ডিভিডেন্ডে ৯৬৩ কোটি ⊕ তিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নথিতে আরও ১,০২০ কোটি ⊕ অভিযোগ অস্বীকার সামিটের

সামিট গ্রুপের রেকর্ড ২ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬ ০১:০২ পিএম

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান বলেন, সামিট গ্রুপের সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে আদালতে আসছে

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গ্রুপ সামিটের বিরুদ্ধে রেকর্ড পরিমাণ কর ফাঁকির অভিযোগ সামনে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্তে গত কয়েক বছরে গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার আয়কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর মধ্যে সামিট পাওয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সামিট করপোরেশনকে দেওয়া ডিভিডেন্ডের বিপরীতে প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা উৎসে কর না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে আয়কর আইনের ২১২ ধারায় নথি উন্মোচনের মাধ্যমে সামিটের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে আরও প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকা কর ফাঁকির তথ্য পেয়েছে এনবিআর।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সামিট গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী সব ধরনের কর পরিশোধ করেছে।

ডিভিডেন্ডে ৯৬৩ কোটি টাকার কর ফাঁকি?

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেডের প্রায় ৬৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক সামিট করপোরেশন। এনবিআরের অভিযোগ, সামিট পাওয়ারের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামিট করপোরেশনকে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সময় প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর কর্তন করেনি। এর ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা।

সাবেক এনবিআর সদস্য খাইরুল ইসলাম বলেন, কোনো কোম্পানি অন্য একটি কোম্পানিকে ডিভিডেন্ড দিলে বিদ্যমান আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হারে উৎসে কর কর্তনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তিনি বলেন, “সামিট পাওয়ার ডিভিডেন্ড দেয় সামিট করপোরেশনকে। আইনে কোম্পানি থেকে কোম্পানিকে ডিভিডেন্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে এনবিআরের আইনগত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”

তবে করদাতারও উচ্চ আদালতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সাত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের দাবি

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, সামিট গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে বড় অঙ্কের কর ফাঁকির দাবি উঠেছে। এর মধ্যে—

  • সামিট পাওয়ার লিমিটেড: ৭ বছরে প্রায় ৩৮৮ কোটি টাকা

  • সামিট গাজীপুর-২: ৩ বছরে প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা

  • সামিট বরিশাল পাওয়ার: ৪ বছরে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা

  • সামিট মেঘনাঘাট: ৬ বছরে প্রায় ৯৩ কোটি টাকা

  • সামিট নারায়ণগঞ্জ ইউনিট-২: ৩ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা

  • সামিট এলএনজি টার্মিনাল: ৩ বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা

  • সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার: ৬ বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা

এনবিআরের এসব দাবির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেছে সামিট গ্রুপ। মামলাগুলো বর্তমানে বিচারাধীন।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান বলেন, সামিট গ্রুপের সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে আদালতে আসছে।

নথি উন্মোচনে আরও ১,০২০ কোটি টাকার তথ্য

ডিভিডেন্ড আয়ে কর ফাঁকির অভিযোগের পর আয়কর আইনের ২১২ ধারার আওতায় সামিট পাওয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি উন্মোচন শুরু করে এনবিআর। তদন্তে এখন পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আরও প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকা কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।

নথি পর্যালোচনায় আয় গোপনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে—সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪ বছরে প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৫ বছরে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা এবং সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৯ বছরে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে এনবিআর।

এই দাবিগুলোর বিরুদ্ধেও উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে সামিট।

বিদ্যুৎ খাতে বড় অংশীদার

দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে সামিট গ্রুপের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপটির বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেসরকারি খাতে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত সামিট। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গ্রুপটির ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চুক্তি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রমে সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও বেড়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার সামিটের

কর ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে সামিট গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে লিখিত বার্তায় প্রতিষ্ঠানটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। তাদের দাবি, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই তারা কর পরিশোধ করেছে।

ফলে এনবিআরের দাবির সঙ্গে সামিটের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি হয়েছে। এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলার নিষ্পত্তি এবং এনবিআরের চলমান তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে—উত্থাপিত বিপুল অঙ্কের কর দাবির কতটা আইনগতভাবে টিকে থাকে।

নজরদারিতে আরও প্রতিষ্ঠান

এদিকে সামিট গ্রুপের আরও কয়েকটি কোম্পানির করসংক্রান্ত বিষয়ে এনবিআরের তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের এই বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগের অঙ্ক ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে আগ্রহ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অঙ্কের কর দাবির ক্ষেত্রে শুধু মামলা বা পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে স্বচ্ছ তদন্ত, নথিপত্রের নিরপেক্ষ যাচাই এবং রাজস্ব স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কোনো পক্ষকেই চূড়ান্তভাবে দায়ী না করে অভিযোগ ও পাল্টা দাবির আইনগত নিষ্পত্তিই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত