলম্বে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি এবং প্রায় ৫৮৫ কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এই বিষয়ে জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা মাহমুদ বলেন, আমাদের নিরীক্ষা হয়েছে জানা নেই। জেনে আপনাকে জানাচ্ছি। নিরীক্ষায় আমরা কোনো কাগজ দেইনি। পরে বক্তব্যের জন্য ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মাহবুব হাসান বলেন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সব কাপড় ও এক্সেসরিজ রয়েছে। গণ্ডগোলের কারণে রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি। খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়নি। বন্ডের তথ্যে ভুল আছে।

এই বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিইপিজেডের এক নম্বর সড়কের ৬ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত জেএমএস গ্রুপের মালিকানাধীন জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড এই বিপুল পরিমাণ বন্ডের কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ৭ নম্বর সেক্টরে একই গ্রুপের মালিকানাধীন মডিস্ট ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি পোশাক কারখানা। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও বিপুল পরিমাণ বন্ড সুবিধার কাঁচামাল বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে বন্ড কমিশনারেট। সিইপিজেড ছাড়াও নগরের সাগরিকা সড়কের ফৌজদারহাট ভারী শিল্প এলাকায় রয়েছে মডিস্ট বাংলাদেশ নামে আরও একটি কারখানা। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। 

বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল কীভাবে কারখানার গুদাম থেকে উধাও হলো এবং এই ঘটনায় কারা জড়িত— এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। কাস্টমসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উঠে আসার পর জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত